হাম কাড়ল এক পরিবারের চার শিশুর প্রাণ
- প্রাণ বাঁচানোর লড়াইয়ে পরিবারটির আরও দুই শিশু
- বান্দরবানের রুমার লেংটং খুমিপাড়ায় ১০ দিনে ৭ শিশুর মৃত্যু

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
হাসপাতালের শয্যায় সাত মাসের ছোট্ট লিংথং এ্যা খুমি ঘুমাচ্ছে। নাকে অক্সিজেন নল। মেয়ের পাশে আধশোয়া হয়ে পড়ে আছেন ক্লান্ত-শ্রান্ত মা। মা বৈনাংয়ের চোখে এখন রাজ্যের ঘুম। পুত্রশোকে অনেক কেঁদেছেন। এখনো সময়-অসময়ে কেঁদে ওঠেন। হামে আক্রান্ত হয়ে দুদিনের ব্যবধানে একে একে চলে গেছে তার দুই ছেলে খ্রেতং খুমি (৭) ও প্রেলং খুমি (৪)। বাকি দুই মেয়েও অসুস্থ। বড়টি কোনোরকমে সুস্থ হলেও ছোট্ট লিংথং লড়ছে।
ছেলে হারানো পঅ এং খুমি-বৈনাং খুমি দম্পতি যে এখন লড়াইয়ের সব জোর হারিয়ে ফেলেছেন। তবু চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের শিশুস্বাস্থ্য বিভাগে চিকিৎসাধীন মেয়েকে নিয়ে লড়ছেন এ দম্পতি। বান্দরবানের রুমা উপজেলার দুর্গম লেংটং খুমিপাড়ার বাসিন্দা তারা। শুধু এই দুজন নয়, গত ১০ দিনে হামে আক্রান্ত হয়ে পঅ এং খুমির আপন বোন পলি এং খুমি (৬) এবং অন্য এক বোন নাংখৈ খুমির ছয় বছরের ছেলে খৈয়তা এং খুমি মারা যায়।
একই পরিবারের চার সদস্যের মৃত্যু। সবাই যৌথ পরিবারের বাসিন্দা। বর্তমানে আরও দুজনকে নিয়ে পরিবারের সদস্যরা চট্টগ্রামের দুই হাসপাতালে দিন পার করছেন। পঅ এংয়ের বোন নাংখৈ খুমির ছোট মেয়ে যতন এং (৩) চিকিৎসাধীন ফৌজদারহাটের বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ট্রপিক্যাল অ্যান্ড ইনফেকশাস ডিজিজেস (বিআইটিআইডি) হাসপাতালে। চার দিন আগে মেয়েটিকে ভর্তি করা হয়।
লিংথংকে চমেক হাসপাতালে আনা হয় গত মঙ্গলবার। দুজনই বান্দরবান হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিল। চমেক হাসপাতালে নাতির সঙ্গে আছেন পাড়ার কারবারি শৈলুং খুমি। হাসপাতালে শৈলুং হামে আক্রান্ত পাড়াটির করুণ বর্ণনা দেন, ‘গত এক সপ্তাহে আমার মেয়েসহ পরিবারের চার শিশু মারা গেছে। এ ছাড়া আমার ভাইয়ের এক মেয়ে এবং বড় ভাইয়ের নাতিও মারা যায়। অন্য পাড়াবাসীর এক শিশুসহ ১০ দিনে ৭ শিশু মারা গেছে। দুর্গম ওই এলাকায় যাওয়া খুব কঠিন।’
লেংটংপাড়াটিতে ২৬টি পরিবার। পেশা জুমচাষ। রুমা থেকে দূরত্ব প্রায় ১৬ কিলোমিটার। দুর্গম পাড়ায় যাওয়ার কোনো বাহন নেই। পাহাড় ডিঙিয়ে রুমা উপজেলা সদরে আসতে সময় লাগে তিন ঘণ্টা। এখানে স্বাস্থ্যকর্মীর পা পড়ে না। গত দুই সপ্তাহের বেশি সময় ধরে পাড়াটির শিশুদের মধ্যে হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়।
শৈলং কারবারি জানিয়েছেন, হামে আক্রান্ত হওয়ার পর গত ২৪ জুলাই এক ঘণ্টার ব্যবধানে মারা যায় তার নিজের মেয়ে পলি এং ও মেয়ের ঘরের নাতি খৈয়তা এং খুমি। দুজনের বয়সই ছয় বছর। এ দুজনের মৃত্যুর পর পাড়ায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। কারবারির ছেলে পঅ এংয়ের চার সন্তানের জ্বর তখন।
পরদিন ২৫ জুলাই অবস্থা খারাপ হলে পঅ এংয়ের বড় ছেলে খ্রেতং খুমিকে নিয়ে রুমা সদরের দিকে রওনা হন কয়েকজন। কিন্তু পথে তার মৃত্যু হয়। পরদিন বাকি তিন শিশুকে নিয়ে বান্দরবানের উদ্দেশে রওনা হয়। সেখান থেকে দ্বিতীয় ছেলে প্রেলং খুমিকে ২৭ জুলাই চমেক হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়। কিন্তু ওইদিনই প্রেলং মারা যায়।
চমেকে মারা যাওয়া ছেলের মরদেহ নিয়ে দুর্গম লেংটংপাড়ায় ছুটে যান দম্পতি। তখনো তাদের দুই মেয়ে বান্দরবান হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। পঅ এং খুমি বলছিলেন, ‘আবার বান্দরবান হাসপাতালে যাই পরদিন। সেখান থেকে দুদিন আগে ছোট মেয়েকে নিয়ে চট্টগ্রাম মেডিকেলে আসি। বড় মেয়ে পথাং এউং খুমিকে (১১) গত বুধবার বান্দরবান হাসপাতাল থেকে ছেড়ে দেওয়া হয়। সে সুস্থ হয়েছে কিছুটা। এখন চিন্তা লিংথং খুমিকে নিয়ে। বোনের মেয়েটি আছে ফৌজদারহাট হাসপাতালে।’
চমেক হাসপাতালের শিশুস্বাস্থ্য বিভাগের হাম ব্লকে তাকে রাখা হয়েছে। এখনো অক্সিজেন দিতে হচ্ছে। একই শয্যায় রয়েছে আরও এক রোগী। শয্যাসংকটে এক শয্যায় একাধিক রোগী রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
চমেক শিশু স্বাস্থ্য বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক মোহাম্মদ মুছা মিয়া জানিয়েছেন, এখনো হাম কমেনি। প্রতিদিন গড়ে ২০-২৫ জন ভর্তি হয়। টিকা নেওয়ার পরও হাম হচ্ছে। বর্তমানে প্রায় দেড়শজন হাম উপসর্গের রোগী রয়েছে। বান্দরবান, কক্সবাজারসহ বিভিন্ন জেলার রোগী আসছে।
বান্দরবানের রুমার ছোট্ট লিংথং এ্যা খুমির পাশে বাবা-মা এবং দাদু সারাক্ষণ পাহারা দিচ্ছেন। এ কদিনে তারা অনেক মৃত্যু দেখেছেন। আর মৃত্যু দেখতে চায় না পরিবারটি।




