জাপানের ওতসু শহর ও আমাদের ঢাকা

ওতসু শহরের অধিকাংশ প্রশস্ত সড়কে সাইকেলের জন্য আছে পৃথক লেন
রিতসুমেইকান ইউনিভার্সিটির বিওয়াকো-কুসাতসু ক্যাম্পাসে মাস্টার্স ও পিএইচডি অধ্যয়নের সুবাদে পাঁচ বছরেরও বেশি জাপানের শিগা প্রিফেকচারের প্রধান শহর ওতসুতে থাকার সুযোগ হয়। দেশটির প্রাচীন রাজধানী কিয়োটোর কাছেই এটি। এ সময়ে শহরটির যে বিষয়টি আমাকে সবচেয়ে বেশি মুগ্ধ করেছে, তা এর সুশৃঙ্খল, নিরাপদ এবং কার্যকর ট্রাফিক ব্যবস্থা। জাপান গোটা বিশ্বের শুধু প্রযুক্তি ও অর্থনৈতিক অগ্রগতির জন্য নয়, নাগরিক শৃঙ্খলা ও আইনের প্রতি শ্রদ্ধাবোধের জন্যও সুপরিচিত। ওতসুর সড়ক ও ট্রাফিক ব্যবস্থায় এই বৈশিষ্ট্যগুলোর বাস্তব প্রতিফলন স্পষ্ট চোখে পড়ে।
ওতসু শহরের সড়কগুলো অত্যন্ত পরিচ্ছন্ন, সুপরিকল্পিত। নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণও হয়। রাস্তার লেনগুলো স্পষ্টভাবে চিহ্নিত। গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলোতে আধুনিক ট্রাফিক সিগন্যাল স্থাপন করা হয়েছে। পথচারীদের জন্য রয়েছে আলাদা ফুটপাত, জেব্রা ক্রসিং এবং প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের চলাচলবান্ধব ব্যবস্থা। শহরের অধিকাংশ প্রশস্ত সড়কে সাইকেলের জন্য আছে পৃথক লেন। এটি পরিবেশবান্ধব ও স্বাস্থ্যসম্মত যাতায়াতকে উৎসাহিত করে। ফলে সড়কে বিভিন্ন যানবাহনের মধ্যে সমন্বয় থাকে এবং দুর্ঘটনার ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়।
তবে ওতসুর ট্রাফিক ব্যবস্থার সবচেয়ে প্রশংসনীয় দিক নাগরিকদের শৃঙ্খলা। গাড়িচালকেরা নির্ধারিত গতিসীমা কঠোরভাবে মেনে চলেন এবং ট্রাফিক সিগন্যাল অমান্য করার ঘটনা বিরল। কোনো পথচারী জেব্রা ক্রসিংয়ের কাছে এলেই চালকেরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে গাড়ি থামিয়ে তাকে রাস্তা পার হওয়ার সুযোগ দেন। অপ্রয়োজনীয় হর্ন বাজানো, হঠাৎ লেন পরিবর্তন কিংবা নিয়ম ভেঙে ওভারটেক করার প্রবণতা নেই বললেই চলে। সাধারণত জরুরি প্রয়োজন ছাড়া কেউ হর্ন ব্যবহার করেন না। যে পাঁচ বছর শহরটিতে থেকেছি এক বা দুইবারের বেশি হর্নের শব্দ শুনেছি বলে মনে পড়ে না। এমনকি গভীর রাতেও অনেক চালক ট্রাফিক সিগন্যাল মেনে চলেন, যদিও আশপাশে অন্য কোনো যানবাহন বা পুলিশ উপস্থিত থাকে না। এটি মূলত আইনের প্রতি শ্রদ্ধা, সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং আত্মনিয়ন্ত্রণের প্রতিফলন।
গণপরিবহনও ওতসুর ট্রাফিক ব্যবস্থাকে কার্যকর রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ট্রেন ও বাস নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী চলাচল করে এবং অধিকাংশ মানুষ ব্যক্তিগত গাড়ির বদলে গণপরিবহন ব্যবহার করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। জাপানের বড় শহরগুলোতে সড়ক, রেলপথ, মেট্রোরেল এবং সাবওয়ের মধ্যে চমৎকার সমন্বয় চোখে পড়ে। ফলে যানবাহনের চাপ থাকলেও দীর্ঘস্থায়ী যানজট খুব কম দেখা যায়।
অনেকে মনে করেন, জাপানের সড়কগুলো অত্যন্ত প্রশস্ত বলেই যানজট কম হয়। বাস্তবে বিষয়টি এতটা সরল নয়। জাপানের অনেক শহরেই পুরোনো ও অপেক্ষাকৃত সরু সড়ক রয়েছে, যা পুরান ঢাকার অলিগলির কথা মনে করিয়ে দেয়। এমন বহু সড়ক রয়েছে যেখানে একটি গাড়ি প্রবেশ করলে বিপরীত দিক থেকে আসা গাড়িকে অপেক্ষা করতে হয়। তবে জাপান সরকার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে পুরোনো, পাহাড়ি ও দুর্গম এলাকার সড়কগুলো ধীরে ধীরে প্রশস্ত ও আধুনিকীকরণ করে চলেছে।
জাপানে পুলিশের উপস্থিতি সবসময় চোখে না পড়লেও আইন প্রয়োগ অত্যন্ত কার্যকর। কোনো অনিয়ম বা দুর্ঘটনা ঘটলে মুহূর্তের মধ্যেই পুলিশ উপস্থিত হয়। ২০১৬ সালে আমরা কয়েকজন বন্ধু তিনটি মাইক্রোবাসে করে ওকায়ামা সমুদ্রসৈকতে যাচ্ছিলাস। পথে এক্সপ্রেসওয়েতে আমাদের একটি গাড়ি অন্য গাড়ির জন্য অপেক্ষা করতে সাময়িকভাবে থামলে মিনিটখানেকের মধ্যেই পুলিশ এসে হাজির। অন্য একদিন, রাত নয়টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের গেট থেকে বেরিয়ে সাইকেল লেনে মোবাইলে কথা বলতে বলতে সাইকেলে উঠতেই পুলিশ সাইরেন বাজিয়ে আমাকে থামতে বলেন এবং ভবিষ্যতে এরকম করলে পঞ্চাশ হাজার ইয়েন জরিমানা দিতে হবে বলে সতর্ক করে ছেড়ে দেয়। এসব অভিজ্ঞতা থেকে বোঝা যায়, ট্রাফিক আইন অমান্য করলে ধরা পড়ার সম্ভাবনা অত্যন্ত বেশি। তাছাড়া, ট্রাফিক দুর্ঘটনা বা গুরুতর আইন লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে জরিমানা, লাইসেন্সে ডিমেরিট পয়েন্ট এবং প্রয়োজনে লাইসেন্স বাতিলের মতো কঠোর ব্যবস্থা রয়েছে। ফলে অধিকাংশ মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবেই নিয়ম মেনে চলেন।
অন্যদিকে, বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা শহরের ট্রাফিক পরিস্থিতির বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ এ শহরে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মানুষ ও যানবাহন সড়ক ব্যবহার করে। সীমিত সড়ক অবকাঠামো, দ্রুত নগরায়ণ, বিভিন্ন ধরনের যানবাহনের মিশ্র চলাচল এবং ট্রাফিক নিয়মের অপর্যাপ্ত বাস্তবায়নে দীর্ঘস্থায়ী যানজট এখানে নিত্যদিনের ঘটনা। অনেক চালক লেন শৃঙ্খলা অনুসরণ করেন না এবং পথচারীদের নিরাপদ পারাপারও সবসময় নিশ্চিত হয় না। ফলে সময় ও জ্বালানির অপচয়ের পাশাপাশি পরিবেশ দূষণও বাড়ে।
ঢাকার ট্রাফিক ব্যবস্থার আরেকটি বড় সমস্যা আইন প্রয়োগের দুর্বলতা। অনেক ক্ষেত্রে ট্রাফিক আইন ভঙ্গ করলেও কার্যকর শাস্তির মুখোমুখি হতে হয় না। লাইসেন্সবিহীন বা অপর্যাপ্ত প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত চালকের সংখ্যাও কম নয়। বিশেষ করে কিছু অটোরিকশা ও অন্যান্য ছোট যানবাহনের চালকদের মধ্যে ট্রাফিক বিধি সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞানের অভাব লক্ষ্য করা যায়, যা সড়কে বিশৃঙ্খলা ও দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।
তবে আশার কথা হলো, ঢাকা শহরে ইতোমধ্যে মেট্রোরেল চালু হয়েছে, এক্সপ্রেসওয়ে নির্মিত হয়েছে এবং আধুনিক ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসব অবকাঠামোগত উন্নয়নের পাশাপাশি নাগরিকদের মধ্যে ট্রাফিক আইন মেনে চলার সংস্কৃতি গড়ে তোলা এবং আইন প্রয়োগ আরও কার্যকর করা গেলে পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি সম্ভব। একই সঙ্গে ফুটপাত দখলমুক্ত করা, পথচারীবান্ধব অবকাঠামো গড়ে তোলা এবং সাইকেলের ব্যবহার বাড়ানোর মাধ্যমে পরিবেশ দূষণ কমানোর পাশাপাশি জনস্বাস্থ্যেরও উন্নতি করা যেতে পারে। এক্ষেত্রে, তাইওয়ানের রাজধানী তাইপে শহরে ভাড়ায় চালিত ইউবাইকের চমৎকার নেটওয়ার্ক বিশেষভাবে অনুকরণীয় হতে পারে। এটি একই সঙ্গে গণপরিবহন ও ব্যবসার মডেল হিসেবেও চমৎকার দৃষ্টান্ত।
সার্বিকভাবে বলা যায়, ওতসু শহরের ট্রাফিক ব্যবস্থা শুধু উন্নত অবকাঠামোর ফল নয়; বরং নাগরিক সচেতনতা, সামাজিক দায়িত্ববোধ এবং আইনের প্রতি সম্মিলিত শ্রদ্ধার প্রতিফলন। ঢাকা শহরের বাসিন্দারা এবং নগরসেবার সঙ্গে জড়িতরা যদি এই মূল্যবোধগুলোকে আরও শক্তিশালীভাবে ধারণ করতে পারে, তাহলে ভবিষ্যতে আরও নিরাপদ, সুশৃঙ্খল এবং কার্যকর নগর পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব হবে।
লেখক
অতিরিক্ত পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক







