স্টিয়ারিং ত্রুটি, জাহাজ গাইডের অনভিজ্ঞতায় দুর্ঘটনা!

সংগৃহীত ছবি
চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে শুক্রবার গমবাহী জাহাজের সঙ্গে ডিজেলবাহী ট্যাংকারের দুর্ঘটনায় দুটি প্রধান কারণ সামনে এসেছে। একটি জাহাজের স্টিয়ারিংয়ের ত্রুটি। দ্বিতীয়টি, জাহাজ নেভিগেশনের দায়িত্বে থাকা লোকাল গাইড (যারা বে পাইলট নামে পরিচিত) অনভিজ্ঞতা। দুর্ঘটনার সময় তীব্র স্রোত ছিল। লোকাল গাইড জাহাজ নিরাপদ নোঙরের মতো দ্রুত বিচক্ষণ সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি বলেই দুর্ঘটনা। তবে সৌভাগ্যক্রমে জাহাজ সাগরে ডুবে যাওয়া এবং বিস্ফোরণ থেকে বেঁচে যায়।
চট্টগ্রাম বন্দরের মেরিন বিভাগ, সরকারের নৌবাণিজ্য অধিদপ্তর, দেশি-বিদেশি জাহাজে কর্মরত মাস্টার মেরিনারদের সঙ্গে কথা বলে এমন তথ্য জানা গেছে।
চট্টগ্রাম বন্দর সদস্য (হারবার ও মেরিন) কমডোর আহমেদ আমিন আবদুল্লাহ অবশ্য এসব বিষয়ে মন্তব্য করতে চাননি।
ঘটনার পর দুই সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে নৌবাণিজ্য অধিদপ্তর। সাত দিনের কমিটি রিপোর্ট দেবে। প্রতিষ্ঠানের প্রধান ক্যাপ্টেন শেখ জালাল উদ্দিন গাজী জানালেন, আমি দেখেছি ৯০ শতাংশ জাহাজ দুর্ঘটনার কারণ হিউম্যান এরর। এটিও ব্যতিক্রম হবে না। কর্ণফুলীর মোহনা, সাগরের স্রোত কেমন আমরা সবাই জানে। হঠাৎ করেই স্রোত এসেছে বিষয়টি এমন না। নেভিগেশনের মূল কথাই হলো তথ্য সংগ্রহ, এসেসমেন্ট, এরপর পরিকল্পনা এবং বাস্তবায়ন। বন্দর মোহনা ও বহির্নোঙরের মতো ক্রিটিক্যাল স্থানের এগুলোর সমন্বয়ের জন্য অভিজ্ঞতার প্রয়োজন। তা না হলে দুর্ঘটনা ঘটবে। ডিজাস্টার এড়াতে এখনই সতকর্তার প্রয়োজন।’
বহির্নোঙরে সাগরের আলফা অ্যাংকরেজে আগে থেকেই নোঙর করা ছিল গমবাহী বিদেশি জাহাজ ‘এমভি সান শাইন’। শুক্রবার সকালে জলসীমায় পৌঁছে একই এলাকায় নোঙর করতে গিয়ে ট্যাংকার ‘এমটি সি স্পাইক’ নিয়ন্ত্রণ হারায় এবং দাঁড়িয়ে থাকা সানশাইন জাহাজকে ধাক্কা দেয়। ব্যাপক ধাক্কায় ‘এমটি সি স্পাইক’ জাহাজের নিচের ওয়াটারলাইনে প্রায় দেড় বর্গমিটার বড় মারাত্মক ছিদ্র তৈরি হয় এবং ক্ষতিগ্রস্ত হয় জাহাজের সুপারস্ট্রাকচার।
আঘাত এতটাই মারাত্নক ছিল ‘সি স্পাইক’ জাহাজের ছিদ্র দিয়ে পানি প্রবেশ করে ইঞ্জিন রুমের নিচে সম্পূর্ণ প্লাবিত হয়। সেখানে জেনারেটর ও প্রধান ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে জাহাজে সম্পূর্ণ ব্লাকআউট বা বিদ্যুৎ বিপর্যয় ঘটে। শুক্রবার রাতে জরুরি ব্যাটারি চালিয়ে জাহাজের যোগাযোগ ব্যবস্থা সচল করা হয়। দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে চট্টগ্রাম বন্দর ও কোস্ট গার্ডের টিম ও টাগবোট। জোয়ার-ভাটায় অনাকাঙ্ক্ষিত বিপর্যয় এড়াতে দুর্ঘটনাস্থলে ফ্লোটিং অয়েল বুম স্থাপন করে জাহাজ ভাসিয়ে রাখা হয়েছে। সমস্ত কার্গো ট্যাংক বন্ধ, সুরক্ষিত অবস্থায় রাখা হয়। তবে ইঞ্জিন রুম সম্পূর্ণ প্লাবিত হওয়া এবং পাওয়ার সিস্টেম বিকল হওয়ায় জাহাজটি এখন চলাচলের অনুপযোগী।
সৌভাগ্যবশত জাহাজে থাকা ২৪ ফিলিপাইনের নাবিক আতঙ্কিত হলেও হতাহত হননি। ডিজেলের ট্যাংকগুলো অক্ষত থাকায় সমুদ্রে তেল ছড়িয়ে পড়েনি। ফাটল দিয়ে জাহাজের তেলের ট্যাংকেও পানি ঢোকেনি। জাহাজে ৩৩ হাজার টন ডিজেল ছিল; যার পুরোটাই দাহ্য পদার্থ। জাহাজের ধাক্কায় আগুন লেগে গেলে বড় বিপর্যয় হতো সাগরে। আগুন-তেল ছড়িয়ে আশপাশের জাহাজে আক্রান্ত হতো। তখন সেটি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেত।
দেশীয় জাহাজ উদ্ধারকারী প্রতিষ্ঠান আমেরিকান 'রিজলভ মেরিন'র দেশীয় প্রতিনিধি হিসেবে ‘সি স্পাইক’ জাহাজ উদ্ধার ও সালভেজ কার্যক্রম শুরু করেছে দেশীয় ‘প্রান্তিক স্যালভেজ'। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্যাপ্টেন গোলাম সারোয়ার জানিয়েছেন, আমাদের টিম শুক্রবার সন্ধ্যা থেকেই সেখানে সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা তদারকি করছে। জাহাজ খুবই ক্রিটিক্যাল অবস্থায় আছে। জাহাজের ইঞ্জিন রুমে পানি ভর্তি। পানি সরানোর পাম্পও কাজ করছে না। জাহাজের ট্যাংকে আছে এতগুলো ডিজেল। এখন এসেসমেন্ট করছি কীভাবে নিরাপদে জাহাজকে উদ্ধার করা যায়।’
জাপানের মারিফু বন্দর থেকে ‘গ্যাস অয়েল’ (আল্ট্রা লো সালফার ডিজেল) নিয়ে চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে পৌঁছায় মার্শাল আইল্যান্ডের পতাকাবাহী জাহাজ ‘এমটি সি স্পাইক’। এই ডিজেল আনা হয়েছিল সরকারি বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের জন্য।
জাহাজের শিপিং এজেন্ট প্রাইড শিপিং তাদের নিজস্ব বে পাইলট আবদুল কাদিরের পরিচালনায় জাহাজটি বহির্নোঙরের আলফা অ্যাংকরেজের দিকে অগ্রসর হওয়ার সময় দুপুর সোয়া ১২টায় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে নোঙর করে রাখা ‘এমভি সান শাইন’ জাহাজে সজোরে ধাক্কা দেয়। এই ধাক্কাটাই এখন আলোচনার মূল বিষয় হয়েছে।
‘সি স্পাইক’ জাহাজের মাস্টার বন্দরকে জানিয়েছেন, জাহাজটি তখন পূর্ণ সক্ষমতা বোঝাই করা ছিল। সেই জরুরি মুহূর্তে স্টিয়ারিং ধীরগতিতে কাজ করায় জাহাজটির দিক পরিবর্তন করা সম্ভব হয়নি। তখন সাগর উত্তাল থাকায় সানশাইনকে গিয়ে ধাক্কা দেয় সি স্পাইক।
দেশি-বিদেশি জাহাজ চালান এমন একাধিক সিনিয়র ক্যাপ্টেন জানালেন, সি স্পাইক ট্যাংকার যখন নোঙর করছিল তখন আশপাশে বেশ কয়টি জাহাজ ছিল। তখন জোয়ারের সময় শেষ সময়। সেই সময় সাগরে তীব্র স্রোত। একজন অভিজ্ঞ পাইলট স্রোত, আশপাশের অবস্থান পর্যবেক্ষণ করেই দ্রুত বিচক্ষণ সিদ্ধান্ত নিয়েই জাহাজ মুভমেন্ট করবেন-এটাই নিয়ম। অভিজ্ঞতার ঘাটতির কারণে সেই গাইড তখন সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারেননি। সতকর্তা হিসেবে টাগবোটও নেননি। ফলে দুর্ঘটনা ঘটেছে।
বন্দরের মেরিন বিভাগও বলছে, নেভিগেশনের দায়িত্বে থাকা স্থানীয় গাইডের দূরদর্শিতা ও উপযুক্ত সমন্বয়ের অভাব ছিল। প্রতিকূল আবহাওয়া ও সামুদ্রিক প্রবল স্রোতের পূর্বাভাসের কথা জানা থাকা সত্ত্বেও নোঙররত জাহাজের খুব কাছাকাছি বিপজ্জনকভাবে অগ্রসর হওয়া এবং সময়মতো সঠিক নেভিগেশনাল সিদ্ধান্ত না নেওয়া ভুল সিদ্ধান্ত ছিল। তাই সে বে পাইলটের ভূমিকা পর্যালোচনার সুপারিশ এসেছে।
সি স্পাইক জাহাজের বে পাইলট আবদুল কাদিরকে অনেকবার ফোন-মেসেজ দেওয়া হলেও তিনি সাড়া না দেওয়ায় তার বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি। পরে প্রাইড শিপিংয়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নজরুল ইসলাম জানালেন, ‘আবদুল কাদির মেরিন একাডেমির ইনস্ট্রাকটর। ফলে অভিজ্ঞতার ঘাটতির অভিযোগ সত্য নয়। এটা প্রাকৃতিক দুর্যোগ।’






