মনোরেলের আরেক কাহিনি

প্রতীকী ছবি
মনোরেল-মেট্রোরেলের কাহিনি আরও আছে। বিএনপি নেতা ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের বর্তমান মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেনের কাছে ৩০ হাজার কোটি টাকার মনোরেল বিনিয়োগে ভুয়া প্রস্তাব নিয়ে দৌড়াদৌড়ি করছে— এটি যেমন সত্য, আরও সত্য হলো, তারও আগে যে দুজন মেয়র ছিলেন, তাদের কাছেও এরকম চমকপ্রদ প্রস্তাব নিয়ে ঘোরাঘুরি করেছিল প্রতারক চক্র। সেই দুই মেয়র হলেন আওয়ামী লীগ নেতা আ জ ম নাছির উদ্দীন ও রেজাউল করিম চৌধুরী।
তার আগে জেনে নেওয়া যাক বর্তমান মেয়রের সময়ে অন্তরালে কী কী ঘটনা ঘটেছে। কাউছার আলম চৌধুরী মিসরীয় জায়ান্ট ওরাসকম ও দি আরব কন্ট্রাক্টরসদের বিনিয়োগ নিয়ে আসার যে ভুয়া প্রতিশ্রুতি দিয়ে প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য সমঝোতা চুক্তি করেছিল, তার আগে যা ঘটেছিল তার কিছু বিবরণ পড়ুন।
শুরুর দিকে মনোরেল প্রকল্প নাটকের সঙ্গে যুক্ত ছিল বেশ কয়েকজন। তারা হলেন কাউছার আলম চৌধুরী ও তার সহযোগী আলী নাজির শাহীন। এর সঙ্গে প্রাথমিকভাবে যুক্ত করা হয় বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান রেকিট বেনকিজারের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক রাহবার এ আনোয়ার ও স্থপতি আশিক ইমরানকে। চট্টগ্রামে এক অনানুষ্ঠানিক আলোচনার প্রথম বৈঠকেই বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার (এক বিলিয়ন ডলার সমান বাংলাদেশি টাকায় সাড়ে ১২ হাজার কোটি টাকা) বিনিয়োগের গল্প শোনাতে লাগলেন কাউছার। তখনই চট্টগ্রামে বসবাসকারী এই ব্যক্তিদের মনে সন্দেহ দানা বাঁধে। দি আরব কন্ট্রাক্টরস ওরাসকম পেনিনসুলা কনসোর্টিয়ামে থাকার জন্য তাদের কাছে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দেওয়ার অনুরোধও জানায়। তাতে বাগড়া বাধান স্থপতি আশিক ইমরান। তিনি বিষয়টি যাচাই-বাছাইয়ে সময় নেন। একই সঙ্গে তাদের কোম্পানির প্রোফাইলও চেয়ে বসেন। সেটি সরবরাহ করতে পারেন না কাউছার। এরপর প্রথমে সরে দাঁড়ান স্থপতি আশিক ইমরান। কিছুদিন পর রাহবার এ আনোয়ার।
গল্পের এখানেই শেষ নয়, আলী নাজির শাহীন নিজ থেকে ফোন করে আশিক ইমরান ও রাহবার এ আনোয়ারকে জানিয়ে দেন, কাউছার একজন প্রতারক। তাই তিনি নিজ থেকেই সরে দাঁড়ালেন। সরে দাঁড়ানোর পক্ষে যুক্তি হলো— কাউছার বলেছিলেন, মিসর থেকে দুই প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বাংলাদেশে আসবেন প্রকল্পের অগ্রগতি ও সাইট ভিজিট করতে। কখন আসবেন, এ ব্যাপারে শাহীন ক্রমাগত তাগাদা দিতে লাগলেন কাউছারকে। আজ আসবে, কাল আসবে, পরের সপ্তাহে আসবে— এরকম করে সময়ক্ষেপণ করছিলেন কাউছার। পরিস্থিতি আঁচ করতে পেরে শাহীন সরে দাঁড়ালেন। সে কথা তিনি আশিক ও আনোয়ারকে জানিয়েও দেন।
এরপর চট্টগ্রামের আগ্রাবাদে ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারে সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠান। তাতে যোগ দেওয়ার জন্য স্থপতি আশিক ইমরানকে আমন্ত্রণ জানান চট্টগ্রাম চেম্বারের সাবেক সভাপতি আমির হুমায়ুন মাহমুদ চৌধুরী। যাওয়ার ব্যাপারে আশিক কিছুটা ইতস্তত করলে তাকে আশ্বস্ত করে বলা হয়, আলী নাজির শাহীন একটা ফ্রড। তাই তাকে বাদ দেওয়া হয়েছে। তারপর আশিক ইমরান ঠিকই গেলেন সেই চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে। চারপাশের পরিবেশ দেখে আশিক ইমরান ও স্থানীয় একটি দৈনিক পত্রিকার মালিক অনুষ্ঠান শেষে না খেয়েই বের হয়ে চলে আসেন। তারা হাসাহাসি করছিলেন এই খাবার খাওয়া ঠিক হবে না। আগামীর সময়ের গত দুই দিনের প্রতিবেদন দেখে ফোনে তারা দুজন আলাপ করে একজন আরেকজনকে বলেন, ‘আল্লাহ আমাদের বড় বাঁচা বাঁচাইছেন’। আগামীর সময়ে এরা যে প্রতারক, সে বিষয়টি তুলে আনা হয়েছে— এমন আলাপও করেছেন তারা দুজনে। একই দিন আলী নাজির শাহীনও আশিক ইমরানকে ফোন করে বলেন, ‘কাউছার যে একটা ফ্রড, আমি আগেই বুঝতে পেরেছি।’ যদিও চট্টগ্রাম সেনানিবাসের ফ্ল্যাট কেলেঙ্কারির মামলায় কারাভোগ করেছিলেন এই আলী নাজির শাহীন। তিনি চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানেও উপস্থিত ছিলেন। মনোরেলের পুরো বিষয় এবং আগামীর সময়ের গত দুই দিনের প্রতিবেদন নিয়ে অস্বস্তিতে রয়েছেন সিটি মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন। কেউ কেউ বলছেন, আগামীর সময়ের প্রতিবেদনটি যথাযথ সময়ে মেয়রকে বাঁচিয়ে দিয়েছে। না হয় ঘটনা আরও অনেকদূর এগোত। আরও তালগোল পাকাত পুরো ব্যাপারটি।
ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে শুরু হওয়া এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত ছিল বিডা ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন। বর্তমান বিএনপি সরকারের আমলে এসে বিষয়টি যে ভুয়া ও প্রতারণামূলক, সেটি তুলে ধরা হয় আগামীর সময়ে। কিন্তু এ ধরনের ছলচাতুরী শুরু হয়েছিল আরও অনেক আগে। আওয়ামী লীগ নেতা আ জ ম নাছির উদ্দীন যখন সিটি করপোরেশনের মেয়র ছিলেন, তখনো একটি গ্রুপ একইভাবে মেট্রোরেল করার জন্য তার সঙ্গে কয়েক দফা বৈঠক করেছিল। সেই গ্রুপের কথায় আশ্বস্ত হয়েছিলেন আ জ ম নাছির। তিনি সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের জন্য ৪ কোটি টাকা ও কর্ণফুলী সেতুর পাশে ডিপো করার জন্য ৬০ একর জমি বরাদ্দের বিষয়ে এগোচ্ছিলেন। কিন্তু তাকে সতর্ক করেছিলেন স্থপতি আশিক ইমরান। তিনি যুক্তি দিয়ে আ জ ম নাছিরকে বলেছিলেন, ‘৭০ বছর আগে রাশিয়ায় মেট্রোরেল চালু হয়েছিল। পড়ালেখা করতে গিয়ে রাশিয়ার সেই মেট্রোরেলে আমিও চড়েছি। চট্টগ্রামের পাহাড়ি, উঁচু-নিচু ঘনবসতিপূর্ণ জায়গা ও সরু রাস্তায় মেট্রোরেল করার সুযোগ কম।’
এই স্থপতির কথায় আশ্বস্ত হয়ে আ জ ম নাছিরও সরে আসেন মেট্রোরেল প্রকল্প থেকে। এরপর মেয়র নির্বাচিত হন আরেক আওয়ামী লীগ নেতা রেজাউল করিম চৌধুরী। তাকেও ঘিরে ধরে চায়নাভিত্তিক একটি প্রতারক চক্র। তিনি কৌশলে তাদের কাছে ১০ শতাংশ কমিশন দাবি করে বসেন। এরপর সটকে পড়ে ওই চক্রটিও।
বিষয়টি জানার জন্য স্থাপত্যবিষয়ক প্রতিষ্ঠান ফিয়ালকা আর্কিটেক্টের স্বত্বাধিকারী স্থপতি আশিক ইমরান বললেন, ‘সিটি করপোরেশন নগরী পরিচ্ছন্ন রেখে সড়কবাতি জ্বালিয়ে নগরবাসীকে সেবা দেবে। যে করপোরেশন তার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা দিতে হিমশিম খায়, তারা কীভাবে হাজার কোটি টাকার মনোরেল-মেট্রোরেল বানাবে? চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) যেখানে ভবনের নকশা পাস করতে বছর পার করে দেয়, তাদের এসব স্বপ্ন দেখা উচিত নয়।’
আ জ ম নাছির থেকে শুরু করে ডা. শাহাদাত হোসেন পর্যন্ত জাল বিস্তৃত করে রেখেছিল প্রতারক চক্র। নানা উছিলায় স্বপ্ন দেখিয়ে-গল্প শুনিয়ে, লোভে ফেলে কয়েক হাজার কোটি টাকার মেগা প্রকল্প বানানোর অকল্পনীয় ফাঁদে কেন পড়বেন জনপ্রতিনিধিরা?
লোভ-লাভ এমনি এক মোহাবিষ্ট অলংকার, যেটি আসলে অলংকার নয়, ইমিটেশন, যা শুদ্ধ বাংলায় জালকরণ।




