যুদ্ধ থামাতে আলোচনা, কিন্তু আমেরিকার ওপর আস্থা নেই ইরানের

সংগৃহীত ছবি
প্রায় তিন মাসের যুদ্ধের পর সংঘাত থামাতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমঝোতার আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে ইরান। তবে যুদ্ধবিরতি ও কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়লেও ওয়াশিংটনের প্রতি তেহরানের গভীর অবিশ্বাস এখনো কাটেনি। ইরানের রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্বের বড় অংশ মনে করছে, সম্ভাব্য কোনো চুক্তি ভবিষ্যতে নতুন হামলার পথও তৈরি করতে পারে।
ইরানের জ্যেষ্ঠ আইনপ্রণেতা আব্বাস মোকতাদাই মঙ্গলবার রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনকে বলেছেন, ‘আমাদের মূল নীতি হলো আমেরিকার প্রতি অবিশ্বাস।’ কাতার সফর শেষে পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফের নেতৃত্বাধীন প্রতিনিধিদল তেহরানে ফেরার পর তিনি এ মন্তব্য করেন।
এর কয়েক ঘণ্টা আগেই ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অভিযোগ করে, গত ৮ এপ্রিল হওয়া নড়বড়ে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করে যুক্তরাষ্ট্র সোমবার রাতে দক্ষিণাঞ্চলীয় হরমোজগান প্রদেশে হামলা চালিয়েছে। তেহরানের ভাষ্য অনুযায়ী, এই হামলাই যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি তাদের ‘গভীর সন্দেহ’ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) দাবি করেছে, তারা পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় একটি মার্কিন আরকিউ-৪ ড্রোন ভূপাতিত করেছে। দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি ‘আরাশ-ই কামানগির’ নামের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ব্যবহার করে ড্রোনটি ধ্বংস করা হয় বলে জানানো হয়েছে। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে ধ্বংস হওয়া ড্রোনের ধ্বংসাবশেষও দেখানো হয়।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী বলেছে, তারা ‘প্রতিরক্ষামূলক পদক্ষেপ’ হিসেবে ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ কেন্দ্র এবং সমুদ্রে মাইন পেতে থাকা ইরানি নৌযানকে লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে।
এমন উত্তেজনার মধ্যেই উভয় পক্ষ একটি সমঝোতা স্মারকের (এমওএম) চূড়ান্ত খসড়া নিয়ে আলোচনা চালাচ্ছে। এই সমঝোতা বাস্তবায়িত হলে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক হতে পারে। গত ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর থেকে ওই অঞ্চলে বাণিজ্যিক চলাচল কার্যত স্থবির হয়ে পড়ে।
সম্ভাব্য চুক্তির আওতায় ইরান মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে আটকে থাকা বিদেশি সম্পদের কিছু অংশ ব্যবহারের সুযোগ পেতে পারে। একই সঙ্গে দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে ভবিষ্যৎ আলোচনার পথও খুলে যেতে পারে।
তবে ইরানের ক্ষমতাকাঠামোর ভেতরে চুক্তি নিয়ে তীব্র সংশয় রয়েছে। প্যারিসভিত্তিক সায়েন্সেস পোর গবেষক নিকোল গ্রায়েভস্কি আলজাজিরাকে বলেছেন, ‘ইরানের নেতৃত্বের অনেকেই আশঙ্কা করছেন, এই সমঝোতা হয়তো শুধু সাময়িক বিরতি এনে দেবে, যাতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ভবিষ্যতের আরেক দফা বড় হামলার প্রস্তুতি নিতে পারে।’
তার মতে, ইরানের জন্য এই চুক্তিকে ‘আত্মসমর্পণ’ নয়, বরং ‘নিয়ন্ত্রিত স্থিতিশীলতা’ হিসেবে তুলে ধরা জরুরি। এজন্য তেহরান অন্তত কিছু ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ সক্ষমতা ধরে রাখতে চাইবে এবং নিষেধাজ্ঞা শিথিলের বাস্তব সুবিধা দেখতে চাইবে।
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান সম্প্রতি বলেছেন, ‘আমরা পারমাণবিক অস্ত্র চাই না, আমরা অঞ্চলে অস্থিতিশীলতাও চাই না। কিন্তু দেশটির কঠোরপন্থি সামরিক গোষ্ঠীগুলো এখনো যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমঝোতার ব্যাপারে অনড় অবস্থানে রয়েছে।
আইআরজিসির প্রভাবশালী কমান্ডার মাজিদ মুসাভি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, ‘শত্রুর সঙ্গে আলোচনা মানেই ক্ষতি।’ বলেছেন, ‘প্রয়োজনে আবারও যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত রয়েছে ইরান।’
ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের নতুন প্রধান মোহাম্মদ বাঘের জোলঘাদরও বলেছেন, ‘পিছু হটার কোনো সুযোগ নেই।’
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের কঠোরপন্থিরা বিশেষভাবে উদ্বিগ্ন হরমুজ প্রণালি, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে সম্ভাব্য ছাড়ের বিষয়ে। মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক গবেষক অ্যালেক্স ভাতাঙ্কা বলেছেন, “তেহরানে এখন আলোচনার প্রশ্নটা আর ‘আলোচনা হবে কি না’ নয়; বরং ‘কী হারাতে হবে’—সেটি।”
এদিকে ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে নতুন করে আশঙ্কা প্রকাশ করা হচ্ছে, যুদ্ধবিরতি ভেঙে গেলে দেশটির শীর্ষ নেতারা হত্যাচেষ্টার ঝুঁকিতে পড়তে পারেন। কিছু বিশ্লেষক এমনও দাবি করেছেন, সম্ভাব্য সমঝোতা হয়তো ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বকে বের করে আনার একটি ফাঁদও হতে পারে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যমগুলোর দাবি, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিকে প্রকাশ্যে দেখা যায়নি। তিনি একটি গোপন নিরাপদ স্থানে অবস্থান করছেন, যেখানে সরকারের অনেক কর্মকর্তারও প্রবেশাধিকার নেই। মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, এ কারণেও আলোচনা প্রক্রিয়া ধীর হয়ে পড়েছে।
বিশ্লেষকদের ধারণা, স্বল্পমেয়াদে হয়তো একটি অস্থায়ী সমঝোতা সম্ভব হতে পারে। তবে সেটি স্থায়ী শান্তি নিশ্চিত করবে কি না, তা নির্ভর করবে পরবর্তী পারমাণবিক আলোচনা এবং দুপক্ষের মধ্যে আস্থার পরিবেশ তৈরির ওপর। আপাতত যুদ্ধবিরতির আড়ালেও ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার গভীর সন্দেহ ও উত্তেজনা থেকেই যাচ্ছে।






