চট্টগ্রাম বোর্ডে ফল বিপর্যয়ের নেপথ্যে ৪ কারণ

এইচএসসির ফল হাতে পেয়ে আনন্দ উদযাপন করছেন শির্ক্ষাথীরা। চট্টগ্রাম কলেজ থেকে সকালে তোলা ছবি। রনি দে, চট্টগ্রাম
চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার ফল বিপর্যয়ের পেছনে চারটি মূল কারণ চিহ্নিত করেছেন সংশ্লিষ্টরা। এগুলোর মধ্যে অন্যতম পূর্ণাঙ্গ সিলেবাসে পরীক্ষা, পরিবর্তিত মূল্যায়ন পদ্ধতি এবং দক্ষ শিক্ষকের অভাব। এ ছাড়া সৃজনশীল পদ্ধতিসহ আরও কিছু কারণের কথা উল্লেখ করেছেন তারা।
আজ শনিবার ঘোষিত ফলাফলে পাসের হার দাঁড়িয়েছে ৫২ দশমিক ০৭ শতাংশ, যা গত ২২ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। কমেছে জিপিএ ৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যাও। তবে ফল বিপর্যয়ে শিক্ষাব্যবস্থার দুর্বলতাকে দায়ী করছেন শিক্ষাবিদরা।
বোর্ড মিলনায়তনে ফল বিপর্যয়ের কারণ ব্যাখ্যা করেন পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক পারভেজ সাজ্জাদ চৌধুরী। তিনি এবারের ফল বিপর্যয়ের পেছনে চারটি কারণ উল্লেখ করেছেন। এগুলো হলো উত্তরপত্র মূল্যায়নে রুব্রিকস পদ্ধতি, ছয় বছর পর পূর্ণাঙ্গ সিলেবাসে পরীক্ষা, সৃজনশীল পদ্ধতি চালু থাকলেও শিক্ষার্থীদের বিশ্লেষণী দক্ষতার অভাব এবং মোবাইল-ইন্টারনেটে অতিরিক্ত আসক্তি। দক্ষ শিক্ষকের অভাবকেও ফলাফল বিপর্যয়ে ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করছেন সাজ্জাদ চৌধুরী।
চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের অধীন চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, রাঙামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ি জেলার শিক্ষার্থীরা এবার এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয়। মোট পরীক্ষার্থী ছিল ৯৯ হাজার ৮৭৯ জন। এর মধ্যে পরীক্ষায় অংশ নেয় ৯৬ হাজার ৩৩৫ জন এবং পাস করে ৫০ হাজার ১৬৬ জন। অংশ নেওয়া ৫৪ হাজার ৬৭১ জন ছাত্রীর মধ্যে পাস করেছে ২৯ হাজার ৮২২ জন। অন্যদিকে, ৪১ হাজার ৬৬৪ জন ছাত্রের মধ্যে পাস করেছে ২০ হাজার ৩৪৪ জন।
এবার জিপিএ ৫ পেয়েছে ২ হাজার ৯২৯ জন শিক্ষার্থী। গত বছর (২০২৫) এ সংখ্যা ছিল ৬ হাজার ৯৭ জন এবং ২০২৪ সালে ১০ হাজার ২৬৯ জন। এবার জিপিএ ৫ পাওয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে ছাত্রী ১ হাজার ৫৯৬ জন এবং ছাত্র ১ হাজার ৩৩৩ জন।
বোর্ডের সংরক্ষিত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০০৪ সালে পাসের হার ছিল সবচেয়ে কম ৪৭ দশমিক ৭৩ শতাংশ। এরপর আর কখনো পাসের হার এত নিচে নামেনি। এমনকি ২০২১ সালে পাসের হার ছিল ৮৯ দশমিক ৪৪ শতাংশ এবং ২০২২ সালে ৮০ দশমিক ৫০ শতাংশ। ফলে এবারের ফলাফল গত দুই দশকের বেশি সময়ের মধ্যে বোর্ডটির সবচেয়ে খারাপ ফল হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
রুব্রিকস পদ্ধতি ও পূর্ণাঙ্গ সিলেবাসের প্রভাব
ফল বিপর্যয়ের অন্যতম কারণ হিসেবে উত্তরপত্র মূল্যায়নে রুব্রিকস পদ্ধতির প্রয়োগকে উল্লেখ করেছে শিক্ষা বোর্ড। এ পদ্ধতিতে নির্দিষ্ট মানদণ্ড অনুযায়ী উত্তরপত্র মূল্যায়ন করা হয়। একটি উত্তরে কোন কোন বিষয় থাকতে হবে এবং প্রতিটি অংশের জন্য কত নম্বর বরাদ্দ থাকবে, তা আগে থেকেই নির্ধারিত থাকে। ফলে প্রশ্নের চাহিদা অনুযায়ী তথ্য, ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ উপস্থাপন করতে না পারলে প্রত্যাশিত নম্বর পাওয়া কঠিন হয়। তবে এ পদ্ধতিতে পরীক্ষকদের যথাযথ প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছিল কি না, তা-ও পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
অন্যদিকে, করোনার কারণে ২০২০ সালে এইচএসসি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়নি। পরবর্তী কয়েক বছর বিভিন্ন মাত্রায় সংক্ষিপ্ত সিলেবাসে পরীক্ষা নেওয়া হয়। দীর্ঘ বিরতির পর ২০২৬ সালে পূর্ণাঙ্গ সিলেবাসে পরীক্ষা হওয়ায় শিক্ষার্থীদের সব অধ্যায় প্রস্তুত করতে হয়েছে। ফলে নির্বাচিত অধ্যায় ও সাজেশননির্ভর প্রস্তুতি অনেকের জন্য যথেষ্ট হয়নি।
সৃজনশীল পদ্ধতি, মুখস্থনির্ভরতা ও মোবাইল আসক্তি
শিক্ষার্থীদের বিশ্লেষণী দক্ষতা বাড়াতে সৃজনশীল প্রশ্ন পদ্ধতি চালু করা হলেও অনেক শিক্ষার্থী এখনো গাইড বইয়ের উত্তর মুখস্থ করে পরীক্ষার প্রস্তুতি নেয়। ফলে উদ্দীপকভিত্তিক প্রশ্নে নিজস্ব বিশ্লেষণ ও যুক্তি উপস্থাপন করতে গিয়ে তারা সমস্যায় পড়ে।
এ ছাড়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ভিডিও দেখা ও অনলাইন গেমে দীর্ঘ সময় ব্যয় করায় শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় মনোযোগ কমছে বলে মনে করছে বোর্ড। এতে নিয়মিত পড়াশোনা ও পাঠ্যবই অনুশীলন ব্যাহত হচ্ছে।
দক্ষ শিক্ষকের সংকটও বড় কারণ
শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতির ঘাটতির পাশাপাশি দক্ষ শিক্ষকের অভাবকেও ফল বিপর্যয়ের অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক পারভেজ সাজ্জাদ চৌধুরী।
তিনি বললেন, ‘আমাদের দক্ষ শিক্ষকের অভাব রয়েছে। বিশেষ করে আইসিটি শিক্ষকদের চাকরি হওয়ার পরও বেশি বেতনে অন্য চাকরিতে চলে যাওয়ার প্রবণতা রয়েছে। অনেক প্রতিষ্ঠানে খণ্ডকালীন শিক্ষক দিয়ে কোনোমতে ক্লাস নেওয়া হচ্ছে। এভাবে ভালো ফলাফল আশা করা কঠিন।
এবার চট্টগ্রাম বোর্ডের অধীনে থাকা ২৮৩টি কলেজের মধ্যে ৩টি কলেজ থেকে কোনো শিক্ষার্থীই পাস করতে পারেনি (শূন্য পাস)। গত বছর শূন্য পাস করা কলেজের সংখ্যা ছিল ৫টি। অন্যদিকে, শতভাগ পাস করেছে এমন কলেজের সংখ্যা মাত্র ৬টি। গত বছর ছিল ৮টি এবং ২০২৪ সালে ১৩টি কলেজে শতভাগ পাসের রেকর্ড ছিল।
বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, এবার এক বিষয়ে অকৃতকার্য হয়েছে ২২ হাজার ১১৪ জন শিক্ষার্থী, যা মোট পরীক্ষার্থীর ২২ দশমিক ৯৬ শতাংশ। এ ছাড়া পরীক্ষায় অসদুপায় অবলম্বনের দায়ে বহিষ্কার হয়েছে ২৭ জন শিক্ষার্থী। সব থেকে বেশিসংখ্যক শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়েছে ২ বিষয়ে। একটি তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আরেকটি হলো ইংরেজিত।
শিক্ষাব্যবস্থার দুর্বলতাও
বোর্ডের ব্যাখ্যার সঙ্গে পুরোপুরি একমত নন একুশে পদকপ্রাপ্ত সাংবাদিক ও শিক্ষাবিদ আবুল মোমেন। তার মতে, শিক্ষার্থীদের ভিত্তিগত জ্ঞানের দুর্বলতা, শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের মান এবং শিক্ষাব্যবস্থার ত্রুটিও ফল বিপর্যয়ের জন্য দায়ী।
আগামীর সময়কে তিনি বললেন, ‘আমাদের গোড়ায় গলদ। প্রতিটি ক্লাসেই শিক্ষার্থীরা এমন কিছু বিষয় বাদ দিয়ে পরবর্তী ক্লাসে চলে যায়, যার ঘাটতি পরের শ্রেণিতে গিয়ে তাদের ভোগায়। আমাদের শিক্ষার্থীদের বেসিক এতটাই দুর্বল যে প্রশ্ন একটু এদিক-সেদিক হলেই তারা আর উত্তর করতে পারে না। শিক্ষকরাও ক্লাসে মনোযোগী নন। অনেকেই দায়সারা ক্লাস নেন।’
২০২২ সালে চালু হওয়া নতুন শিক্ষাক্রমের ভালো দিকগুলো ধরে রাখার সুযোগ ছিল বলেও মনে করেন তিনি। তার মতে, শুধু পরীক্ষায় ভালো করার জন্য পড়াশোনার প্রবণতা থেকে শিক্ষার্থীদের বের করে আনা জরুরি। শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের ধরন, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ ও গাইড বইনির্ভরতাও পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
অন্যদিকে, চট্টগ্রাম কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক মোহাম্মদ মোজাহেদুল ইসলাম চৌধুরী মনে করেন, করোনার পর থেকে শিক্ষার্থীদের পড়ালেখায় অমনোযোগিতা বেড়েছে। পরীক্ষার ধরন পরিবর্তিত হলেও অনেক শিক্ষার্থী তা বুঝতে পারেনি।
তার মতে, এবার পরীক্ষার খাতা যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা হয়েছে। যারা পড়াশোনা করেছে, তারা পাস করেছে। আর যারা পড়াশোনা করেনি, তারা পাস করতে পারেনি। ভালো ফলাফল করতে হলে ছাত্র-ছাত্রীদের শিক্ষার্থী হতে হবে, খালি পরীক্ষার্থী হলে হবে না।



