৬ বছরে ৭১ হাতির মৃত্যু চট্টগ্রামে, শাস্তি নেই

বনে হাতির দল—সংগৃহীত
চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার অঞ্চলে গত দেড় দশকে পাহাড় ও বনাঞ্চল কেটে হাতির চলাচল পথ বন্ধ কিংবা সংকুচিত করার অনেক ঘটনা ঘটেছে। এ কারণে বন্যহাতি বার বার লোকালয়ে চলে আসে। এতে করে হাতি ও মানুষের দ্বন্দ্ব বেড়েছে অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি। ফলে পরস্পরের যুদ্ধাংদেহী মনোভাবে মানুষ এবং হাতি উভয়ই মারা পড়ছে।
এ অঞ্চলে ২০২১ সাল থেকে এ পর্যন্ত ৭১ টি হাতির মৃত্যু হয়েছে। শুধু হাতির মৃত্যু নয়, মৃত্যুর পর হাতির দাঁতসহ অঙ্গ প্রত্যঙ্গ নিয়ে যাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। একই সময়ে সারা দেশে হাতির আক্রমণে মারা গেছে ১০৮ জন। বেশিরভাগ হাতির মৃত্যু হয় বৈদ্যুতিক ফাঁদে। এসব ঘটনায় মামলা হয়। কিন্তু এসব মামলায় শাস্তির নজির খুব একটা নেই।
বিশেষজ্ঞদের মতে, হাতির করিডর বা চলাচলের পথ রুদ্ধ হওয়ার পাশাপাশি খাদ্য সংকটের কারণে তারা লোকালয়ে চলে আসে। মানুষের বাড়িঘরে হামলা এবং ফসলি জমি নষ্ট করে থাকে। এ কারণে মানুষ ও হাতির দ্বন্দ্ব বাড়ছে। এই দ্বন্দ্ব নিরসনে নানা উদ্যোগ নেওয়া হলেও হাতি মৃত্যু থেমে নেই।
বন্য প্রাণী ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের বন্য প্রাণী ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ কর্মকর্তা দীপান্বিতা ভট্টাচার্য বলেছেন, ‘৭১টি হাতি মারা গেছে ছয় বছরে। হাতি মৃত্যুর ঘটনায় মামলা হয়। চট্টগ্রামের একটি মামলা চার্জগঠন পর্যায়ে রয়েছে। বাকি বিভাগগুলোর তথ্য জানি না।
তিনি আরও বলেছেন, ‘হাতি ও মানুষের দ্বন্দ্ব নিরসনে কাজ করে যাচ্ছি আমরা। হাতির করিডর ধ্বংস করার কারণে তারা লোকালয়ে চলে আসে। '
চট্টগ্রাম হাতির করিডর এবং আবাসস্থলের ওপর আঘাত আসে প্রায় এক যুগ আগে দেয়াং পাহাড়ে। পাহাড় ও বনাঞ্চল কেটে আনোয়ারায় গড়ে তোলা হয় কোরিয়ান রপ্তানি প্রক্রিয়াজাতকরণ অঞ্চল (কেইপিজেড)। এর ফলে হাতির চলাচলের পথে বাধা সৃষ্টি হয়। এর পর পর্যায়ক্রমে রোহিঙ্গা আগমন, বন নিধন এবং চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেলপথ নির্মাণের কারণে চুনতি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য, ফাইস্যাখালি, মেধাকচ্ছিয়া এবং খুটখালি এলাকা এসব করিডোর ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফলে এসব এলাকায় হাতির লোকালয়ে আসার প্রবণতা বাড়ে।
কেইপিজেড এলাকায় বারবার হাতি লোকালয়ে চলে যায়। ২০২১ সাল থেকে এই এলাকায় হাতির আক্রমণে অন্তত ১৫ জন মানুষ মারা যায়। হাতির আক্রমণে সবশেষ গত বছর এখানে এক শিশুর মৃত্যু হয়। এখনো কেইপিজেডে তিনটি হাতি রয়েছে। বাঁশখালীর পাহাড় থেকে শঙ্খ নদী সাঁতরে এসব হাতি কেইপিজেডে আসে।
কেইপিজেডে হাতি ও মানুষের দ্বন্দ্ব নিরসনে ১২ সদস্যের বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠিত হয়েছিল। ২০২৪ সালের নভেম্বরে কমিটি তাদের প্রতিবেদন জমা দেয়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কেইপিজেডে অব্যাহতভাবে বনাঞ্চল ও পাহাড় কেটে হাতির আবাসস্থল নষ্ট করা হয়েছে। হাতির চলাচলের পথে যানবাহন ও বিভিন্ন পক্ষের লোকজনের আনাগোনা বেশি। তাদের খাবারও দিন দিন কমে যাচ্ছে। আগুন জ্বালিয়ে হাতিকে বিরক্ত করা হয়। এ কারণে হাতি লোকালয়ে ঢুকে যায় বারবার। পর্যাপ্ত ইআরটি (এলিফ্যান্ট রেসপেন্স টিম) না থাকায় হাতির আক্রমণে মানুষ ও ফসলের ক্ষতি হচ্ছে।
প্রতিবেদনে কেইপিজেডে হাতি ও মানুষের সঙ্গে দ্বন্দ্বের কারণ এবং তা নিরসনের স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি সুপারিশ দেওয়া হয়েছিল। কমিটির সদস্য উপ বন সংরক্ষক (ডিএফও) আবু নাছের মোহাম্মদ ইয়াছিন নেওয়াজ জানান, স্বল্পমেয়াদি সুপারিশে পাহাড় ও বনাঞ্চল ধ্বংস বন্ধ করা, ইআরটি সজাগ রাখা, হাতির করিডর উন্মুক্ত রাখার কথা বলেছি। কিন্তু তারা কোনোভাবে হাতিগুলো সেখানে রাখতে চাচ্ছে না বলে আমাদের মনে হচ্ছে।
বাংলাদেশে হাতি সুরক্ষায় বন বিভাগের সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছে আইইউসিএন। হাতি সুরক্ষায় বনাঞ্চলে হাতির উপযোগী ঘাস ও গাছপালা বাড়ানো, করিডর সুরক্ষিত করা এবং অবাধ যাতায়াতের ওপর জোর দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বন ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগের সাবেক অধ্যাপক কামাল হোসেন বলেন, বনাঞ্চলে হাতির খাদ্য সংকট প্রচুর। হাতিকে বনে রাখতে হলে তাদের উপযোগী প্রাকৃতিক খাদ্যের জোগান নিশ্চিত করতে হবে।





