যুবদল নেতা মাসুদুল খুন
‘গ্রিন সিগন্যাল’ অজ্ঞাত প্রভাবশালীর, হত্যায় লুট করা পুলিশের অস্ত্র

কোলাজ : আগামীর সময়
চট্টগ্রামের রাউজানে প্রকাশ্যে গুলিবর্ষণ করে যুবদল নেতা মাসুদুল হক চৌধুরীকে হত্যার কথা স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন শীর্ষ সন্ত্রাসী ডেভিড ইমনের ‘সেকেন্ড ইন কমান্ড’ মোবারক।
পুলিশের ভাষ্য, বড় সাজ্জাদ বাহিনীর পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী রায়হানের নির্দেশে এ হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়। আর রায়হানকে হত্যার ‘গ্রিন সিগন্যাল’ দেন পর্দার আড়ালে থাকা এক ‘প্রভাবশালী’। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর নগরীর কোতোয়ালী থানা থেকে লুট হওয়া একটি পিস্তল মাসুদুল খুনে ব্যবহার করেছিল সন্ত্রাসীরা।
গ্রেপ্তার মোবারকসহ চারজনকে আজ বৃহস্পতিবার বিকেলে চট্টগ্রামের জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজির করা হয়। ম্যাজিস্ট্রেট মোবারকের জবানবন্দি রেকর্ড করেন। এ ছাড়া আরও দুই মামলায় মোবারকসহ তিনজনকে মোট আটদিন রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পুলিশকে অনুমতি দিয়েছেন একই আদালত।
পুলিশ ও আদালত সূত্রের তথ্য, মোবারকের জবানবন্দিতে মাসুদুল হক চৌধুরীকে খুনের ঘটনায় অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের বিষয় উঠে এসেছে। রায়হানের গডফাদার হিসেবে এক প্রভাবশালী রাজনীতিকের নাম এসেছে। তবে মাসুদুলকে হত্যার মূল নির্দেশদাতা কে, সেটা মোবারকের জবানিতে আসেনি।
চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার কাঞ্চননগর ইউনিয়নের মানিকপুর গ্রামে মুহাম্মদ মোবারক ওরফে কালা মোবারক ওরফে গলাকাটা মোবারকের (৩৭) বাড়ি। তার সঙ্গে গ্রেপ্তার হওয়া বাকি তিনজন হলেন, মোহাম্মদ রায়হান (৪০), ফরিদ (৫০) ও নাছির (৫২)।
গতকাল বুধবার ভোরে পুলিশ-সন্ত্রাসী বন্দুকযুদ্ধের পর কাঞ্চননগর থেকে মোবারকসহ চারজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তাদের কাছ থেকে একটি ৯এমএম ও একটি ৭ পয়েন্ট ৬৫ বোরের বিদেশি পিস্তল, পাকিস্তানের তৈরি রিভলভার, একটি দেশীয় রিভলবার, ৯এমএম পিস্তলের ১৮ রাউন্ড গুলি, ৭ পয়েন্ট ৬৫ বোর পিস্তলের পাঁচ রাউন্ড পিস্তল, তিনটি ম্যাগাজিন, কিনটি পিস্তলের ও চারটি শটগানের খোসা উদ্ধার করা হয়।
আজ বৃহস্পতিবার বিকেলে সংবাদ সম্মেলনে চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার (এসপি) মাসুদ আলম জানালেন, মঙ্গলবার গভীর রাতে কাঞ্চননগরের পল্লানপাড়ায় এক সহযোগীর বাড়িতে যাবার পর তাদের ঘিরে ফেলে পুলিশ। তখন মোবারক ও তার সহযোগীরা পুলিশকে লক্ষ্য করে গুলি ছুঁড়ে। পুলিশও পাল্টা গুলি ছুঁড়লে একপর্যায়ে মোবারক আত্মসমর্পণ করে। পরে সহযোগীদের গ্রেপ্তারের পাশাপাশি অস্ত্র উদ্ধার হয়।
উভয়পক্ষের গুলিবিনিময়ে হাটাহাজারী সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার কাজী মোহাম্মদ তারেক আজিজ, ফটিকছড়ি থানার ওসি রবিউল আলম খান, কনস্টেবল মামুনুর রশিদ, শাহ নেওয়াজ ও সাদ্দাম হোসেন আহত হন।
এসপি মাসুদুল জানালেন, উদ্ধার করা ব্রাজিলের তৈরি ৯এমএম তরাস পিস্তলটি ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট কোতোয়ালী থানা থেকে লুট হয়েছিল। মাসুদুল খুনে এ পিস্তলটি ব্যবহার করা হয়েছিল।
গত ১৩ জুন দুপুরে চট্টগ্রাম উত্তরের রাঙ্গুনিয়া উপজেলার সীমান্তবর্তী রাউজানের পাহাড়তলী ইউনিয়নের চৌমুহনী বাজারে মাসুদুলকে (৪৫) গুলি করে হত্যা করা হয়। তিনি রাঙ্গুনিয়া উপজেলা যুবদলের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক ছিলেন। রাঙ্গুনিয়ার সংসদ সদস্য বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা হুম্মাম কাদের চৌধুরীর অনুসারী ছিলেন তিনি। বাড়ি রাঙ্গুনিয়ায়। এ ঘটনায় তার ভাই সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান পেয়ারুল হক চৌধুরী মামলা করেন। প্রকাশ্যে অস্ত্রের মহড়া দিয়ে হত্যার ভিডিও ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়লে তোলপাড় সৃষ্টি হয়।
মাসুদুল হত্যাকাণ্ড নিয়ে এসপি মাসুদ আলম বললেন, ‘জিজ্ঞাসাবাদে মোবারক জানিয়েছে, সে যুবদল নেতা মাসুদ চৌধুরীকে চিনত না। রায়হান তার মোবাইলে মাসুদ চৌধুরীর ছবি পাঠিয়ে তাকে মারার জন্য নির্দেশ দিয়েছিল। রায়হানের কথা অনুযায়ী সে মাসুদ চৌধুরীকে মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে গুলি করে মৃত্যু নিশ্চিত করেছিল।’
পুলিশ সুপারের ভাষ্য, এ বছরের জানুয়ারি মাসে নগরীর চন্দনপুরায় সাবেক সংসদ সদস্য ও স্মার্ট গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মুজিবুর রহমানের বাড়িতে চাঁদার দাবিতে গুলিবর্ষণকারীদের একজন মোবারক। গত বছরের ৫ নভেম্বর নগরীর চালিতাতলী এলাকায় বিএনপি নেতা ও বর্তমান সংসদ সদস্য এরশাদ উল্লাহর নির্বাচনী প্রচারণায় গুলি করে সরোয়ার বাবলাকে খুনেও মোবারক অংশ নেওয়ার কথা জানিয়েছেন।
‘বিদেশে পলাতক দুর্ধর্ষ শিবির ক্যাডার সাজ্জাদ আলী খান ওরফে বড় সাজ্জাদের নির্দেশে চলতেন মোবারক। তার নির্দেশে সাম্প্রতিক সময়ের অধিকাংশ খুন ও চাঁদাবাজির ঘটনায় মোবারক নিজেই উপস্থিত থেকে গুলিবর্ষণ করেছেন বলে তথ্য পাওয়া গেছে। শীর্ষ সন্ত্রাসী ডেভিড ইমন ও রায়হানের ঘনিষ্ঠ ও আস্থাভাজন ছিল। বড় সাজ্জাদের বাহিনীর প্রধান শ্যূটার মোবারক।’
জেলা পুলিশের তথ্য, অস্ত্র উদ্ধার ও পুলিশের ওপর হামলার ঘটনায় করা আলাদা দুই মামলায় মোবারকসহ তিনজনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সাতদিন করে ১৪ দিনের রিমান্ডের আবেদন করা হয়েছিল। আদালত চারদিন করে আটদিন মঞ্জুর করেছেন।







