বিক্ষোভ দমনে পুলিশি বর্বরতার মধ্যেই বড় গলা মোদির
ভারত ‘গণতন্ত্রের জননী’
- মোদির বক্তব্যের সঙ্গে দিল্লির পরিস্থিতির বৈপরীত্য
- অভিযোগ উঠেছে নাবালকদের আটক করার

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
রাজধানীতে নাগরিকদের বিক্ষোভ দমনে পুলিশি ধরপাকড়, মারধর ও হেনস্তার অভিযোগ উঠেছে। ছাত্রদের প্রতিবাদ ঠেকাতে মেট্রো স্টেশন বন্ধ, রেল পরিষেবা ব্যাহত, চারদিকে ব্যারিকেড। আটক করা হচ্ছে ছাত্র ও যুবনেতাদের। আইনজীবী ও সাংবাদিকদের কাজেও বাধা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। পুলিশের এই বর্বরতার মধ্যেই গত সোমবার প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ঘোষণা, ভারত ‘গণতন্ত্রের জননী’। দিল্লিতে প্রতিবাদীদের ওপর পুলিশি পদক্ষেপ নিয়ে যখন প্রশ্ন উঠছে, তখন গণতন্ত্রের প্রশস্তিতে প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্যে সামনে এসেছে এক তীব্র বৈপরীত্য।
নয়াদিল্লিতে গত সোমবার শুরু হওয়া ব্লুমবার্গ নিউ ইকোনমি ফোরামে দীর্ঘ বক্তৃতা দেন মোদি। সেখানে তিনি বলেছেন, ‘আসল প্রশ্ন কে ক্ষমতায় রয়েছে, তা নয়। বরং প্রশ্ন হলো, সেই ক্ষমতা কীভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে।’ ক্ষমতার ব্যবহারের ওপরই যখন গণতন্ত্রের প্রকৃত চরিত্র নির্ভর করে, তখন দিল্লিতে প্রতিবাদ দমনে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে ওঠা অভিযোগও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। নাগরিকরা ক্ষমতাকে প্রশ্ন করলে তাদের সঙ্গে রাষ্ট্রের আচরণ কেমন হবে, সেই প্রশ্নই এখন সামনে।
গত ১০ অক্টোবর থেকে প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ ঘিরে দিল্লিতে একের পর এক পদক্ষেপ করেছে পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনী। বিক্ষোভের অনুমতি না দেওয়া, মেট্রো স্টেশন বন্ধ রাখা, রেল পরিষেবা থামানো, একাধিক স্তরে ব্যারিকেড বসানো এবং ছাত্র-যুবনেতাদের আটক করার অভিযোগ উঠেছে। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও আইনজীবী ও সাংবাদিকদের কাজে বাধা দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ। এ পরিস্থিতির মধ্যে গত রবিবার বিরোধী জোট ‘ইন্ডিয়া’র যৌথ মিছিল ছিল ব্যতিক্রম।
শুধু বিক্ষোভ আটকানো নয়, আটক ব্যক্তিদের সঙ্গে পুলিশের আচরণ নিয়েও গুরুতর অভিযোগ সামনে এসেছে। বিক্ষোভকারীদের দাবি, তাদের মারধর করা হয়েছে, গোপনাঙ্গে আঘাত করা হয়েছে এবং মোবাইল ফোন কেড়ে নেওয়া হয়েছে। নাবালকদেরও আটক করার অভিযোগ উঠেছে। একই সঙ্গে বিক্ষোভের ডাক ও প্রচারে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভূমিকা থাকলেও দিল্লির কেন্দ্রীয় এলাকায় এবং পুলিশের অস্থায়ী আটককেন্দ্রগুলোয় ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ করার অভিযোগ সামনে এসেছে। ফলে গণতান্ত্রিক অধিকার ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন আরও জোরালো হয়েছে।
অথচ মোদির বক্তৃতার একটি বড় অংশ জুড়েই ছিল ভারতে মতপ্রকাশের পরিসর এবং ডিজিটাল প্রযুক্তির বিস্তারের প্রশংসা। তার দাবি, ভারতে ১০০-এর বেশি ভাষা, প্রায় ৮০ হাজার নিবন্ধিত সংবাদপত্র ও প্রকাশনা এবং ১ হাজারেরও বেশি স্যাটেলাইট টেলিভিশন চ্যানেল রয়েছে। সামাজিক মাধ্যমের প্রসঙ্গ তুলে তিনি জানিয়েছেন, দেশে ইউটিউব ও ইনস্টাগ্রাম— দুই প্ল্যাটফর্মেই ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৫০ কোটির বেশি। তার বক্তব্য, ভারতীয়রা প্রকাশ্যে বিভিন্ন বিষয়ে বিতর্ক করেন এবং নানা মত নিয়ে আলোচনা করেন। এই পরিসর গড়ে তুলতে ডিজিটাল প্রযুক্তিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছে।
কিন্তু মোদির এই বক্তব্যের সঙ্গে দিল্লির পরিস্থিতির বৈপরীত্যও স্পষ্ট। যে সামাজিক মাধ্যমের সাহায্যে বিক্ষোভের ডাক ছড়িয়েছে, সেই প্রতিবাদের সময়ই রাজধানীর কেন্দ্রীয় এলাকায় ইন্টারনেট বন্ধের অভিযোগ উঠেছে। পুলিশের তৈরি অস্থায়ী আটককেন্দ্রগুলোয়ও ইন্টারনেট পরিষেবা বিচ্ছিন্ন করা হয়েছিল বলে অভিযোগ। একদিকে আন্তর্জাতিক মঞ্চে ডিজিটাল যোগাযোগ ও মুক্ত আলোচনার প্রশংসা, অন্যদিকে প্রতিবাদের সময় সেই যোগাযোগের পথ বন্ধ করে দেওয়ার অভিযোগ। এই দুই ছবির মধ্যে সামঞ্জস্য কোথায়? সেই প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
ডিজিটাল ব্যবস্থার প্রশংসা করতে গিয়ে রাস্তার ছোট বিক্রেতা থেকে বড় গাড়ির শোরুম পর্যন্ত ইউপিআই ব্যবহারের উদাহরণও দেন প্রধানমন্ত্রী। তবে এ ব্যবস্থাকে ঘিরেও অর্থনৈতিক উদ্বেগ রয়েছে। ১৫ অক্টোবর থেকে ইউপিআই লেনদেনে ব্যবসায়ীদের ওপর নতুন ফি চালুর প্রস্তাব কার্যকর হওয়ার কথা। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, এতে পণ্যের দাম বাড়তে পারে, ছোট ব্যবসায়ীদের আয় কমতে পারে এবং সাধারণ পরিবারের খরচ করার ক্ষমতা দুর্বল হতে পারে।
সব মিলিয়ে মোদির বক্তৃতায় ভারতের গণতান্ত্রিক পরিসর ও ডিজিটাল অগ্রগতির ছবি উঠে এলেও দিল্লির সাম্প্রতিক ঘটনাবলি অন্য প্রশ্ন সামনে আনছে। গণতন্ত্রের শক্তি শুধু সংবাদপত্রের সংখ্যা, সামাজিক মাধ্যমের ব্যবহারকারী কিংবা ডিজিটাল লেনদেনের বিস্তারে মাপা যায় না। তার আসল পরীক্ষা হয় নাগরিকরা নির্ভয়ে প্রতিবাদ করতে পারছেন কি না, রাষ্ট্র ভিন্নমতকে কতটা সম্মান করছে এবং ক্ষমতাকে প্রশ্ন করার অধিকার কতটা সুরক্ষিত— সেই জায়গায়। দিল্লিতে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে ওঠা অভিযোগের জবাব না দিয়ে গণতন্ত্রের গরিমা প্রচার করলে সেই প্রশ্ন মুছে যায় না। ভারতকে ‘গণতন্ত্রের জননী’ বলে ঘোষণা করা সহজ। কিন্তু বাস্তবে সেই পরিচয়ের মর্যাদা রক্ষা করা কঠিন!



