গবেষকদের নতুন প্রচারণা ‘ফেড আপ’
অতিপ্রক্রিয়াজাত খাদ্যে 'বিরক্ত' অধিকাংশ মার্কিনি
- আল্ট্রাপ্রসেসড খাবারে বাড়ছে হৃদরোগ, ডায়াবেটিস ও ডিমেনশিয়ার ঝুঁকি: গবেষণা

সংগৃহীত ছবি
বিশ্বজুড়ে স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণে আলোচিত আল্ট্রাপ্রসেসড খাদ্য (ইউপিএফ) নিয়ে আবারও বিতর্ক তীব্র হয়েছে। শুধু ‘মেক আমেরিকা হেলদি অ্যাগেইন’ (মাহা) সমর্থক মায়েরা কিংবা পুষ্টিবিজ্ঞানীরাই নন, এবার সাধারণ মার্কিন নাগরিকদের বড় অংশও খাদ্যশিল্প ও সরকারের নিষ্ক্রিয়তায় অসন্তোষ প্রকাশ করেছে।
নতুন এক জরিপে দেখা গেছে, রিপাবলিকান, ডেমোক্র্যাট ও স্বতন্ত্র ভোটারদের মধ্যে ৭৭ শতাংশই আল্ট্রাপ্রসেসড খাদ্যের সব প্যাকেটের গায়ে বাধ্যতামূলক বড় সতর্কবার্তা যুক্ত করার পক্ষে মত দিয়েছেন। একই সঙ্গে প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ শিশুদের টেলিভিশন অনুষ্ঠানে এসব খাদ্যের বিজ্ঞাপন নিষিদ্ধ করার দাবি জানিয়েছেন।
বুধবার আমেরিকান জার্নাল অব পাবলিক হেলথ-এ প্রকাশিত জরিপ অনুযায়ী, ৮৭ শতাংশ মার্কিনি চান, খাদ্যপণ্যে ব্যবহারের আগে পরীক্ষাগারে তৈরি সব রাসায়নিক উপাদানের সরকারি নিরাপত্তা পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করা হোক। গবেষণাটির জ্যেষ্ঠ লেখক এবং মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞানের অধ্যাপক অ্যাশলে গিয়ারহার্ট বলেন, পরিবারগুলো এখন জানতে চাইছে খাদ্য কীভাবে তৈরি, বাজারজাত ও নিয়ন্ত্রিত হয় এবং তারা কীভাবে পরিবর্তনের অংশ হতে পারে।
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর দিতে গিয়ারহার্ট ও একদল গবেষক নতুন জনসচেতনতামূলক প্রচারণা ‘ফেড আপ’ চালু করেছেন। এ উদ্যোগের ওয়েবসাইটে ভোক্তাদের জন্য গবেষণার সারসংক্ষেপ, ব্যাখ্যামূলক তথ্য, ভিডিও, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কনটেন্ট এবং ব্যবহারিক নির্দেশিকা থাকবে।
প্রচারণাটির মাধ্যমে মানুষকে স্থানীয় ও অঙ্গরাজ্য পর্যায়ের জনপ্রতিনিধিদের কাছে নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানানো এবং স্কুলগুলোতে আল্ট্রাপ্রসেসড খাদ্যের ব্যবহার কমানোর বিষয়ে স্কুল বোর্ডকে প্রভাবিত করার উপায়ও শেখানো হবে। এ ছাড়া বিষয়ভিত্তিক ১৭টি গবেষণা, সম্পাদকীয় ও পর্যালোচনা নিবন্ধও সেখানে প্রকাশ করা হবে।
উক্ত প্রচারণার বৈজ্ঞানিক সহযোগী এবং ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, সান ফ্রান্সিসকোর স্বাস্থ্যনীতি গবেষক লরা শমিড বলেছেন, ‘শিল্পখাত ও নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর সংশোধনমূলক পদক্ষেপ অনেক আগেই নেওয়া উচিত ছিল।’
তিনি বলেছেন, ‘আমি ২০০৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম দিকের চিনিযুক্ত কোমল পানীয় কর আরোপ উদ্যোগে কাজ শুরু করি। এখন ২০২৬ সালে এসেও আমরা এখনো এ বিষয়ে উল্লেখযোগ্য কোনো পদক্ষেপ নিতে পারিনি।’
শমিডের মতে, আল্ট্রাপ্রসেসড খাদ্যে ব্যবহৃত রাসায়নিক সংযোজকের ওপর পর্যাপ্ত নিয়ন্ত্রণ নেই। এসব খাদ্য কীভাবে তৈরি হয় সে সম্পর্কেও পর্যাপ্ত স্বচ্ছতা নেই। এমনকি ভোক্তাদের সতর্ক করার মতো বাধ্যতামূলক লেবেলিং ব্যবস্থাও গড়ে ওঠেনি।
তিনি আরও বলেছেন, ‘দক্ষিণ আমেরিকার বিভিন্ন দেশসহ বিশ্বের অনেক সরকার বহু বছর ধরে এ ধরনের নীতি সফলভাবে বাস্তবায়ন করছে, অথচ যুক্তরাষ্ট্র এখনো পিছিয়ে রয়েছে।’
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্য ও মানবসেবা মন্ত্রী রবার্ট এফ কেনেডি জুনিয়র আল্ট্রাপ্রসেসড খাদ্য কোম্পানিগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপের কথা বললেও বাস্তব পদক্ষেপ খুবই সীমিত বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। ‘মেক আমেরিকা হেলদি অ্যাগেইন’ (মাহা) কমিশন ২০২৫ সালের আগস্টের মধ্যে এ বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। তবে সেপ্টেম্বর মাসে প্রকাশিত চূড়ান্ত প্রতিবেদনে কেবল সরকার আল্ট্রাপ্রসেসড খাদ্যের সংজ্ঞা নির্ধারণের প্রচেষ্টা চালিয়ে যাবে বলে উল্লেখ করা হয়।
এ বিষয়টির সমালোচনা করে নর্থ ক্যারোলাইনা বিশ্ববিদ্যালয়ের জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ব্যারি পপকিন বলেছেন, ‘চূড়ান্ত মাহা প্রতিবেদনে অনেক প্রতিশ্রুতি থাকলেও বাস্তবায়নের শক্তিশালী কোনো ব্যবস্থা নেই।’
তার মতে, খাদ্য, কৃষি ও ওষুধশিল্পের প্রভাবের কারণে কার্যকর সংস্কার বাস্তবায়ন বাধাগ্রস্ত হয়েছে।
গিয়ারহার্টের মতে, পরিবর্তন আনা সহজ হবে না। কারণ খাদ্যশিল্পের লবিং কার্যক্রম অত্যন্ত শক্তিশালী। গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯৯ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত ২৩ বছরে আল্ট্রাপ্রসেসড খাদ্য কোম্পানিগুলো লবিংয়ে প্রায় ১ দশমিক ১৫ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছে। এ অঙ্ক জুয়া শিল্পের ৮১৭ মিলিয়ন, তামাক শিল্পের ৭৫৫ মিলিয়ন এবং অ্যালকোহল শিল্পের ৫৪১ মিলিয়ন ডলারের ব্যয়ের চেয়েও অনেক বেশি।
গবেষকদের মতে, আল্ট্রাপ্রসেসড খাদ্যের ক্ষতি নিয়ে কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়ার পরিণতি হতে পারে ভয়াবহ। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় আল্ট্রাপ্রসেসড খাবার থেকে মাত্র ১০ শতাংশ বেশি ক্যালোরি গ্রহণ করলেই হৃদরোগজনিত মৃত্যুঝুঁকি প্রায় ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে। এই পরিমাণ খাবার সাধারণত একটি অতিরিক্ত পরিবেশনের সমান।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আল্ট্রাপ্রসেসড খাবার বেশি খাওয়ার সঙ্গে স্থূলতার ঝুঁকি ৫৫ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পাওয়ার সম্পর্ক পাওয়া গেছে। একই সঙ্গে টাইপ-২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনাও প্রায় ৪০ শতাংশ বেড়ে যেতে পারে।
এছাড়া এসব খাবারের সঙ্গে আলঝেইমার রোগ এবং মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা হ্রাসের সম্পর্কও খুঁজে পেয়েছেন গবেষকরা। আমেরিকান জার্নাল অব পাবলিক হেলথ-এ প্রকাশিত আরেকটি গবেষণায় দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রে যেসব প্রাপ্তবয়স্ক সবচেয়ে বেশি আল্ট্রাপ্রসেসড খাবার খান, তাদের ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি প্রায় ৬০ শতাংশের বেশি।
গবেষণাটির জ্যেষ্ঠ লেখক এবং হার্ভার্ড টি এইচ চ্যান স্কুল অব পাবলিক হেলথের জনস্বাস্থ্য পুষ্টিবিদ্যার সহযোগী অধ্যাপক সিন্ডি লিউং বলেছেন, ‘যেসব মানুষ কম প্রক্রিয়াজাত বা প্রাকৃতিক খাবার বেশি গ্রহণ করেন, তাদের ক্ষেত্রে স্মৃতিশক্তি ও মানসিক সক্ষমতা হ্রাসের ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে কম।’
তিনি জানান, শস্য, ফলমূল ও শাকসবজির মতো ন্যূনতম প্রক্রিয়াজাত খাবার বেশি খাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে জ্ঞানীয় দুর্বলতা এবং ডিমেনশিয়ার ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কম দেখা গেছে।
তবে স্বাস্থ্যঝুঁকি সম্পর্কে সচেতনতা বাড়লেও আল্ট্রাপ্রসেসড খাবার এড়িয়ে চলা সহজ নয়। কারণ যুক্তরাষ্ট্রের মুদি দোকানগুলোর তাকজুড়ে থাকা প্রায় ৭০ শতাংশ খাদ্যপণ্যই উচ্চমাত্রায় প্রক্রিয়াজাত। ফলে সাধারণ ভোক্তাদের জন্য স্বাস্থ্যকর বিকল্প বেছে নেওয়া ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে।
ভাষান্তর-সালমান রয়িাজ




