মাটির নিচে স্টার ওয়ার্সের সেই কিংবদন্তি বাড়ি

মাটির নিচে লুকিয়ে আছে এক বিস্ময়কর বসতি।
তিউনিসিয়ার দক্ষিণের শুষ্ক মরুভূমির ঠিক মাঝখানে ছোট্ট একটি শহর মাটমাটা। আপাত দৃষ্টিতে জায়গাটি সাধারণ মনে হলেও, এর মাটির নিচে লুকিয়ে আছে এক বিস্ময়কর বসতি। এখানকার আমাজিঘ জনগোষ্ঠীর ভূগর্ভস্থ ঘরগুলো যেন অন্য এক জগতের গল্প বলে। এই অদ্ভুত স্থাপনাগুলো বিশ্ব জুড়ে পরিচিতি পেয়েছে স্টার ওয়ার্স চলচ্চিত্রের মাধ্যমে। পরিচালক জর্জ লুকাস এখানকার একটি ঘরকেই লুক স্কাইওয়াকারের শৈশবের বাড়ি হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন।
গুহার ভেতরেই এক পূর্ণাঙ্গ সংসার
মাটমাটার এসব ঘরে প্রবেশের অভিজ্ঞতাই আলাদা। পাহাড়ের ঢালের ছোট্ট একটি প্রবেশপথ দিয়ে নিচে নামতে হয়। প্রথমে মনে হতে পারে গুহায় ঢুকছেন। কিন্তু ভেতরে ঢুকলেই দেখা যায়, এটি আসলে একটি পূর্ণাঙ্গ বাড়ি। সরু সুড়ঙ্গ একটির সঙ্গে আরেকটি কক্ষকে যুক্ত করেছে। কোথাও শোয়ার ঘর, কোথাও রান্নাঘর, কোথাও খাবার ঘর, আবার কোথাও অতিথিদের বসার জায়গা। বড় বাড়িগুলোর সুড়ঙ্গপথও বেশ দীর্ঘ।
সব কক্ষের কেন্দ্রবিন্দু একটি খোলা উঠান। গোলাকার এই উঠানেই আসে সূর্যের আলো ও বিশুদ্ধ বাতাস। পরিবারের সদস্যরা এখানেই নানা গৃহস্থালি কাজ করেন, গল্প করেন, শিশুদের খেলাধুলাও চলে এই জায়গাতেই।
এই অনন্য ঘর তৈরির পদ্ধতিও চমকপ্রদ। প্রথমে নরম বেলেপাথরের মাটিতে গভীর একটি গোলাকার গর্ত খনন করা হয়। এরপর সেই গর্তের চারপাশে খুঁড়ে তৈরি করা হয় বসবাসের কক্ষগুলো। ফলে উপরের তীব্র গরমের মধ্যেও ঘরের ভেতর থাকে তুলনামূলক শীতল পরিবেশ। মরুভূমির কঠিন আবহাওয়ার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার জন্য এটি ছিল অত্যন্ত কার্যকর ও টেকসই নির্মাণকৌশল।
ঐতিহ্যের টানাপড়েন
মাটমাটার অনেক পরিবার এখনো তাদের পূর্বপুরুষদের এই ঘরেই বসবাস করে। পর্যটকরা চাইলে তাদের বাড়ি ঘুরে দেখতে পারেন। অনেক পরিবার অতিথিদের সামনে কুসকুস তৈরির ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতি, কার্পেট বোনা কিংবা বারবার সংস্কৃতিতে ব্যবহৃত বিভিন্ন সরঞ্জামও প্রদর্শন করে। কেউ যদি শুধু ছবি তুলে ফিরে না গিয়ে তাদের সঙ্গে বসে স্থানীয় খাবার খান, তাহলে এই মানুষের জীবনযাপন, সংস্কৃতি ও আতিথেয়তার এক অন্যরকম অভিজ্ঞতা নিয়ে ফিরতে পারবেন।
তবে এই ঐতিহ্য এখন নানা সংকটে। ১৯৬০-এর দশকে ভয়াবহ বন্যায় অনেক ভূগর্ভস্থ ঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আবার দীর্ঘ খরাও এসব স্থাপনার জন্য হুমকি। একই সময়ে তিউনিসিয়াকে আধুনিকায়নের উদ্যোগে অনেক আমাজিঘ পরিবার শহরে চলে যায়। পরবর্তী সময়ে পর্যটনশিল্পের মন্দা এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণেও গ্রাম ছাড়ার প্রবণতা বেড়েছে।
ফলে আজ খুব অল্পসংখ্যক মানুষই এসব ঘরে বসবাস করেন। আরও উদ্বেগের বিষয়, হাতে গোনা কয়েকজন কারিগর এখনো জানেন কীভাবে এই ভূগর্ভস্থ ঘর খনন, মেরামত ও সংরক্ষণ করতে হয়। তাই মাটমাটার এই বিস্ময়কর বসতিগুলো শুধু একটি পর্যটন আকর্ষণ নয়, বরং হাজার বছরের অভিযোজন, স্থাপত্যজ্ঞান ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের এক জীবন্ত সাক্ষ্য, যা সংরক্ষণ করা আজ সময়ের দাবি।
সূত্র: এংগেজিং কালচারস, অ্যাটলাস অবসকুরা









