শিপইয়ার্ডে ৯ মৃত্যু : লুকোচুরির উদ্ধার তৎপরতায় বেশি প্রাণহানি
- আড়াই ঘণ্টা পর ফায়ার সার্ভিসে খবর
- গ্যাসমুক্ত ছিল না জাহাজ
- সুরক্ষা সামগ্রী ছাড়া উদ্ধারে গিয়ে বেশি হতাহত
- দুর্ঘটনা মোকাবিলায় প্রস্তুতির অভাব

ছবি: আগামীর সময়
এক বছর আগেই বাংলাদেশের সীতাকুণ্ড উপকূলে সনাতন পদ্ধতিতে জাহাজ ভাঙা আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হয়েছে। পরিবেশবান্ধব ‘গ্রিন ইয়ার্ডে স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে জাহাজ ভাঙা চলছে এখন। পরিবেশবান্ধব উপায়ে জাহাজ কাটা চললেও শ্রমিকের নিরাপত্তা কতটা বাস্তবায়িত হয়েছে সে প্রশ্ন বার বার উঠছে।
জাহাজভাঙা কারখানার দুর্ঘটনা এই প্রশ্নটিকে সামনে নিয়ে আসছে। চলতি বছর এ পর্যন্ত ২৯টি দুর্ঘটনায় ১১ শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছে অন্তত ৫০ জন। সবশেষ শুক্রবার সকালে ভাটিয়ারীর ফেরদৌস স্টিল নামে ইয়ার্ডে গ্যাস বিষক্রিয়ায় ৯ জনের মৃত্যু উপেক্ষিত শ্রম নিরাপত্তার বিষয়টিকে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল। জাহাজ কাটার সময় ইঞ্জিন কক্ষের একটি ট্যাংক থেকে গ্যাস নিঃসরণ হয়ে শ্রমিকেরা আক্রান্ত হয়।
প্রশ্ন উঠেছে এই ধরনের ঘটনার পূর্ব প্রস্তুতি নিয়ে। এমন ঘটনা ঘটলে কী কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে, উদ্ধার তৎপরতা কেমন হবে কিংবা করণীয় কি এই বিষয়গুলো নিয়ে কোনো প্রস্তুতি ইয়ার্ডটির পরিপূর্ণভাবে ছিল বলে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো মনে করছে না। এমনকি দুর্ঘটনা ঘটার প্রায় আড়াই ঘণ্টা পর কুমিরা ফায়ার স্টেশনকে সংবাদ দেওয়া হয় উদ্ধার কাজের জন্য।
দুর্ঘটনা ঘটে সকাল সাড়ে ৮টার দিকে। ফায়ার স্টেশন সংবাদ পায় সকাল ১০টা ৫০ মিনিটে। সবচেয়ে বড় কথা আগে থেকেই এই ইয়ার্ডটিতে নিরাপত্তা ঝুঁকি ছিল। যার জন্য কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর গত মাসে শ্রম আদালতে একটি মামলাও করেছে।
সংস্থাটির চট্টগ্রামের উপমহাপরিদর্শক মোহাম্মদ মাহবুবুল হাসান বলেন, ‘গ্রিন ইয়ার্ড হওয়ার পর এটা একটা বড় ধরণের দুর্ঘটনা। এতগুলো মানুষ মারা যাওয়া সাধারণত ইয়ার্ডে ঘটে না। বিষয়টি কেন ঘটল, কারও গাফিলতি রয়েছে কিনা তা তদন্ত করে দেখা হবে। গ্রিন ইয়ার্ডটি পর্যাপ্ত ব্যবস্থা রেখেছিল কিনা সেটাও খতিয়ে দেখা হবে। তবে ইয়ার্ডটির নিরাপত্তা ঘাটতি ছিল। যে জন্য একাধিক নোটিশের পর তাদের বিরুদ্ধে একটি মামলা করা হয়েছিল।’
২০০৯ সালে গৃহীত জাহাজ পুনর্ব্যবহার সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক চুক্তি হংকং কনভেনশনে স্বাক্ষর করেছে বাংলাদেশ। এই চুক্তি বাস্তবায়নের শেষ সময় ছিল গত বছরের ৩০ জুন। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, যারা গ্রিন ইয়ার্ড বা পরিবেশবান্ধব কারখানা হিসেবে সনদ পেয়েছে, এখন ওই প্রতিষ্ঠানগুলোই জাহাজ আমদানি করতে পারবে।
ছয় সাত বছর আগে ইয়ার্ড ছিল প্রায় ১৫০টি। এর মধ্যে ১০৫টি কারখানাকে পরিবেশবান্ধব (গ্রিন) করার লক্ষ্যে উন্নয়নকাজ করার অনুমোদন দিয়েছিল শিল্প মন্ত্রণালয়। গ্রিন করার জন্য বড় অংকের বিনিয়োগের দরকার। এই খরচ এবং ব্যবসা মন্দার কারণে বেশির ভাগ ইয়ার্ড গ্রিন করতে পারছে না।
২০১৭ সালে দেশের প্রথম গ্রিন ইয়ার্ড হিসেবে যাত্রা শুরু করে পিএইচপি শিপব্রেকিং অ্যান্ড রিসাইক্লিং ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড। বর্তমানে ২৩টি ইয়ার্ড গ্রিন সনদ পেয়েছে বলে জানান বাংলাদেশ শিপ ব্রেকিং রিসাইক্লিং অ্যাসোসিয়েশনের (বিএসবিআরএ) সভাপতি মোহাম্মদ মহসিন। আরও ১৬টি ইয়ার্ড গ্রিন ইয়ার্ড করার জন্য অবকাঠামো উন্নয়ন করে যাচ্ছে। তবে কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান অধিদপ্তরের উপমহাপরিদর্শক মোহাম্মদ মাহবুবুল হাসান ২৭টি গ্রিন ইয়ার্ড আছে বলে জানান।
গ্যাসমুক্ত ছিল না জাহাজ
গ্রিন ইয়ার্ড মানে অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহার, মেঝে পাকাকরণ, কায়িক শ্রম নিরসন, গ্যাস ও বিস্ফোরক মুক্ত করে জাহাজ কাটা এসব নিশ্চিত করা অন্যতম। কিন্তু ফেরদৌস স্টিল জাহাজটি কাটার ক্ষেত্রে এসব মেনেছিল কিনা তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। এমটি রাসি নামে এলএনজি পরিবহনে ব্যবহৃত জাহাজটি প্রায় এক বছর আগে কাটার ছাড়পত্র পায়। জাহাজ কাটার আগে তা পরিদর্শন করে ছাড়পত্র দেয় বাংলাদেশ জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ বোর্ড।
বোর্ডের মহাপরিচালক এ এস এম শফিউল আলম তালুকদার আগামীর সময়কে বলেন, জাহাজটি অনেকদিন ধরে কাটা হচ্ছিল। এটা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেই অনুমোদন দেওয়া হয় কাটার। কীভাবে গ্যাস লিকেজ হলো কিংবা নতুন করে গ্যাস জমলো তা তদন্তে উঠে আসবে। ধারণা করা হচ্ছে কার্বন মনোক্সাইড গ্যাসে এই ঘটনা ঘটেছে।
নিয়ম অনুযায়ী বহিঃনোঙ্গরে আসার পর বিস্ফোরক অধিদপ্তরেরও জাহাজ পরিদর্শন করে গ্যাস ও বিস্ফোরক মুক্ত সনদ দেয়। এক্ষেত্রেও তা প্রতিপালন করা হয়েছে কিনা কিংবা সনদ প্রাপ্তির পরও কীভাবে গ্যাস লিকেজ হলো তা বড় প্রশ্ন হয়ে দেখা দিয়েছে। মূলত জাহাজটির ব্যালেন্স ট্যাংক থেকে এই গ্যাস নিঃসরণ হয় বলে জানা গেছে।
এ ব্যাপারে বক্তব্য জানতে বিস্ফোরক অধিদপ্তর চট্টগ্রামের সহকারী পরিদর্শক এস এম সাখাওয়াত হোসেনকে বার বার ফোন করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।
উদ্ধারকাজে অদূরদর্শীতা
দুর্ঘটনার পর প্রথমে মালিকপক্ষ বিষয়টি চুপচাপ মেটাতে চেয়েছিল বলে অভিযোগ। নিজেরা নিজেরা উদ্ধার কাজ চালাচ্ছিল। ফায়ার সার্ভিস, পুলিশ বা অন্য কোনো উদ্ধারকারী সংস্থাকে খবর দেওয়া হয়নি। একপর্যায়ে স্থানীয় লোকজন জোরপূর্বক ঢুকে প্রথমে উদ্ধার তৎপরতা চালায়। কিন্তু উদ্ধার করতে গিয়ে স্থানীয় লোকজনও অসুস্থ হয়ে পড়েন। তার আগে উদ্ধার করতে যাওয়া শ্রমিকেরাও অসুস্থ হয়ে পড়েন।
হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আহত মোহাম্মদ সেলিম বলেন, ‘চিৎকার শুনে এগিয়ে যাই উদ্ধার করতে। কিন্তু গিয়ে নিজেই আক্রান্ত হয়ে পড়ি। আর কিছুক্ষণ থাকলে মারা যেতাম। আমার আগে আরও কয়েকজন উদ্ধারে গিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েন।’
অপর এক প্রত্যক্ষদর্শী আঙ্গুর আলী বলেন, নিহত খোকন অন্যদের উদ্ধার করতে গিয়ে নিজেই মারা যান।
এ ছাড়া শ্রমিক এবং স্থানীয় লোকজন অভিযোগ করেন, কয়েকজনকে উদ্ধার করে ইয়ার্ডের মেঝেতে রেখে দেওয়া হয়। তাদের জন্য কোনো অক্সিজেনের ব্যবস্থা ছিল না। এ ছাড়া অ্যাম্বুলেন্সও ছিল না। এমনকি উদ্ধার করতে যাওয়া শ্রমিকদের সুরক্ষা মাস্কও ছিল না। যদি ফায়ার সার্ভিস কিংবা অন্যান্য উদ্ধারকারী সংস্থা থাকতো তাহলে এত প্রাণহাণী নাও ঘটতে পারতো।
দুর্ঘটনা মোকাবিলায় আগাম প্রস্তুতি ইয়ার্ডের ছিল কিনা এমন এক প্রশ্নে শফিউল আলম তালুকদার বলেন, ‘প্রথমে যে তিনজন ওই কক্ষে ছিল তাদের উদ্ধার করতে গিয়ে বাকিরাও আক্রান্ত হয়। এরপর উদ্ধারে গিয়ে অনেকে আক্রান্ত হন। এক্ষেত্রে আরও সতর্ক হওয়া দরকার ছিল বলে প্রাথমিকভাবে মনে হয়েছে। উদ্ধার তৎপরতা চালানোর ক্ষেত্রে আরও সাবধানতা এবং এক্সপার্ট লোক দরকার ছিল।’
ফায়ার সার্ভিসের কুমিরা স্টেশনের কর্মকর্তা আল মামুন বলেন, ‘১০টা ৫০ মিনিটে সংবাদ পাওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যে আমরা পৌঁছি। এরপর তিনজনকে মৃত এবং তিনজনকে আহত অবস্থায় উদ্ধার করি। তার আগেই আরও ছয় সাতজনকে উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠানো হয়। স্থানীয় লোকজন উদ্ধার করে তাদের।’
অভিযোগ শ্রমিক সংগঠনের
গ্রিন হওয়ার পর পরিবেশ ও শ্রমিক সুরক্ষায় নেতিবাচক প্রভাব কমেছে বলে দাবি কারখানা মালিকদের। তবে শ্রমিক সংগঠনগুলো বার বার অভিযোগ করে আসছিল শ্রমিকদের নিরাপত্তা ঘাটতি এবং ন্যায্য মজুরির বিষয়টিতে। শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি বাস্তবায়ন না করার পাশাপাশি দিনে ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত কাজ করানোর অভিযোগ তুলছেন তারা।
জাহাজভাঙা শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন ফোরামের আহ্বায়ক ও ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র চট্টগ্রামের সাধারণ সম্পাদক তপন দত্ত বলেন, ‘হংকং কনভেনশন অনুযায়ী শ্রমিকদের জীবনমান উন্নত হয়নি। শ্রমিকদের সুরক্ষিত করার বিষয়টি কাগজে কলমে রয়ে গেছে এখনো। নিরাপত্তা ব্যবস্থার ঘাটতি ছিল বলেই এই দুর্ঘটনা ঘটেছে। গ্যাস ফ্রি থাকার কথা থাকলেও কেন গ্যাস নিঃসরণে তাদের মৃত্যু হলো? বিস্ফোরক অধিদপ্তর কীভাবে তাদের ছাড়পত্র দিল- এই বিষয়গুলো খতিয়ে দেখা দরকার। জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ বোর্ডে মালিক প্রতিনিধি আছে। কিন্তু কোনো শ্রমিক প্রতিনিধি নেই।’
তিনি আরও বলেন, ‘টাকা দিয়ে গ্যাস ফ্রি সনদ দিয়েছে বিস্ফোরক অধিদপ্তর। নইলে এই ঘটনা ঘটে না। উদ্ধার কিংবা আহতদের ব্যবস্থাপনার কোনো প্রস্তুতিও তাদের ছিল না। এখন হতাহতদের যথাযথ ক্ষতিপূরণ দাবি করছি আমরা।’
হংকং কনভেনশনে শ্রমিকদের পেশাগত স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়ও অগ্রগণ্য। বাংলাদেশ জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ আইন, ২০১৮ অনুযায়ী ইয়ার্ডের কার্যক্রম পরিচালিত হয়। এর আগে, ২০১১ সালে শিপব্রেকিং বিধিমালা হয়।
জানতে চাইলে বিএসবিআরএ সভাপতি মোহাম্মদ মহসিন আগামীর সময়কে জানান, ‘এই ঘটনা খুবই অনাকাঙ্ক্ষিত। সব নিয়ম নীতি মেনেই জাহাজ কাটা হচ্ছিল। তার পরও কী কারণে ঘটনা ঘটেছে তা খতিয়ে দেখতে দুটি পৃথক তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। আজ শিল্প মন্ত্রণালয়ের সচিব মহোদয় ইয়ার্ডটি পরিদর্শন করেছেন। তিনি দুটি কমিটি সমন্বয় করে কাজ করার জন্য নির্দেশ দিয়েছেন। হতাহত শ্রমিকদের যথাযথ ক্ষতিপূরণ দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।’
গ্রিন ইয়ার্ডে দুর্ঘটনা নতুন নয়
২০২৪ সালের ৭ সেপ্টেম্বর এস এন করপোরেশন নামে একটি গ্রিন ইয়ার্ডে বিস্ফোরণে ৬ জন মারা যায়। এ ছাড়া গত বছর শিপইয়ার্ডে ৫ জন নিহত হয়। এর আগে ২০২৩ সালে ৫ জন, ২০২২ সালে ১০ ও ২০২১ সালে ১৪ জন মারা যায়। ২০১৮ সালে ২০ শ্রমিক মারা গিয়েছিল বলে প্ল্যাটফর্মটি জানায়।
একসময় ৫০ হাজার শ্রমিক প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এই শিল্পে জড়িত ছিল। ইয়ার্ড কমে যাওয়ায় এখন শ্রমিক সংখ্যা ৫ থেকে ৬ হাজারের বেশি হবে না।









