যুক্তরাষ্ট্রে কংগ্রেস দখলের নির্বাচন
ট্রাম্পের পায়ে শিকল লাগানোর দিন
- সিনেটে পদপ্রার্থী মুসলিম আব্দুল সাইয়িদ যুক্তরাষ্ট্রের ‘টক অব দ্যা কান্ট্রি'তে পরিণত
- মিশিগানে কি ডেমোক্র্যাটরা হারতে যাচ্ছেন?
- সর্বশেষ জরিপে কংগ্রেসে জিতছেন ডেমাক্র্যাটরাই!
- বিকল্প পথ খুঁজছেন ট্রাম্প!

ডেমাক্র্যাটরা জিতলে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ক্ষমতার রশি টেনে ধরবেন তা নিশ্চিত।
রাত পোহালেই অর্থাৎ কাল মঙ্গলবার ৩ নভেম্বর (স্থানীয় সময় অনুসারে) যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন। কংগ্রেস তথা ক্যাপিটল হিল দখলের নির্বাচন। ২১ কোটি ভোটারের রায় আসবে এদিন। যদিও এ নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট পরিবর্তন হবে না। তবে ডেমাক্র্যাটরা জিতলে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ক্ষমতার রশি টেনে ধরবেন তা নিশ্চিত। ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিক্যান উভয় শিবিরেই উত্তেজনা। বর্তমান কংগ্রেসে রিপাবলিকানদের সিনেটে সিট ৫৩। ডেমোক্র্যাটদের ৪৭। হাউজে রিপাবলিক্যানদের আসন ২১৮, ডেমোক্র্যাট ২১৪, স্বতন্ত্র ১ ও শূন্য আসন ২। ডেমোক্র্যাটদের সিনেট দখলে ৪টি ও হাউজে জিততে আরও ৭টি আসন প্রয়োজন হবে।
কংগ্রেসের উচ্চ কক্ষ সিনেট নির্বাচনে মিশিগান স্টেট থেকে ডেমোক্র্যাট দলীয় প্রার্থী মুসলিম আব্দুল আল সাইয়িদ যুক্তরাষ্ট্রের ‘টক অব দ্যা কান্ট্রি’তে পরিণত হয়েছেন। প্রাইমারি নির্বাচনে আব্দুলের কাছে হেে যাওয়া ডেমোক্র্যাটিক পার্টির নেত্রী হ্যালি স্টিভেন্স ডিগবাজি দিয়ে ইসরাইলের কট্রর সর্মথক রিপাবলিক্যান প্রার্থী মাইক রর্জাসকে প্রকাশে সর্মথন দিয়েছেন রোববার। তার এই ঘোষণায় যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে আকাশ ভেঙ্গে পড়ার অবস্থা। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সাথে সাথে তাকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। বলেছেন, হ্যালির উচিৎ ছিল আগেই ডেমোক্র্যাটিক ত্যাগ করা। ডেমোক্র্য্যাটিক পার্টি রোববারেই হ্যালি স্টিভেন্সকে দল থেকে বহিস্কার করেছে। সিনেটে বিরোধী দলীয় নেতা চাক শু্যমার হ্যালি স্টিভেন্সের দল পরিবর্তনকে ‘ডিসগ্রেসফুল’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। অথচ আগষ্টের প্রাইমারি নির্বাচনে চ্যাক শু্যমার হ্যালিকেই সর্মথন দিয়েছিলেন। হ্যালি ১৫ হাজার ভোটে আব্দুলের কাছে পরাজিত হন। রাজনীতিকরা বলছেন, নিজ দলের আব্দুলের কাছে হেরে গিয়ে রিপাবলিক্যান প্রার্থীকে সর্মথন দিয়ে পরাজয়ের প্রতিশোধ নিলেন হ্যালি স্টিভেন্স। পাশাপাশি তিনি ইসরাইলের কট্রর সর্মথক। তার স্বামী একজন জুইস ও ইসরাইলের একজন ডোনার। অন্যদিকে আব্দুল সাইয়েদ প্যালেস্টাইনের সর্মথক। গাজায় গন্য হত্যার জন্য সরাসরি তিনি ইসরইলকে দায়ী করেছেন। একই সাথে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে জিনিষপত্রের দাম বেড়ে যাওয়ায়ও ইসরাইল ও ট্রাম্পকে দোষারোপ করেছেন।
কোটি কোটি ডলার নির্বাচনে ব্যয় করা হচ্ছে সিনেটে একমাত্র মুসলিম প্রার্থী আব্দুলকে ঠেকাতে। নির্বাচনের ২ দিন আগে মিশিগানে ডেমোক্র্যাটিক শিবিরের ভাঙ্গনে আব্দুলের জয়ের সম্ভাবনা নিয়ে দিনভর আলোচনা চলছে যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে। শেষ পর্যন্ত এগিয়ে থাকা আব্দুল ও ডেমোক্র্যাটিক পার্টি সেখানে হারতে যাচ্ছেন এমন চিত্রটিই তুলে ধরার চেষ্টা হচ্ছে।
রোববারে নিউইয়র্ক টাইমস ও সিয়েনা ইউনিভার্সিটির সর্বশেষ জনমত জরিপ অনুযায়ী আব্দুল এগিয়ে রয়েছেন ২ পয়েন্টে।তবে এই জরিপটি মিশিগানে গত রোবারের ডেমোক্র্যাটদের অভ্যন্তরীণ বিরোধ শুরুর আগেই পরিচালিত হয়েছিল। মিশিগানে ডেমোক্র্যাট দলীয় শুধু তাই নয় এই জরিপে সিনেটের নিয়ন্ত্রণ কোন দলের হাতে থাকবে তা নির্ধারণকারী সাতটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গরাজ্যের প্রায় সবকটিতেই রিপাবলিকানদের চেয়ে ডেমোক্র্যাটরা এগিয়ে রয়েছে।
জরিপে দেখা গেছে, টেক্সাস এবং কানসাসে ডেমোক্র্যাটরা বেশ ভালো ব্যবধানে এগিয়ে আছে। উল্লেখ্য, টেক্সাসে ১৯৮৮ সালের পর এবং কানসাসে ১৯৩২ সালের পর থেকে কোনো ডেমোক্র্যাট প্রার্থী সিনেটর হিসেবে নির্বাচিত হননি।
সিনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের জন্য ডেমোক্র্যাটদের বর্তমান আসনগুলো ধরে রাখার পাশাপাশি রিপাবলিকানদের দখলে থাকা অন্তত চারটি আসন নিজেদের নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। এটি একটি অত্যন্ত কঠিন লড়াই হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। কারণ তাদের জয়ের জন্য প্রয়োজনীয় আসনগুলোর অনেকগুলোই রিপাবলিকানদের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত।
তবে নতুন জরিপ অনুযায়ী, বর্তমানে রিপাবলিকান সিনেটর রয়েছেন এমন পাঁচটি অঙ্গরাজ্যে ডেমোক্র্যাট প্রার্থীরা এগিয়ে আছেন। ষষ্ঠ একটি অঙ্গরাজ্যে উভয় দলের অবস্থান প্রায় সমান। কানসাস, মেইন, ওহাইও ও টেক্সাসে ডেমোক্র্যাটরা এগিয়ে আছেন এবং আলাস্কায় সামান্য ব্যবধানে এগিয়ে রয়েছেন। আইওয়া অঙ্গরাজ্যে উভয় দলের অবস্থান প্রায় সমান।
মিশিগান। যা সিনেট নির্বাচনের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রগুলোর মধ্যে একমাত্র আসন যেখানে বর্তমানে ডেমোক্র্যাটরা জয়ী আছেন। জরিপে দেখা গেছে, ডেমোক্র্যাট প্রার্থী দুই অঙ্কের ব্যবধানে এগিয়ে রয়েছেন। (এই জরিপটি মিশিগানে সপ্তাহান্তে ডেমোক্র্যাটদের অভ্যন্তরীণ বিরোধ শুরুর আগেই পরিচালিত হয়েছিল।) এই জরিপগুলোর অন্তর্ভুক্ত ছিল না নর্থ ক্যারোলিনা। সেখানে দীর্ঘ সময় ধরে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী এগিয়ে আছেন এবং রিপাবলিকানরা সেখানে তাদের নির্বাচনী প্রচারণার ব্যয় কমিয়ে দিয়েছে।
জরিপ অনুযায়ী, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের প্রতি অসন্তোষ এবং অর্থনীতি পরিচালনার ক্ষেত্রে তাঁর ব্যর্থতা রিপাবলিকানদের পিছিয়ে দিচ্ছে। জরিপভুক্ত সাতটি অঙ্গরাজ্যে সম্ভাব্য ভোটারদের মাত্র ৩৮ শতাংশ প্রেসিডেন্টের কাজের অনুমোদন দিয়েছেন। এটি অত্যন্ত কম একটি সংখ্যা, বিশেষ করে যখন মাত্র দুই বছর আগেই ট্রাম্প এই সাতটির মধ্যে পাঁচটি অঙ্গরাজ্যে দুই অঙ্কের ব্যবধানে জয়ী হয়েছিলেন।
ডেমোক্র্যাটদের এই নতুন শক্তির পেছনে রয়েছে অর্থনীতি সামলানোর ক্ষেত্রে দলটির ওপর ভোটারদের ক্রমবর্ধমান আস্থা—যা এ বছর ভোটারদের সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। জীবনযাত্রার ব্যয়ের প্রশ্নে এই গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গরাজ্যগুলোতে ডেমোক্র্যাটরা নয় পয়েন্টের ব্যবধানে এগিয়ে আছে এবং প্রতিটি অঙ্গরাজ্যেই তারা এই নির্ণায়ক ইস্যু এগিয়ে রয়েছেন।
যদি এই জরিপগুলো সঠিক হয় এবং এই প্রবণতা বজায় থাকে, তবে ডেমোক্র্যাটরা সিনেটের নিয়ন্ত্রণ লাভ করবে। অন্যদিকে কংগ্রেসের নিম্ন কক্ষ হাউজ অব রিপ্রেজেনটেটিভসে (প্রতিতিনিধি পরিষদ) ডেমোক্র্যাটরা ৪৩৫টি আসনের নির্বাচনে ২১৮টি আসনের বেশি আসনে জিতবেন সেটা নিশ্চিত। অীদকাংশ জরিপে তাদেও ২৩৭টি সিটে জয়ের সম্ভাবনা দেখানো হচ্ছে। বিষয়টি আঁচ করতে পেরেছেন ট্রাম্প প্রশাসন। কংগেসের নির্বাচনের সম্ভাব্য পরাজয় মেনে নিয়ে আগামী ২ বছর ট্রাম্প প্রশাসন কিভাবে দেশ চালাবেন তার পথও খুঁজছেন তারা।
তবে ডেমোক্র্যাটদের উদ্বেগের কিছু কারণও রয়েছে: এখনো কিছু ভোটার সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছেন এবং যারা গত এক মাসের মধ্যে তাদের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তাদের মধ্যে রিপাবলিকানদের প্রতি সমর্থন নয় পয়েন্ট বেশি। টেক্সাসের সিনেট নির্বাচনে, ডেমোক্র্যাটিক দলীয় স্টেট আইনপ্রণেতা জেমস টালারিকো, রিপাবলিকান দলীয় স্টেট অ্যাটর্নি জেনারেল কেন প্যাক্সটনের চেয়ে সাত পয়েন্টে এগিয়ে আছেন। সম্ভাব্য ভোটারদের মধ্যে টালারিকো ৫০ শতাংশ এবং প্যাক্সটন ৪৩ শতাংশ সমর্থন পেয়েছেন। জরিপে অন্তর্ভুক্ত প্রার্থীদের মধ্যে কেন প্যাক্সটনের ভাবমূর্তিই সবচেয়ে খারাপ—অন্য সবার তুলনায় অনেক পিছিয়ে তিনি।
মেইন অঙ্গরাজ্যে, নিউ ইংল্যান্ডের সর্বশেষ রিপাবলিকান সিনেটর সুসান কলিন্স তার পুনর্নির্বাচনী প্রচারণায় ডেমোক্রাটিক দলীয় সাবেক স্টেট সিনেটর ট্রয় জ্যাকসনের চেয়ে পিছিয়ে আছেন। সম্ভাব্য ভোটারদের মধ্যে ট্রয় জ্যাকসন ৫১ শতাংশ সমর্থন নিয়ে এগিয়ে আছেন। যেখানে সুসান কলিন্স পেয়েছেন ৪৫ শতাংশ। তবে মেইন রাজ্যেও হিসেবটি একটু ভিন্নতা দিয়েছে অতীতে। জনমত জরিপ নিখুঁত হয় না সেখানে। ছয় বছর আগে, নির্বাচনের আগের প্রতিটি জরিপেই সুসান কলিন্স পিছিয়ে ছিলেন।অথচ শেষ পর্যন্ত তিনি বেশ ভালো ব্যবধানেই পুনর্নির্বাচিত হয়েছিলেন। মেইন বাদে অন্য প্রতিটি অঙ্গরাজ্যেই, রিপাবলিকান প্রার্থীর তুলনায় ডেমোক্র্যাটিক সিনেট প্রার্থীরা ভোটারদের কাছে বেশি ইতিবাচক ভাবমূর্তি পেয়েছেন।



