নতুন শহর গিলে খাবে ৪২% কৃষিজমি

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
কর্ণফুলী টানেল কেন্দ্র করে নদীর দক্ষিণ পাড়ে একটি আধুনিক শিল্প ও আবাসিক হাব বা মেগাসিটি গড়ে তুলতে চায় চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ)। এই উদ্যোগের নাম দেওয়া হয়েছে ‘ওয়ান সিটি টু টাউনস’ বা ‘এক নগর দুই শহর’। চট্টগ্রামের আনোয়ারায় ৭ হাজার ৩১৫ একর জমির ওপর এই প্রকল্প বাস্তবায়নে রূপরেখাও দিয়েছে সিডিএ।
তবে নতুন এই শহর গড়ে উঠলে এর আড়ালে হারিয়ে যাবে ১ হাজার ৭৮২ একর কৃষিজমি, যা বিদ্যমান কৃষিজমির ৪২ শতাংশ। বর্তমানে আনোয়ারা উপজেলায় কৃষিজমি আছে ৪ হাজার ১৪৭ একর। পরিকল্পনায় ২ হাজার ৩৮৮ একর কৃষিজমি সংরক্ষণের কথা বলা হয়েছে। এর ফলে স্থানীয় বাস্তুসংস্থান ও খাদ্যনিরাপত্তা মারাত্মক হুমকির মুখে পড়বে— আশঙ্কা নগর বিশেষজ্ঞদের।
সিডিএর দেওয়া ‘আনোয়ারা অ্যাকশন এরিয়াপ্ল্যান (২০২৫-৫০)’-এর খসড়া পর্যালোচনায় দেখা যায়, কৃষিজমির ওপর সবচেয়ে বড় আঘাত আসতে যাচ্ছে বৈরাগ ইউনিয়নে। সেখানে বিদ্যমান ৪৯৪ একর কৃষিজমির ৯৮ শতাংশই শিল্প ও সাধারণ নগর ব্যবহারের জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে। ফলে ভবিষ্যতে সেখানে আবাদি জমি অবশিষ্ট থাকবে মাত্র ৯ একর। এ ছাড়া শিল্পায়ন ও নগরায়ণের চাপে চাতরী ইউনিয়নে ৫৪৬ একর এবং বারখাইন ইউনিয়নে ৩৪৮ একর কৃষিজমি কমানোর প্রস্তাব করা হয়েছে।
বর্তমানে এখানকার মোট জমির ৫৭ শতাংশ ব্যবহার হচ্ছে কৃষি ও মৎস্য খাতে এবং ৯ শতাংশ জলাশয়। এর পাশাপাশি আবাসিক কাজে ব্যবহার হচ্ছে প্রায় ২৭ এবং শিল্প খাতে আড়াই শতাংশ।
অর্ধেকে নামবে ধান-সবজির আবাদ: আনোয়ারা উপজেলা চট্টগ্রামের অন্যতম শস্যভাণ্ডার। কৃষিজমি কমে গেলে সরাসরি প্রভাব পড়বে ধান, ডাল, শাকসবজি ও অর্থকরী ফসল উৎপাদনের ওপর। সর্বশেষ কৃষিশুমারির তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রামে বিলুপ্তির ঝুঁকিতে থাকা প্রধান ফসলগুলোর মধ্যে রয়েছে ধান। বর্তমানে উপজেলায় ১১ হাজার ১৯৬ একরে আমন এবং ৯ হাজার ৬৪ একরে বোরো ধানের চাষ হয়। আবাদি জমি কমলে এই উৎপাদন প্রায় অর্ধেকে নেমে আসবে। এরপরই রয়েছে শাকসবজি। আনোয়ারার জনপ্রিয় বেগুন (১৩৯ দশমিক ৬৭ একর), টমেটো (১১৬ দশমিক ৭ একর) এবং আলু (১১৮ দশমিক ৫৮ একর) চাষের এলাকা উল্লেখযোগ্যভাবে সংকুচিত হবে। এ অঞ্চলে প্রায় ৪০০ একর জমিতে মরিচ চাষ হয়। এ ছাড়া ফেলন ডাল (১২৬ দশমিক ৬১ একর) উৎপাদনের এলাকাটিও নগর উন্নয়নের আওতায় পড়েছে।
জীবিকা হারাবেন ২৪ হাজার ক্ষুদ্র কৃষক: কৃষিশুমারির তথ্য অনুযায়ী, আনোয়ারার ২৩ হাজার ৯৬৭টি কৃষি পরিবারের মধ্যে ৯৯ শতাংশই ক্ষুদ্র কৃষক। সংখ্যায় যারা ২৩ হাজার ৭৭৬ জন। মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়িত হলে এই বিশালসংখ্যক ক্ষুদ্র চাষি তাদের একমাত্র জীবিকা হারাবেন। বর্তমানে উপজেলায় ২৪ হাজার ৮৩৩ জন মানুষ সরাসরি কৃষিকাজের সঙ্গে যুক্ত। জমি হারানোর ফলে এই বিশাল শ্রমশক্তি পেশা পরিবর্তন করতে বাধ্য হবে, যা স্থানীয় অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলবে।
শিল্পায়নে ২ লাখ কর্মসংস্থানের আশা: মহাপরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০৫০ সাল নাগাদ আনোয়ারায় জনসংখ্যা ৭ লাখ ২৪ হাজার ছাড়িয়ে যাওয়ার পূর্বাভাস করা হয়েছে। বর্তমানে এখানে কোরিয়ান ইপিজেড (কেইপিজেড) এবং কর্ণফুলী ফার্টিলাইজার কোম্পানি (কাফকো) কার্যক্রম পরিচালনা করছে। নতুন পরিকল্পনায় ৭৭৪ দশমিক ৪ একর জমি নিয়ে চায়নিজ ইকোনমিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন (সিইআইজেড) এবং শিল্প খাতে ৫৫০ একর জমি বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এই শিল্প জোনে প্রায় ১ লাখ ৯০ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হবে বলে আশা করা হয়েছে। নগরায়ণের এই বিপুল চাপ সামলাতে আনোয়ারায় ৪৭ দশমিক ৮ কিলোমিটার নতুন ও উন্নত সড়কের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে আনোয়ারা-পটিয়া সড়ককে ১৬০ ফুট প্রশস্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। এ ছাড়া এক হাজার যানবাহন ধারণক্ষমতার একটি ট্রাক টার্মিনাল, একটি আধুনিক বাস টার্মিনাল, সাতটি প্রাথমিক বিদ্যালয়, চারটি উচ্চবিদ্যালয় এবং ৯টি ক্লিনিক স্থাপনের সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
বাড়বে জলাবদ্ধতা ও পরিবেশের ঝুঁকি: পরিকল্পনার নথিতেই স্বীকার করা হয়েছে, আনোয়ারা এলাকাটি ঘূর্ণিঝড় এবং মৌসুমি বন্যার উচ্চঝুঁকিতে রয়েছে। শিল্পায়ন ও নগরায়ণের ফলে প্রাকৃতিক জলাধার (বর্তমানে যা ৯ শতাংশ) ও খোলা জায়গা কমে যাবে, যার ফলে এলাকায় জলাবদ্ধতার ঝুঁকি মারাত্মক আকার ধারণ করবে। জলাবদ্ধতা রোধে ১১৪ দশমিক ২৩ কিলোমিটার নতুন সেকেন্ডারি ড্রেন এবং ২ দশমিক ৬২ কিলোমিটার নতুন খালের অ্যালাইনমেন্ট প্রস্তাব করা হয়েছে। জোয়ারের পানি ঠেকাতে পার্কি খাল, খুরুশকুল, দক্ষিণ বারুনিছড়া, ইছাখালী এবং মুরাই খালে সাতটি রেগুলেটর স্থাপনের প্রস্তাব রয়েছে। এর মধ্যে পার্কি খালের মুখে একটি বড় রেগুলেটর নির্মাণের কথা বলা হয়েছে। এ ছাড়া পলি জমা রোধে গুরুত্বপূর্ণ স্থানে চারটি সিল্ট ট্র্যাপ বসানো হবে। এ ছাড়া কর্ণফুলী নদীর দক্ষিণ পাড়ে শিল্পবর্জ্য সরাসরি নদীতে পড়ার আশঙ্কা থাকায় পরিবেশদূষণ রোধে ‘ইকো-ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোনিং’ এবং নদীর তীরে বনায়ন বা গ্রিন বেল্ট কর্মসূচি হাতে নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের শঙ্কা ও কর্তৃপক্ষের দাবি: আনোয়ারা উপজেলা কৃষি অফিসার শামীম আহমদ সরকার বললেন, ‘উপজেলার অধিকাংশ কৃষিজমি তিন ফসলি। ধানের পাশাপাশি এখানে সবজিরও ব্যাপক আবাদ হয়। এমনিতে বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলকে ঘিরে লোকজন কৃষিজমি কিনে আবাসিক এলাকা গড়ে তুলছেন। এতে কৃষিজমি কমছে। নতুন শহর বাস্তবায়ন করা হলে কৃষিজমি আরও কমে আসবে।’ কৃষিজমি ধ্বংস করে এমন মেগাসিটি নির্মাণের বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করলেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের অধ্যাপক ড. অলক পাল। তিনি বলছিলেন, ‘তিন ফসলি জমিতে শহর গড়ে তোলা বাঞ্ছনীয় নয়। এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের আগে অংশীজনের মতামত নেওয়া এবং বিশেষজ্ঞদের নিয়ে আরও পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা দরকার। নয়তো এটি পরিবেশের ওপর যেমন প্রভাব ফেলবে, তেমনি খাদ্য নিরাপত্তাও বিঘ্নিত হবে।’ তিনি কৃষিজমি বাদ দিয়ে নদীর পাড়কে ঘিরে স্যাটেলাইট টাউন গড়ে তোলার প্রস্তাব দেন।
অন্যদিকে, কৃষিজমি হ্রাস ও পরিবেশগত ঝুঁকির বিষয়ে জানতে চাইলে মহাপরিকল্পনার প্রকল্প পরিচালক এবং সিডিএর উপ-প্রধান নগর-পরিকল্পনাবিদ মো. আবু ঈসা আনছারী বললেন, ‘কর্ণফুলী ও আনোয়ারা উপজেলায় অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও শিল্পায়ন হচ্ছে। যার কারণে কৃষিজমি হারিয়ে যাচ্ছে। এজন্য মাস্টারপ্ল্যানে ২ হাজার ৩৮৮ একর কৃষিজমি সংরক্ষণ করা হয়েছে। এতে করে যত্রতত্র গড়ে ওঠা আবাসিক এলাকা ও কলকারখানা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে।’






