‘রোজার ঈদ গেল, কোরবানিও এখানেই কাটবে’

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
আলেয়া বেগমদের রোজার ঈদ এই হাসপাতালেই কেটেছিল। তখন ঠাণ্ডাজনিত রোগে আক্রান্ত ছিল তার ছয়মাসের নাতি। আরেকটা ঈদ দুয়ারে। সেই নাতি শাহদাত হোসেন এখন শিশুদের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন। তার হামের উপসর্গ। আলেয়ার আক্ষেপ, ‘এবারের ঈদও হাসপাতালেই কাটবে মনে হচ্ছে।’
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের শিশুদের আইসিইউর সামনে দাঁড়িয়ে কথাগুলো বলছিলেন আলেয়া। নাতি শাহদাতের বয়স এখন আট মাসের বেশি। রবিবার থেকে আইসিইউতে রয়েছে সে।
শাহদাতের মা সুমি আকতার ছেলের বেডের পাশে। আলেয়া ওয়ার্ডে ঢোকার মুখে সিঁড়ির পাশে মাদুর পেতে শয্যা পেতেছেন।
চট্টগ্রামে সরকারি হিসাবে এ পর্যন্ত দুই হাজার হাম ও হাম উপসর্গের রোগী বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছে। এর মধ্যে মারা গেছে ১১ জন। তবে আক্রান্ত, ভর্তি হওয়া রোগী এবং মৃত্যু বেসরকারি হিসাবে কয়েকগুণ বেশি। চমেক হাসপাতালেই প্রতিদিন হাম উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসাধীন থাকে গড়ে ১৪০ থেকে ১৫০ জন।
আলেয়ার বাড়ি নোয়াখালীর কোম্পানিগঞ্জে। দুই ছেলে, এক মেয়ে। বড় ছেলে মো. রুবেলের একমাত্র সন্তান শাহদাত। রুবেল গার্মেন্টসকর্মী। অভাব-অনটনের সংসার। আট মাসের শাহদাতকে নিয়ে তাদের হাসপাতালেই কেটে গেল প্রায় দুই মাস।
‘রোজার ঈদে ৯ দিন নাতিকে নিয়ে শিশুস্বাস্থ্য ওয়ার্ডে ছিলাম। তখন তার ঠাণ্ডা লেগে বুকে কফ হয়েছিল। মার্চ মাসে ঈদের সময়টা আমি, ছেলে আর ছেলের বউ মিলে এখানে কাটিয়েছি। এবার আবার অসুস্থ। ৯ এপ্রিল আসার পর হাম ওয়ার্ডে ছিলাম। গতকাল এখানে এসেছি’, সোমবার বিকেলে কথা হচ্ছিল আলেয়ার সঙ্গে।
দেড় মাস ধরে হাসপাতালই তাদের ঘর-সংসার। অনেক টাকা ধার হয়েছে। রোগীর জন্য বরাদ্দ করা খাবার ভাগ করে খান বউ-শাশুড়ি। কোনো রোগী খাবার না নিলেও তা নিজেরা নেন। এভাবেই চলছে দিনকাল। প্রতিদিন ওষুধ এবং পরীক্ষা বাবদ অনেক টাকা খরচ হয়।
আলেয়া জানান, ‘ছেলেটি হয়েছে পর্যন্ত অসুখ বিসুখ লেগে রয়েছে। এখানে ডাক্তারেরা অনেক চেষ্টা করছেন ভালো করার। অনেক টাকা ধার করেছি। এবার সবচেয়ে বেশি খরচ হলো। দীর্ঘদিন ধরে হাসপাতালে থাকার কারণে খরচ বেশি হচ্ছে। বাড়িতে আর যাইনি। একবার বাড়িতে গেলে এক হাজার টাকা খরচ আছে। এই হাসপাতালের বারান্দায় পড়ে থাকি।’
কথা বলতে বলতে আইসিইউর ভেতর থেকে ছেলের বউ সুমি ডাক্তারের লেখা একটা স্লিপ নিয়ে এলেন। একটা ওষুধ লেখা তাতে। আলেয়ার কাপড়চোপড় রাখার ব্যাগে ছোট একটা হাতব্যাগ আছে। সেখানে অনেক খুঁজলেন। কিন্তু টাকা পেলেন না। ‘টাকা নেই। ছেলে আসলে তখন দেখব। ডাক্তারদের বলো টাকা নেই। পরে আনব’, সুমিকে উদ্দেশ্য করে বললেন আলেয়া।
সুমি অসহায়ের মতো তাকিয়ে। দীর্ঘদিন ছেলেকে নিয়ে যুদ্ধ করছেন। ক্লান্ত এখন। একমাত্র ছেলে এই ভালো এই খারাপ। ছেলের অসুস্থতায় রুবেলও ঠিকমতো চাকরি করতে পারছেন না। দুধের শিশুটি সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত শান্তি নেই তাদের। ঈদ ‘আনন্দ’ তারা এখন স্বপ্নেও ভাবেন না।
সুমি বললেন, ‘ছেলেটিকে নিয়ে অনেক কষ্ট করছি। রোজার ঈদও আমাদের এখানে কেটেছে। কোরবানিও হয়তো কাটবে। তবু ছেলেটা সুস্থ হোক। বেঁচে থাকলে আরও ঈদ আসবে।’






