ইন্টারনেট প্রতিষ্ঠানে তাণ্ডবে গ্রেপ্তার ৯
হামলা শেষে নিরাপদে ফেরার কৌশল মাইকেল-সানি-রাজুর

ছবি : গ্রাফিক্স
বিদেশে পলাতক সাজ্জাদ আলী ওরফে বড় সাজ্জাদের অনুসারী হিসেবে পরিচিত ভয়ঙ্কর সন্ত্রাসী মোবারক হোসেন ইমন বা ডেভিড ইমন। চট্টগ্রামে ইন্টারনেট সেবা প্রতিষ্ঠানের কাছে এককালীন দুই কোটি ও মাসে ১০ লাখ টাকা চাঁদা চেয়ে না পেয়ে ক্ষুব্ধ হন ইমন। অনুগত ও বিশ্বস্ত তিন ক্যাডার মাইকেল, সানি ও রাজুকে দায়িত্ব দেয় লোকজন নিয়ে সেই প্রতিষ্ঠানে হামলা করার। গ্রেপ্তারের পর মাইকেল র্যাবের কাছে ফাঁস করেছে ঘটনার পুরো ছক।
দেশজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি করা সেই হামলার প্রসঙ্গে র্যাবের চট্টগ্রাম জোনের অধিনায়ক লেফট্যানেন্ট কর্নেল মোহাম্মদ হাফিজুর রহমান আগামীর সময়কে জানালেন, ‘মাইকেল, রাজু ও সানি ঘটনার মূল মাস্টারমাইন্ড। ডেভিড ইমনের নির্দেশে তারা নগরীর বাকলিয়া, চকবাজার, বহদ্দারহাট ও রাউজান উপজেলা থেকে উঠতি বয়সের ৩০-৪০ জন তরুণকে নগরে এনে হামলা ঘটায়। প্রত্যেককে ৫০০ টাকা করে মজুরি দেওয়া হয়। তরুণদের অনেকে কোথায় হামলা করছে, কেন করছে এর কিছুই জানত না।’
নগরী ও জেলার বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে র্যাব হামলায় জড়িত মাইকেল রোহেন মিয়াসহ (৩১) মোট ৯ জনকে গ্রেপ্তার করেছে। বাকিরা হলেন- তুহিন (২২), আকবর হোসেন (৩৮), আব্দুল মুমিন (৩০), মাসাদ মিয়া (২৭), দিদার মিয়া (২২), সানজাত হাসান (১৮), সৈরত হোসেন (১৮) ও সাইফুদ্দিন (৩২)।
র্যাব কর্মকর্তাদের তথ্য, মাইকেলের মোবাইলে থাকা একটি ভিডিও ক্লিপে দেখা গেছে, ঘটনার দিন সকাল সাড়ে ১০টার দিকে হামলাকারীরা এক জায়গায় জড়ো হন। তাদের কীভাবে হামলা করবে এবং এরপর নিরাপদে ফিরে আসা হবে সে বিষয়ে ব্রিফ করেন মাইকেল। এরপর উচ্ছ্বসিতভাবে সবাই মিলে হৈ হুল্লোড় করে হামলার জন্য রওনা হন। সিসি ক্যামেরার ফুটেজ এবং সেই ভিডিও ক্লিপ দেখে হামলায় প্রত্যক্ষভাবে জড়িতদের শনাক্ত করা হয়েছে।
গ্রেপ্তারের পর জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্য ‘ক্রসচেক’ করে মাইকেল, সানি ও রাজু মূল সংগঠক হিসেবে প্রমাণ পাওয়া গেছে বলে জানালেন র্যাব কর্মকর্তা হাফিজুর।
গত ১৩ জুলাই দুপুরে নগরের বাকলিয়া এক্সেস রোডে ‘ডিজিটাল ডট নেট’ (ডিডিএন) নামের ইন্টারনেট সেবা প্রতিষ্ঠানটিতে হামলার ঘটনা ঘটে। সন্ত্রাসী ডেভিড ইমন প্রতিষ্ঠানটির মালিক আদিল বিন মামুনকে হামলার দুইদিন আগে একটি বিদেশি হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর থেকে কল দিয়ে চাঁদা দাবি করেন। অন্যথায় ব্যবসা বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দেন।
হামলার পর সেই ঘটনা উল্লেখ করে প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে চকবাজার থানায় মামলা করা হয়। এ পর্যন্ত পুলিশ ৭ জন ও র্যাব ১১ জনসহ মোট ১৮ জনকে গ্রেফতার করেছে।
লেফট্যানেন্ট কর্নেল হাফিজুর জানালেন, প্রকাশ্যে এমন তাণ্ডবের ঘটনা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও গণমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ার পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
জড়িতদের গ্রেপ্তারের জন্য মাঠপর্যায়ে কর্মকর্তাদের সরাসরি নির্দেশনা দেন। এরপর র্যাব, পুলিশ ও গোয়েন্দা ইউনিট (ডিবি) যৌথভাবে মাঠে নামে।
হামলার জন্য ভাড়া করা তরুণেরা প্রথমে বহদ্দারহাটে একটি বাসে করে এসে জড়ো হন বলে জানালেন র্যাবের এই কর্মকর্তা। বললেন, ‘বহদ্দারহাটে মাইকেল তাদের ব্রিফ দেন। এরপর তারা তিন ভাগ হয়ে একাধিক সিএনজি অটোরিকশা ও একটি অ্যাম্বুলেন্সে করে ঘটনাস্থলে যান। একটি ছোট দলকে বাকলিয়া এক্সেস রোডের মুখে রাখা যায়। তাদের পুলিশ-র্যাবসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীদের সদস্যদের নজরদারির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল।’
‘আরেকটি দলকে ইন্টারনেট ব্যবসা প্রতিষ্ঠানটির আশপাশের ভবনের নিচে ভাগ করে রাখা হয়। তারা খুব সাধারণ বেশে ছিলেন। হামলাকারীরা আক্রান্ত হলে তাদের ব্যাকআপ টিম হিসেবে ব্যবহারের জন্য রাখা হয়েছিল। মূল দল ভেতরে ঢুকে হামলা-ভাঙচুর করে। এদের সংখ্যা ২০ জনের মতো। হামলা করে ফেরত যাবার পর সানি তাদের প্রত্যেককে ৫০০ টাকা করে দেন।’
হামলাকারীদের বিষয়ে র্যাব কর্মকর্তা লেফট্যানেন্ট কর্নেল হাফিজুর রহমান আরও বললেন, ‘হামলায় যারা অংশ নিয়েছে তারা কিশোর গ্যাং টাইপের। তবে বয়স কিশোরের চেয়ে সামান্য বেশি। ব্রোকার টাইপের এসব লোক। নির্দেশ পেয়েই হামলা করে এসেছে। বিনিময়ে কিছু টাকা পেয়েছে। এটা যে এত বড় ঘটনা হয়ে যাবে তারা বুঝতে পারেনি।’
হামলার ঘটনার সঙ্গে বড় সাজ্জাদের কোনো সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে কি না, জানতে চাইলে তিনি বললেন, ‘মোবারক হোসেন ইমন ও রায়হান এই মুহূর্তে বড় সাজ্জাদের বাহিনী লিড করে। তাদের সঙ্গে বড় সাজ্জাদের যোগাযোগ আছে এমন তথ্য আমরা পেয়েছি। এরপর মাইকেল, সানি, রাজু। এদের সঙ্গে যোগাযোগ আছে ইমনের। এরা মূলত রায়হান বা ইমনের নির্দেশেই কাজ করে।’




