বাড়ি ফিরে দুর্গতদের আরেক সংগ্রাম

চন্দনাইশের ধোপাছড়ি ইউনিয়নের বিধ্বস্ত ঘরবাড়ি। ছবি: সংগৃহীত
বৃষ্টি থেমেছে আগেই। পানিও নেমে গেছে বেশির ভাগ এলাকায়। কোথাও কোথাও এখনো হাঁটু পরিমাণ পানি। আশ্রয়কেন্দ্র কিংবা স্বজনদের বাড়িতে ওঠা লোকজন ফিরতে শুরু করেছেন আপন ঠিকানায়। ঘর কি আর অক্ষত আছে! কারও ঘর ভেঙে গেছে। আপন ঘর নিজের কাছেই অচেনা মনে হচ্ছে। চারদিকে বন্যার ক্ষতচিহ্ন।
এতদিন জীবন বাঁচাতে ঘর ছেড়েছিলেন তারা। আপাতত প্রাণে রক্ষা পেয়েছেন। এখন ঘরে ফিরে নতুন করে বাঁচার সংগ্রামে লিপ্ত হতে হচ্ছে বন্যাদুর্গত লোকজনকে। নতুন করে ঘর মেরামতের পাশাপাশি আয়-রোজগারের চিন্তাও পেয়ে বসেছে তাদের।
চন্দনাইশের ধোপাছড়ি ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের রিকশাচালক আকতার মিয়ার কথায় ধরা যাক। তিনি স্ত্রী ও চার সন্তান নিয়ে আজ আশ্রয়কেন্দ্র থেকে ঘরে ফিরেছেন। ঘর তো নয়, যেন ধ্বংসস্তূপ। স্থানে স্থানে বেড়া ভেঙে গেছে। বেড়ার গাঁথুনির মাটি সরে গেছে। ঘরের মেঝেতে হাঁটু পরিমাণ কাদা মাটি। দু-একটি আসবাব যা ছিল সব কাদায় মাখামাখি।
আকতার মিয়া জানান, ইউনিয়ন পরিষদ ভবনে গিয়ে উঠেছিলাম। সেখানে ছয় দিন ছিলাম। রিকশা চালাতে পারিনি এতদিন। চারদিকে রাস্তা এখনো ডুবে আছে। ঘরে এসেছি। কিন্তু এই ঘর ঠিক করতে আরও সময় লাগবে। কাদামাটি পরিষ্কার করতে হবে। মেরামতে টাকা লাগবে।
ধোপাছড়ি ইউনিয়নটি দুর্গম, বান্দরবান সীমান্ত এলাকায় পাহাড়ের পাশে। টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে এক সপ্তাহ পানির নিচে ছিল এখানকার বিভিন্ন ঘরবাড়ি। বাসিন্দারা আশ্রয় নিয়েছিলেন ইউনিয়ন পরিষদ ও পাশের তৈয়বিয়া মাদ্রাসায়। তিন দিন আগে থেকে পানি নামতে শুরু করে এখানে। তখন থেকে তারা ঘরে ফিরতে শুরু করেন। আজ মঙ্গলবার ইউনিয়ন পরিষদে থাকা সর্বশেষ ৮ পরিবার নিজগৃহে ফিরেছে।
ইউনিয়ন পরিষদের উদ্যোক্তা নজরুল ইসলাম জানান, ইউনিয়নের ১, ২, ৫ ও ৬ নম্বর ওয়ার্ডের বেশিরভাগ বাড়িতে পানি ঢুকেছে। ঘরগুলো ছিল বেড়ার। বাসিন্দারা পরিষদে এবং মাদ্রাসায় উঠেছিলেন। তাদের খাওয়াদাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। এখন ফিরে তারা নতুন করে ঘরবাড়ি পুনঃনির্মাণ কাজে লেগেছেন।
ধোপাছড়ি এলাকাটির বেশিরভাগ ঘর বেড়ার। অপর রিকশাচালক আবদুর রশিদ উঠেছিলেন এক আত্মীয়ের বাড়িতে। দুই সন্তান ও স্ত্রীসহ তিনি নিজের ঘরে ফিরেছেন গত সোমবার। তিনিও ঘর মেরামতে নেমে পড়েছেন।
রশিদ বলেছেন, ‘ঘরে গিয়ে এখনো পরিষ্কার করছি। খাট, টেবিল কাদায় নষ্ট হয়ে গেছে। বেড়ার নিচের মাটি সরে হা হয়ে আছে। টাকা নেই এখন। আস্তে আস্তে ঘর মেরামত করব।’
ধোপাছড়ি পাহাড়ি এলাকা। পাশ দিয়ে চলে গেছে সাঙ্গু নদী। এ কারণে বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে দ্রুত পানি উঠে গেছে ঘরবাড়িতে। এ ছাড়া চন্দনাইশ থেকে ইউনিয়নটির সড়ক যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায় টানা বৃষ্টির তৃতীয় দিন থেকে। সড়কপথে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরত্বে ইউনিয়নটি। এখানে ত্রাণ পৌঁছাতেও নানা ভোগান্তিতে পড়তে হয়। একমাত্র নদী পথে ওই এলাকায় যাওয়া যায়। সাঙ্গুর ঢলের পানি ঠেলে পৌঁছাতে লাগে এক ঘণ্টা। পানিতে তলিয়ে যাওয়ার চার দিন পর কিছু ত্রাণ ওখানে পৌঁছেছিল।
পূর্ব ধোপাছড়ির দিনমজুর আবদুল মাবুদও ঘরে ফিরেছেন মঙ্গলবার। তার ঘরটিও বেড়ার। ঘরটিতে গলা পর্যন্ত পানি উঠেছিল। তিনি স্ত্রী ও দুই মেয়েসহ আশ্রয় নিয়েছিলেন ইউনিয়ন পরিষদে। ফেরার পর ঘর আগের অবস্থায় পায়নি।
চন্দনাইশ পৌর সদরের দক্ষিণ হারালা এলাকা এখনো পানিতে ডুবে রয়েছে। মঙ্গলবার দুপুরেও ওখানে কোমরসমান পানি ছিল। কিছু কিছু ঘরে ছিল হাঁটুপানি। এলাকার নিজামউদ্দিনপাড়ার বাসিন্দা মোহছেনা খাতুন আশ্রয়কেন্দ্র থেকে সোমবার বাড়ি ফিরেছেন। এখনো বাড়ির সামনে পানি। ঘর থেকে পানি নেমে গেছে। এখন ঘর পরিষ্কার করে চলেছেন।
মোহছেনা বললেন, ‘স্বামী রিকশা চালান। কিন্তু এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে রিকশা চালাতে পারছেন না। রিকশাটিও পানিতে ডুবেছিল। এখন ঘর ও রিকশা দু-ই মেরামত করতে হবে।’
চন্দনাইশ উপজেলায় দুটি পৌরসভা এবং আটটি ইউনিয়ন এবারের বন্যায় প্লাবিত হয়। জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মোহাম্মদ মাসুদুর রহমান জানান, উপজেলার প্রায় ২৫০টি ঘরবাড়ি ও ৩০টি স্কুল বন্যায় ভেঙে গেছে। আংশিক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে আরও অনেক বেশি। সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৪০ কিলোমিটার।




