দুই কক্ষেই দিশাহারা রিপাবলিকান

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
মুহূর্তেই থমকে গেল যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের এতদিনের বাগাড়ম্বর, অতিআত্মবিশ্বাসী বক্তব্য আর অতিউৎসাহী প্রচারণা। ক্ষমতার মাঝ আকাশে দেশের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের বড় ধরনের পরাজয় ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্য নিয়ে এসেছে বড় রাজনৈতিক ধাক্কা। হোয়াইট হাউজের সব জানালা খোলা, তবু হাঁসফাঁস দশা! শ্বাসকষ্ট শুরু হওয়ার ঠিক আগে গলার টাইটা যেমন টেনেটুনে ঢিলা করে নেন সাহেবরা— রাষ্ট্রক্ষমতার এই বিরাট প্রাসাদে আজ যেন ট্রাম্পেরও সেই দমবন্ধ পরিণতি। চেনা হোয়াইট হাউজ, প্রিয় ওভাল অফিস, পেন্টাগনের দম্ভ— সব থেকেও সর্বস্ব হারানোর হাহাকার। ভোটারদের ক্ষোভের বানে বালির বাঁধের মতো ভেসে গেছে কংগ্রেসে গত দুই বছরের সংখ্যাগরিষ্ঠতার পাহাড়। সুতরাং ‘যখন যা মন চায়’ করার সেই খেয়ালের তেলেসমাতি শেষ! হাতকড়া পড়ে গেছে নির্বাহী ক্ষমতার দম্ভেও। বুঝে-শুনে সই করতে হবে। পা টিপে টিপে চলতে হবে বাকি দিনগুলোর পথ! ওত পেতে বসে আছে অভিশংসনের ফাঁদ!
জরিপ সংস্থাগুলোর পূর্বাভাসে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস থাকলেও শেষ পর্যন্ত নির্বাচনের ফল পরিণত হয়েছে রিপাবলিকানদের বিপর্যয়ে। কংগ্রেসের দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে এখন কঠিন রাজনৈতিক সমীকরণের মুখে ট্রাম্প প্রশাসন। অন্যদিকে ওয়াশিংটনের ক্ষমতার ভারসাম্যে নতুন অবস্থান তৈরি করেছে ডেমোক্র্যাটরা।
গতকাল বুধবার সকাল পর্যন্ত পাওয়া ফলাফল অনুযায়ী, সিনেটে ডেমোক্র্যাট ও তাদের সঙ্গে থাকা স্বতন্ত্র সদস্যদের আসন দাঁড়িয়েছে ৫৪টি। অন্যদিকে রিপাবলিকানদের আসন ৪৪টি। তখন পর্যন্ত ৩৫টি নির্বাচনী আসনের মধ্যে ৩৩টির ফল ঘোষণা করা হয়েছিল। প্রতিনিধি পরিষদেও ডেমোক্র্যাটরা সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে। ৪৩৫ আসনের মধ্যে ৩৬৭টির ফল পাওয়া পর্যন্ত ডেমোক্র্যাটরা পেয়েছে ২২৮টি আসন, রিপাবলিকানরা পেয়েছে ১৩৯টি। সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজন ২১৮টি আসন। অর্থাৎ, উচ্চকক্ষ ও নিম্নকক্ষ— দুই জায়গাতেই নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে ট্রাম্পের দল।
এ নির্বাচনে রিপাবলিকানদের পরাজয়ের পেছনে কয়েকটি বিষয় বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়। নির্বাচনের আগে থেকেই এসব বিষয় নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর অসন্তোষ বাড়ছিল। ভোটের ফল প্রকাশের পর রিপাবলিকান শিবিরের ভেতরেও পরাজয়ের কারণ নিয়ে আলোচনা ও পাল্টাপাল্টি দোষারোপ শুরু হয়েছে।
দলের একাংশের অভিযোগ, ট্রাম্পের রাজনৈতিক কৌশল এবং তার বাছাই করা প্রার্থীদের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা নির্বাচনে বিপর্যয় ডেকে এনেছে। অন্যদিকে ইরান যুদ্ধ ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতিকে পরাজয়ের বড় কারণ হিসেবে দেখছেন দলটির অনেক নেতাকর্মী। ট্রাম্প নিজেও নির্বাচনের পর একাধিক সাক্ষাৎকারে ইরান যুদ্ধকে রিপাবলিকানদের পরাজয়ের অন্যতম কারণ হিসেবে স্বীকার করেছেন। তবে যুদ্ধ শুরুর সিদ্ধান্ত নিয়ে অনুশোচনা নেই বলেও জানিয়েছেন তিনি।
নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর ট্রাম্প পরাজয়ের দায় নিজের ওপর নিতে চাননি। তিনি বলেছেন, তিনি নিজে নির্বাচনে প্রার্থী ছিলেন না। বরং তিনি প্রার্থী হলে উল্টো চিত্র হতো— পেতেন ভূমিধস জয়। অথচ নির্বাচনের আগে বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে প্রচারণা চালিয়ে রিপাবলিকান প্রার্থীদের পক্ষে ভোট চেয়েছিলেন তিনি। ফলে এই ফলকে ট্রাম্পের নেতৃত্ব ও জনপ্রিয়তার জন্যও বড় রাজনৈতিক পরীক্ষা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এ নির্বাচনে মুসলিম প্রার্থীদের সাফল্যও বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে। মিশিগান থেকে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী আবদুল এল-সাইয়েদ রিপাবলিকান প্রার্থী মাইক রজার্সকে পরাজিত করে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রথম মুসলিম সিনেটর নির্বাচিত হয়েছেন। তার এই জয় মার্কিন কংগ্রেসে মুসলিম প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রে নতুন ইতিহাস তৈরি করেছে।
অন্যদিকে মিনেসোটা থেকে ইলহান ওমর পঞ্চমবারের মতো প্রতিনিধি পরিষদে নিজের আসন ধরে রেখেছেন। মিশিগান থেকে রাশিদা তালাইব, ইন্ডিয়ানা থেকে আন্দ্রে কারসন এবং ক্যালিফোর্নিয়া থেকে লতিফা সাইমনও পুনর্নির্বাচিত হয়েছেন। নতুন মুখ হিসেবে নিউ জার্সি থেকে আদম হামাওয়ি এবং নিউ ইয়র্ক থেকে দারিয়ালিজা আভিলা শেভালিয়ারেরও জয় এসেছে। প্রাথমিক ফল অনুযায়ী, সিনেট ও প্রতিনিধি পরিষদ মিলিয়ে অন্তত সাতজন মুসলিম প্রার্থী কংগ্রেসে নির্বাচিত হয়েছেন।
এদিকে রিপাবলিকানদের জন্য এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ দলের অভ্যন্তরীণ ঐক্য ধরে রাখা। দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ হারানোর ফলে ট্রাম্প প্রশাসনের আইন প্রণয়ন, বাজেট অনুমোদন এবং বিভিন্ন নীতিগত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে পড়বে। ডেমোক্র্যাটরা প্রশাসনের বিভিন্ন সিদ্ধান্তের ওপর কংগ্রেসের মাধ্যমে নজরদারি বাড়ানোর সুযোগ পাবে। তদন্ত ও জবাবদিহির ক্ষেত্রেও বাড়বে তাদের ক্ষমতা।
সব মিলিয়ে ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচন ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের জন্য বড় রাজনৈতিক ধাক্কা হয়ে এসেছে। হোয়াইট হাউজের নিয়ন্ত্রণ তার হাতে থাকলেও কংগ্রেসের দুই কক্ষ ডেমোক্র্যাটদের দখলে যাওয়ায় আগামী দুই বছর তাকে বিরোধী দলের শক্তিশালী বাধার মুখে পড়তে হবে। হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের প্রত্যাশা থেকে রিপাবলিকানদের এমন বিপর্যয় ওয়াশিংটনের রাজনীতিতে তৈরি করেছে নতুন বাস্তবতা।



