যেন পৃথিবীর ভেতরে লুকিয়ে থাকা আরেকটি পৃথিবী
যে গুহার ভেতর পুরে দেওয়া যাবে ৪০ তলা ভবনও

মনে হতে পারে, এটি কোনো বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনির দৃশ্য।
ভাবুন তো, আপনি একটি গুহায় ঢুকেছেন। চারপাশে অন্ধকার। মাথার ওপর শত মিটার উঁচু ছাদ। হঠাৎ সামনে দেখা গেল সূর্যের আলোয় ভরা এক সবুজ জঙ্গল। একটু দূরে কুয়াশা ভেসে বেড়াচ্ছে, কোথাও আবার গর্জন করে বয়ে যাচ্ছে নদী। মনে হতে পারে, এটি কোনো বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনির দৃশ্য। অথচ এমন জায়গা সত্যিই আছে। ভিয়েতনামের হ্যাং সন ডুং গুহা তেমনই এক স্থান। এটি শুধু পৃথিবীর সবচেয়ে বড় গুহাই নয়, এটি যেন পৃথিবীর ভেতরে লুকিয়ে থাকা আরেকটি পৃথিবী।
এক ঝড়ের দিনে শুরু হওয়া গল্প
১৯৯০ সালের কথা। ভিয়েতনামের ফং ন্যা অঞ্চলের স্থানীয় বনজীবী হো খানহ জঙ্গলে আগরউড খুঁজতে বেরিয়েছিলেন। হঠাৎ প্রবল ঝড় শুরু হলে আশ্রয়ের জন্য একটি অজানা গুহার মুখে গিয়ে দাঁড়ান তিনি। গুহার ভেতর থেকে বেরিয়ে আসছিল ঠান্ডা বাতাস, কুয়াশা আর গর্জন করা পানির শব্দ।
অস্বাভাবিক সেই দৃশ্য দেখে ভয় পেয়ে ভেতরে না ঢুকেই ফিরে আসেন হো খানহ। পরে বহু বছর তিনি গুহাটির অবস্থানও ভুলে যান।
প্রায় দুই দশক পরে ব্রিটিশ গুহা–গবেষকদের একটি দল তার কাছ থেকে এই রহস্যময় গুহার কথা শোনে। দীর্ঘ অনুসন্ধানের পর ২০০৯ সালে গুহাটি পুনরায় আবিষ্কৃত হয়। জরিপ শেষে গবেষকেরা হতবাক।
এটি তো পৃথিবীর সবচেয়ে বড় প্রাকৃতিক গুহা!
কত বড় এই গুহা?
সংখ্যাগুলো শুনলে বিস্মিত না হয়ে উপায় নেই। হ্যাং সন ডুং প্রায় ৯ কিলোমিটার দীর্ঘ এবং এর আয়তন প্রায় ৩৮.৫ মিলিয়ন ঘনমিটার।
তুলনা করলে বিষয়টি আরও পরিষ্কার হয়। আগে বিশ্বের সবচেয়ে বড় গুহা হিসেবে পরিচিত মালয়েশিয়ার ডিয়ার কেভের চেয়ে এটি প্রায় পাঁচ গুণ বড়। গুহার কিছু অংশ এত বিশাল যে সেখানে সহজেই একটি ৪০ তলা ভবন দাঁড় করানো সম্ভব। এর সবচেয়ে উঁচু স্ট্যালাগমাইটের উচ্চতা প্রায় ৮০ মিটার, যা একটি ২৫ তলা ভবনের সমান।
গুহার ভেতরে জন্ম নেওয়া জঙ্গল
হ্যাং সন ডুংয়ের সবচেয়ে আশ্চর্য বৈশিষ্ট্য হলো এর দুটি বিশাল ডোলাইন-গুহার ছাদ ধসে তৈরি হওয়া খোলা অংশ।
এই ফাঁক দিয়ে সূর্যের আলো প্রবেশ করায় গুহার ভেতরেই গড়ে উঠেছে ঘন সবুজ অরণ্য। এখানে জন্মেছে ফার্ন, লতাগুল্ম, এমনকি বড় বড় গাছও। গবেষকেরা এই অংশের নাম দিয়েছেন ‘গার্ডেন অব এডাম’।
গুহার ভেতরে দাঁড়িয়ে যখন কেউ আকাশ দেখতে পায়, তখন সত্যিই মনে হয় সে যেন অন্য এক জগতে চলে এসেছে।
গুহার নিজস্ব আবহাওয়া
এখানেই শেষ নয়। বিশাল আকারের কারণে হ্যাং সন ডুংয়ের ভেতরে নিজস্ব ক্ষুদ্র আবহাওয়া ব্যবস্থা তৈরি হয়েছে।
বাইরের গরম বাতাস ও ভেতরের ঠান্ডা বাতাসের সংঘাতে প্রায়ই কুয়াশা তৈরি হয়। কখনো কখনো সেই কুয়াশা গুহার ভেতরে মেঘের মতো ভেসে বেড়ায়। সূর্যের আলো যখন কুয়াশার মধ্যে পড়ে, তখন সৃষ্টি হয় এমন দৃশ্য যা অনেক দর্শনার্থী ‘অ্যাভাটার’ চলচ্চিত্রের সঙ্গে তুলনা করেন।
নদী, মুক্তা আর পাথরের দৈত্য
গুহার ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে একটি রহস্যময় ভূগর্ভস্থ নদী। কোথা থেকে শুরু হয়ে কোথায় শেষ হয়েছে, তার সবটুকু এখনো জানা যায়নি।
এখানে রয়েছে বিশালাকার পাথুরে স্তম্ভ, ক্যালসাইটের গঠন, এবং বিখ্যাত ‘হ্যান্ড অব ডগ’ নামের এক বিশাল স্ট্যালাগমাইট। এছাড়া পাওয়া যায় বিরল কেভ পার্লস বা গুহামুক্তা, যেগুলো পানির ফোঁটা থেকে হাজার হাজার বছরে তৈরি হয়েছে।
কেন এত কম মানুষ যেতে পারে?
বিশ্বের সবচেয়ে বড় গুহা হলেও এখানে ইচ্ছা করলেই যাওয়া যায় না। পরিবেশ রক্ষার জন্য প্রতি বছর সীমিত সংখ্যক পর্যটককে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়।
অভিযানে অংশ নিতে কয়েক হাজার ডলার খরচ হয় এবং পুরো যাত্রা সম্পন্ন করতে হয় প্রশিক্ষিত গাইড ও বাহক দলের সহায়তায়।
এর ফলে গুহার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও জীববৈচিত্র্য এখনো অনেকটাই অক্ষত রয়েছে।
সূত্র: ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক, অক্সালিস এডভেঞ্চার ডট কম, রু ওয়ান্ডার্স ডট কম







