জিভে জল আনা যে মিষ্টি যাচ্ছে বিদেশেও

ফাইল ছবি
দোকানের সামনে দাঁড়াতেই চোখে পড়ে চিনির হালকা শিরায় ডুবে থাকা ছোট ছোট গোল মিষ্টি। টাটকা মিষ্টির ঘ্রাণে থমকে দাঁড়ান পথচারীদের কেউ কেউ। কেউ দোকানে বসেই গরম গরম মিষ্টি মুখে তোলেন, কেউ আবার বাড়ির মানুষের জন্য কিনে নেন কয়েক কেজি। আর যারা প্রবাসে থাকেন, তাদের কাছে এই মিষ্টি দেশের স্বাদের স্মৃতি। নাম খন্ডলের মিষ্টি। ফেনীর পরশুরাম উপজেলার এই মিষ্টির সুনাম এখন ছড়িয়ে পড়েছে দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশেও।
ফেনীসহ বৃহত্তর নোয়াখালী অঞ্চলের মানুষের কাছে খন্ডলের মিষ্টি বেশ পরিচিত। মুখে দিলেই নরম মিষ্টি যেন মিলিয়ে যায়। চিনির শিরার মিষ্টতা খুব বেশি তীব্র নয় বলে একসঙ্গে কয়েকটি খেতেও আপত্তি থাকে না। স্বাদ আর গঠনের এই বৈশিষ্ট্যই মিষ্টিটিকে আলাদা পরিচিতি দিয়েছে। বিয়ে, বৌভাত, আকিকা কিংবা জন্মদিনের আয়োজনেও জায়গা করে নিয়েছে এটি। আবার কেউ বাড়িতে বেড়াতে গেলে কিংবা আত্মীয়ের বাড়িতে যাওয়ার সময়ও সঙ্গে নেন খন্ডলের মিষ্টি।
যেভাবে পরিচিতি পেল খন্ডলের মিষ্টি
ফেনীর পরশুরাম উপজেলার বক্সমাহমুদ ইউনিয়নের খন্ডলহাই বাজারে প্রায় ৪৫ বছর আগে এই মিষ্টি তৈরির শুরু। বাজারটির পুরোনো প্রতিষ্ঠান পাটোয়ারী মিষ্টি মেলার পরিচালক মোমিনুল ইসলাম পাটোয়ারী জানান, কয়েকজন কারিগর প্রথমে এখানে মিষ্টি তৈরি শুরু করেন। তাঁদের কাছ থেকেই মিষ্টি তৈরির কৌশল শেখেন কবির আহমদ পাটোয়ারী।
একসময় সেই কারিগরেরা অন্যত্র চলে যান। তবে তাঁদের রেখে যাওয়া মিষ্টি তৈরির ধারাটি থেমে থাকেনি। কবির আহমদ নিজেই মিষ্টি তৈরি ও বিক্রি শুরু করেন। তিন যুগেরও বেশি সময় ধরে তিনি এই কাজ করেছেন। তার হাত ধরেই খন্ডলহাই বাজারে মিষ্টিটির পরিচিতি আরও ছড়িয়ে পড়ে।
প্রায় সাত বছর আগে কবির আহমদ মারা যান। এরপর তাঁর দুই ছেলে দোকানের দায়িত্ব নেন। বাবার গড়ে তোলা ব্যবসা ধরে রেখেছেন তাঁরা। এখন খন্ডলহাই বাজারের দুটি দোকানে প্রতিদিন তিন থেকে চার মণ মিষ্টি বিক্রি হয়। প্রতি কেজির দাম ২২০ টাকা।
ছানা, হাতের কৌশল আর চিনির শিরা
খন্ডলের মিষ্টি তৈরির মূল উপকরণ খাঁটি দুধের ছানা। তবে শুধু ছানা আর চিনি থাকলেই এই মিষ্টি তৈরি হয় না; এর পেছনে রয়েছে কারিগরদের নিজস্ব কৌশল।
কারিগরদের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রথমে দুধ থেকে ছানা তৈরি করা হয়। এরপর বিশেষ পদ্ধতিতে ছানা থেকে ননী বা ক্রিম আলাদা করা হয়। সেই ছানা হাতের তালুতে ঘুরিয়ে গোল্লার আকার দেওয়া হয়। সবশেষে হালকা চিনির শিরায় সিদ্ধ করলেই তৈরি হয় খন্ডলের মিষ্টি।
মিষ্টির আকার, নরম গঠন আর শিরার মিষ্টতা ঠিক রাখার বিষয়টি এখানে গুরুত্বপূর্ণ। ক্রেতাদের কেউ গরম গরম মিষ্টি খেতে পছন্দ করেন, কেউ আবার বাড়িতে নিয়ে গিয়ে পরিবারের সবার সঙ্গে ভাগ করে খান। স্থানীয় মানুষের দীর্ঘদিনের অভ্যাসের সঙ্গে মিশে গেছে এই মিষ্টি।
প্রবাসীদের ব্যাগে চড়ে বিদেশে
খন্ডলের মিষ্টির জনপ্রিয়তার আরেকটি দিক হলো এর সঙ্গে প্রবাসীদের সম্পর্ক। সৌদি আরব, কুয়েত, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ওমান, বাহরাইন ও মালয়েশিয়ায় বসবাসরত অনেক প্রবাসী দেশ থেকে যাওয়ার সময় এই মিষ্টি সঙ্গে নিয়ে যান। কখনো কখনো ইউরোপের বিভিন্ন দেশেও পৌঁছে যায় এটি।
প্রয়াত কবির আহমদ পাটোয়ারীর চাচাতো ভাই মোমিনুল ইসলাম পাটোয়ারী জানান, পরশুরাম, ফুলগাজী ও ছাগলনাইয়া উপজেলার অনেক মানুষ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বসবাস করেন। তাঁদের অনেকেই খন্ডলের মিষ্টির ভক্ত। দেশে বেড়াতে এলে কিংবা প্রবাসে ফেরার আগে তাঁরা মিষ্টি কিনে নেন। ফেনীর বাইরের বিভিন্ন এলাকা থেকেও ক্রেতারা আসেন এই মিষ্টি নিতে।
প্রবাসীদের কাছে এটি শুধু খাওয়ার মিষ্টি নয়, দেশের বাড়ি থেকে স্বজনদের জন্য নিয়ে যাওয়া উপহারও। পরিচিত কাউকে দিতে কিংবা পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ভাগ করে খেতে অনেকেই এই মিষ্টি বেছে নেন। এভাবেই স্থানীয় একটি খাবার ছড়িয়ে পড়ছে দেশের বাইরের নানা গন্তব্যে।
খন্ডলহাই বাজারের দুই কারিগর প্রায় ১০ বছর আগে পরশুরাম হাসপাতাল চৌমুহনী এলাকায়ও একটি দোকান চালু করেন। সেখানেও মিষ্টিটির ভালো চাহিদা রয়েছে। ফলে খন্ডলহাই বাজারের বাইরেও এই মিষ্টি কেনার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
প্রায় চার দশক ধরে খন্ডলের মিষ্টি মানুষের রসনা তৃপ্ত করছে। সময়ের সঙ্গে বদলেছে ক্রেতার পরিসর, বেড়েছে পরিচিতি। স্থানীয় বাজারের গণ্ডি ছাড়িয়ে এটি এখন প্রবাসীদের হাত ধরে পৌঁছাচ্ছে নানা দেশে। ছোট্ট একটি মিষ্টির গোল্লায় তাই মিশে আছে স্থানীয় ঐতিহ্য, কারিগরদের শ্রম আর দেশের স্বাদ সঙ্গে করে নিয়ে যাওয়ার এক চেনা আবেগ।
ছবি: লেখক





