বদলে যাচ্ছে প্রবাসজীবনের বাস্তবতা
আইসের অভিযানে আতঙ্কে নিউ ইয়র্কের অভিবাসীরা

ছবি: রয়টার্স
একসময় বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা মানুষের কাছে নিউ ইয়র্ক ছিল নিরাপত্তা, সম্ভাবনা ও নতুন জীবনের প্রতীক। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে সেই চিত্র দ্রুত বদলে যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্টের (আইস) ধারাবাহিক অভিযান, আকস্মিক ধরপাকড় এবং মুখোশধারী সশস্ত্র ফেডারেল এজেন্টদের উপস্থিতিতে অনথিভুক্ত অভিবাসীদের মধ্যে গভীর আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। অনেকের কাছে নিউ ইয়র্ক এখন আর শুধু সুযোগের শহর নয়, বরং প্রতিদিন গ্রেপ্তারের আশঙ্কায় ঘেরা অনিশ্চয়তার নগরী।
কুইন্স, ব্রুকলিন, ব্রঙ্কস, ম্যানহাটন, স্ট্যাটেন আইল্যান্ড থেকে লং আইল্যান্ড— নিউ ইয়র্কের বিভিন্ন এলাকায় আইসের সম্ভাব্য অভিযান নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। অভিবাসী অধিকার সংগঠনগুলোর ভাষ্য, অনেক অনথিভুক্ত অভিবাসী কর্মস্থলে যাওয়া কমিয়ে দিয়েছেন, প্রয়োজন ছাড়া বাইরে বের হচ্ছেন না। কেউ কেউ পরিচিত বাসা ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নিয়েছেন, আবার অনেকে আত্মগোপনে চলে গেছেন।
জ্যাকসন হাইটসের অভিবাসী ও কমিউনিটি সংগঠক আরিফ মিয়া জানিয়েছেন, এলাকায় আগে কখনো এমন ভয়ের পরিবেশ দেখেননি। তার ভাষ্য, আইসের অভিযানের কারণে পুরো এলাকায় এক ধরনের স্থবিরতা নেমে এসেছে। মানুষ অপ্রয়োজনীয়ভাবে বাইরে বের হচ্ছেন না, অনেকেই কাজে যেতে ভয় পাচ্ছেন। প্রতিদিনই অনিশ্চয়তা কাজ করছে।
এই আতঙ্ক শুধু কর্মস্থলে যাওয়া-আসার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সন্তানকে স্কুলে পৌঁছে দেওয়া, হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়া, আদালতে হাজিরা দেওয়া, গাড়ি চালানো কিংবা বিমানবন্দর ব্যবহার—দৈনন্দিন জীবনের প্রায় প্রতিটি কাজই অনেক অভিবাসীর কাছে এখন ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
গত ২৭ জুলাই থেকে নিউ ইয়র্ক সিটি ও আশপাশের এলাকায় আইসের তৎপরতা বেড়েছে বলে বিভিন্ন অভিবাসী অধিকার সংগঠন সতর্কবার্তা দিয়েছে। কুইন্সের পাশাপাশি ব্রুকলিন, ব্রঙ্কস, ম্যানহাটন, স্ট্যাটেন আইল্যান্ড এবং লং আইল্যান্ডের নাসাউ ও সাফোক কাউন্টিতেও একই ধরনের সতর্কতা জারি করা হয়েছে। তবে সাম্প্রতিক অভিযানে ঠিক কতজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, সে বিষয়ে আইস বা ডিপার্টমেন্ট অব হোমল্যান্ড সিকিউরিটি এখন পর্যন্ত কোনো পূর্ণাঙ্গ সরকারি তথ্য প্রকাশ করেনি। ফলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন সংখ্যা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
নিউ ইয়র্কের ‘স্যাংচুয়ারি সিটি’ নীতির কারণে স্থানীয় পুলিশ ও কারা কর্তৃপক্ষ সাধারণ দেওয়ানি অভিবাসন মামলায় আইসকে সরাসরি সহযোগিতা করতে পারে না। বিচারকের স্বাক্ষরযুক্ত পরোয়ানা ছাড়া শুধু প্রশাসনিক ইমিগ্রেশন ডিটেইনারের ভিত্তিতে কাউকে অতিরিক্ত সময় আটক রাখার সুযোগও সীমিত। তবে ফেডারেল কর্মকর্তাদের দাবি, আগে মুক্তি পাওয়া ব্যক্তিদের শনাক্ত করতেই মাঠপর্যায়ের অভিযান জোরদার করা হয়েছে।
অভিবাসী অধিকারকর্মীদের অন্যতম উদ্বেগ ‘কোল্যাটারাল অ্যারেস্ট’। অর্থাৎ, নির্দিষ্ট কাউকে খুঁজতে গিয়ে একই বাড়ি, কর্মস্থল, গাড়ি কিংবা আশপাশে থাকা অন্য অনথিভুক্ত ব্যক্তিকেও গ্রেপ্তার করা হতে পারে। আইনজীবীরা সতর্ক করে জানিয়েছেন, একই গাড়িতে ভ্রমণ করা বা অভিযানের সময় ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকাও অনেক ক্ষেত্রে ঝুঁকির কারণ হতে পারে।
সাম্প্রতিক এক অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ২০২৫ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত নিউ ইয়র্ক মহানগরী, লং আইল্যান্ড ও নিউজার্সিতে নথিভুক্ত ৪৩০টি রাস্তার গ্রেপ্তারের ৯৩ শতাংশের লক্ষ্য ছিলেন লাতিনো জনগোষ্ঠীর মানুষ। কয়েকটি ঘটনায় ভুল পরিচয়ে গ্রেপ্তার, জাতিগত প্রোফাইলিং এবং অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের অভিযোগও উঠেছে।
গত ৩০ জুলাই আপার ম্যানহাটনের ইনউড এলাকায় আইসের একটি অভিযান ঘিরে নতুন বিতর্কের সৃষ্টি হয়। স্থানীয় বাসিন্দা লিন্ডা উলফ মোবাইল ফোনে অভিযান ধারণ করার সময় এক মুখোশধারী ফেডারেল এজেন্ট তার মুখে রাসায়নিক স্প্রে ব্যবহার করেন বলে অভিযোগ করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে ঘটনার কিছু অংশ দেখা গেলেও আইস এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেয়নি। উলফ জানিয়েছেন, তিনি নিরাপদ দূরত্বে দাঁড়িয়ে শুধু ভিডিও ধারণ করছিলেন এবং কোনো ধরনের শারীরিক বাধা দেননি। তিনি আইনি পদক্ষেপ নেওয়ারও ঘোষণা দিয়েছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের প্রথম সংশোধনী অনুযায়ী জনসমাগমের স্থানে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কার্যক্রম ভিডিও করা নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার। তবে অভিযানে শারীরিক বাধা সৃষ্টি করলে আইনগত জটিলতা তৈরি হতে পারে।
এদিকে লং আইল্যান্ডে আইসের অভিযানে নতুন কৌশল হিসেবে গাড়িভিত্তিক নজরদারির বিষয়টি সামনে এসেছে। বিভিন্ন অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ট্রাফিক স্টপ, পার্কিং লট, বাসা কিংবা কর্মস্থলের বাইরে থেকেও ব্যক্তিদের আটক করা হচ্ছে। লাইসেন্স প্লেট রিডারসহ বিভিন্ন প্রযুক্তি ব্যবহার করে সন্দেহভাজনদের অবস্থান শনাক্ত করার তথ্যও উঠে এসেছে।
অভিবাসী অধিকার সংগঠনগুলোর মতে, এই পরিস্থিতি শুধু অনথিভুক্ত অভিবাসীদের নয়, তাদের সঙ্গে থাকা বৈধ অভিবাসী ও মার্কিন নাগরিক পরিবারের সদস্যদের মধ্যেও ব্যাপক উদ্বেগ তৈরি করেছে। একসময় সম্ভাবনার প্রতীক হিসেবে পরিচিত নিউ ইয়র্কে এখন অনেক পরিবারের প্রতিদিনের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন— পরবর্তী অভিযান কোথায়, আর পরবর্তী গ্রেপ্তার কাকে?






