দক্ষিণ নালাপাড়ার পূজা
দেশভাগের স্মৃতিতে নিজেকে খুঁজে ফেরার ‘আত্মকথন’

দক্ষিণ নালাপাড়ার থিম আত্মকথন, ছবি: রনি দে
গলির মোড়েই একটি চিত্রকর্মে আটকে গেল চোখ। মধ্যবয়স্ক এক ব্যক্তির কাঁধে চড়েছে তিন-চার বছরের ছেলেটি। সামনে লোকজনের ভিড়। আঙুল উঁচিয়ে অপার বিস্ময় আর সহাস্যে শিশুটি দেখাচ্ছে ‘ওই যে দেবী দুর্গা।’
আরেহ, এ তো আমি। ওই যে ছোটবেলায় বাবার হাত ধরে, কাঁধে চড়ে মণ্ডপে মণ্ডপে দুর্গা প্রতিমা দেখতে যেতাম। আর কড়ে গুনে গুনে হিসাব রাখতাম কতটা ঠাকুর দেখা হলো। কোনটার সিংহ বেশি ভয়ংকর, কোনটিতে দেবীর ত্রিশূলে বিদ্ধ অসুরের করুণ দশা হয়েছে ইত্যাদি।
এভাবে নিজেদের হারানো দিনের খোঁজ মিলছে দক্ষিণ নালাপাড়া সার্বজনীন পূজা মণ্ডপে। আমার-আপনার আপন কথা বলছে তাদের পুরো আয়োজনটি। নাম দেওয়া হয়েছে আত্মকথন। অতীতের ঐতিহ্য এবং বর্তমানের সৃজনশীলতা মিশেলে এক অনবদ্য সৃষ্টি আত্মকথন।
থিমের প্রতিটি সৃষ্টিতে যেমন মূর্তি, অলংকরণ, লেখায় ফুটে উঠেছে মণ্ডপটির ৭৯ বছরের দুর্গাপূজা আয়োজনের ঐতিহ্য। আয়োজনের অতীত দিনের পেছনের মানুষগুলোর গল্প যেমন বলেছে, তেমনি বলেছে আজকের প্রজন্মের অংশগ্রহণের কথাও।
মণ্ডপে ঢোকার মুখে দেখা যাবে কেউ দেয়ালে আঁকছে কেউ বা প্রতিমা নির্মাণে ব্যস্ত। আবার কেউ সাজসজ্জায় ব্যস্ত। মাঝেমধ্যে লেখা রয়েছে, ‘আমাদের পূজা আমাদের গর্ব। ভালোবাসায় গড়া পাড়ার পূজা।’ শুধু পুরুষ নয়, নারীর অংশগ্রহণের দেখাও মিলছে নানা কাজেকর্মে। এ যেমন দুজন নারী ও পুরুষ পূজার ভোগের আয়োজন করছেন, রান্নার বিশাল হাঁড়িতে। রান্না করা ভাতের পাত্রের পাশে লেখা রয়েছে, ‘ভোগ শুধু খাবার নয়, ভাগ করে নেওয়া ভালোবাসা।’
শুধু কি তাই, আবার ‘যে হাতে সংসার, সে হাতে উৎসব’ শীর্ষক একটা দেয়ালচিত্রে দেখা যাচ্ছে দুজন নারী পূজার জন্য, প্রতিমার জন্য ফুল দিয়ে মালা গাঁথছেন।
মাটির মূর্তি এবং চিত্রকর্মে এমন ছবি তুলে ধরা হয়েছে। ব্যাকগ্রাউন্ডে রয়েছে পাড়াটির পূজার সুদূর-অতীত এবং নিকট-অতীতের নানা আসল ছবি, যেগুলো সাদা-কালো ফর্মে প্রিন্ট করা। এই ছবির মানুষগুলো অনেকে পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেছেন অনেক আগে। আবার কেউ বা এখনো কায়িক শ্রম দিতে না পারলেও নানা বুদ্ধি-পরামর্শে পূজাকে সমৃদ্ধ করে চলেছেন।
তেমন একজন চিত্রনায়ক পংকজ বৈদ্য। ১৯৮২ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত সি বি জামান পরিচালিত চলচ্চিত্রে নায়ক ছিলেন তিনি। ছোটবেলা থেকেই নালাপাড়াতেই। পাড়ার পূজা ও নিজের বয়স প্রায় কাছাকাছি। একসময় নিজ হাতেই সাজসজ্জাসহ মণ্ডপের নানা কাজে নিজেকে নিয়োজিত করেছিলেন। এখন পূজার অফিস কক্ষে বসে নানা দিকনির্দেশনা দিয়ে চলেছেন।
‘এই পূজা আমাদের আবেগ আর ঐতিহ্য। অনেক স্মৃতি আমাদের। কত গল্প প্রতিটি আয়োজনের পেছনে। কত শ্রম। কতজন হারিয়ে গেছেন।’- বলছিলেন পংকজ বৈদ্য সুজন।
সত্যি হারিয়ে গেছেন অনেকে। যেমন বীর মুক্তিযোদ্ধা অমল মিত্র এই তো সেদিন চলে গেলেন। তারপর গেলেন বিমলেন্দু দাশ মিন্টু, বীর মুক্তিযোদ্ধা অসিত সেন, রানা বিশ্বাস আরও কত কত আয়োজক। ৪৭-এর দেশভাগের বছরে দ্বিজাতিত্ত্বের কারণে যখন সবাই ভিটে ছেড়ে গন্তব্যহীন ছুটছে তখনই শিকড়কে আঁকড়ে পড়ে থাকার প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা এই পূর্বসূরিদের। ওই বছরই দক্ষিণ নালাপাড়ার পূজার শুরু। ‘যাদের হাতে সৃষ্টি তারাই হারিয়ে গেছেন’ শীর্ষক একটি ক্যানভাসে এমন কয়েকজনকে দেখা যাচ্ছে।
এই তো গেল পুরনোদের কথা। আরেকটু এগিয়ে গেলে দেখতে পাবেন তরুণ প্রাণের উচ্ছ্বলতা। কয়েকজন তরুণ নিজেদের হাতে পূজার আয়োজন করছেন, মাটির প্রতিমার মাধ্যমে তা তুলে ধরা হয়। পাশে দেয়ালে লেখা, ‘পুজো বদলায়, স্মৃতি বদলায় না।’ এসব চিত্রে বর্তমান পূজা পরিষদের অন্যতম সংগঠক শ্যামল দাশগুপ্ত, জুয়েল মজুমদার, শিমুল পাল, সাধারণ সম্পাদক গৌতম দে, জুয়েল পালসহ নানাজনের মুখ ভেসে উঠছে।
যেতে যেতে একসময় আপনি পৌঁছে যাবেন দেবীর সামনে। ভালোবাসার চিহ্নের ভেতর মর্তালোকে আভির্ভূত হওয়া দেবী দুর্গা সপরিবারে উপস্থিত। দেবীকে প্রণাম করে ফিরতেই আপনার চোখ আটকে যাবে একটা গোলটেবিলে। ছয়-সাতজন বসেছেন চেয়ার টেনে। নানা আলাপ-আলোচনা চলছে। কীভাবে পূজা আয়োজন হবে, কত টাকা উঠেছে ইত্যাদি সব হিসাব নিকাশ কষছেন তারা। এই চিত্র অতীতে যেমন ছিল, তেমনি বর্তমানেরও ‘একসঙ্গে গড়ি একসঙ্গে বাঁচি।’
শেষদিকে রয়েছে পুরনো বাইসাইকেল, ওপরে হারিকেন দিয়ে সাজানো হয়েছে পুরো অঙ্গনটি। সভাপতি অলকেশ পাল জানালেন, ‘এ আয়োজনটির এমন ভাবনার পেছনে ছিলেন বিশ্বজিৎ আইচ। উত্তম পালের প্রতিমায় আলোকসজ্জা করেছে নাট্যশোভা। আমরা শিকড়কে আঁকড়ে বর্তমানের সঙ্গে থাকতে চেয়েছি।’
মণ্ডপের একেবারে শেষদিকে রয়েছে ‘পূজা চার দিনের বন্ধন সারা জীবনের’ কিংবা ‘পাড়ায় আমাদের পরিবার’ শীর্ষক দুটি বাক্য। এই বাক্যগুলো যেন সবার কথা বলছে। নির্বাহী সদস্য রাজীব বিশ্বাস রাজা বলেই ফেললেন, ‘পূজা শুধু ধর্মীয় উৎসব নয়। এটা সম্প্রীতি এবং ঐক্যের প্রতীক। প্রতিবার পূজায় এটা আরও মজবুত হয়।’
সত্যিই তাই। প্রতিটি পাড়ার পূজা আয়োজনের নিজেদের কথাই যেন বলে গেছে দক্ষিণ নালাপাড়ার এই সর্বজনীন পূজা। এটাই পূজার সার্বজনীনতা।



