১৪ মিনিটেই শেষ প্রথম ব্রিফিং, স্বামীকে ‘প্রেসিডেন্ট’ বলে বিপাকে ট্রাম্পের নতুন মুখপাত্র

ট্রাম্পের পিছনে দাঁড়িয়ে হোয়াইট হাউসের নতুন প্রেস সেক্রেটারি কেটি জাকারিয়া— রয়টার্স
হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি হিসেবে প্রথম সংবাদ সম্মেলনে মাত্র ১৪ মিনিটেই ব্রিফিং কক্ষ ছেড়ে বেরিয়ে যান কেটি জাকারিয়া। মঙ্গলবার সকালে আয়োজিত ওই সংবাদ সম্মেলনে নিয়োগকর্তা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে নিজের স্বামীকে গুলিয়ে ফেলেন তিনি। এ ছাড়া পুরো সময়ের বড় অংশজুড়ে ট্রাম্পের প্রশংসায় লিখিত বক্তব্য পড়ে শোনান নতুন এই মুখপাত্র।
গত শুক্রবার ক্যারোলিন লেভিটের উত্তরসূরি হিসেবে জাকারিয়ার নাম ঘোষণা করেন ট্রাম্প। দায়িত্ব নেওয়ার দ্বিতীয় দিনেই প্রথমবারের মতো সংবাদ সম্মেলনে আসেন তিনি। শুরুতেই ট্রাম্পের হয়ে কাজ করতে পেরে ‘ভীষণ সম্মানিত’ বোধ করছেন বলে জানান জাকারিয়া। দীর্ঘদিন ধরেই তার হয়ে কাজ করার ইচ্ছা ছিল বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
এরপর প্রায় ছয় মিনিট ধরে লিখিত বক্তব্য পড়ে শোনান জাকারিয়া। বক্তব্যজুড়ে ছিল ট্রাম্পের প্রশংসা এবং কয়েক মাস আগের কথিত সাফল্যের বর্ণনা। এর মধ্যে ভেনেজুয়েলার বিরুদ্ধে ‘ঐতিহাসিক এক দিনের যুদ্ধ’-এর কথাও বলেন তিনি। অথচ ইরানের বিরুদ্ধে ট্রাম্পের শুরু করা যুদ্ধ তখন নবম মাসে প্রবেশের পথে।
সাংবাদিকদের প্রশ্ন নেওয়ার সময় একটি নোটকার্ডে লেখা সংবাদমাধ্যমের তালিকা দেখে একে একে সাংবাদিকদের ডাকেন জাকারিয়া। প্রেস সেক্রেটারির পোডিয়ামের ওপর থাকা ক্যামেরায় ওই তালিকার ছবি ধরা পড়ে।
প্রথমে ডানপন্থী সংবাদমাধ্যম ব্রেইটবার্ট নিউজের এক সাংবাদিককে প্রশ্ন করার সুযোগ দেন তিনি। ওই সাংবাদিক হোয়াইট হাউসের কর্মীদের জন্য নির্ধারিত একটি আসনে বসেছিলেন। জাকারিয়ার পূর্বসূরি ওই আসনটি প্রশাসনের প্রতি সাধারণত বন্ধুভাবাপন্ন ‘নতুন ধারার সংবাদমাধ্যমগুলোর’ জন্য বরাদ্দ করেছিলেন।
এরপর ফক্স নিউজের প্রতিনিধি পিটার ডুসিকে প্রশ্ন করার সুযোগ দেন জাকারিয়া। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সঙ্গে ট্রাম্পের বিরোধের পর যুক্তরাষ্ট্র ইউক্রেনের সঙ্গে গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান বন্ধ করেছে কি না, জানতে চান তিনি।
প্রশ্নের উত্তর দিতে পারেননি জাকারিয়া। ডুসিকে বলেন, ‘এ বিষয়ে পরে আপনাকে জানাতে হবে।’
এরপর তালিকা অনুযায়ী ডেইলি মেইলের এক প্রতিনিধিকে প্রশ্ন করার সুযোগ দেন তিনি। গ্রিসে মার্কিন রাষ্ট্রদূত কিম্বারলি গিলফয়েলকে বরখাস্তের কথা ট্রাম্প এখনো বিবেচনা করছেন কি না, তা জানতে চান ওই সাংবাদিক। এথেন্সে দায়িত্ব পালনকালে ও তার আগে গিলফয়েলের কর্মকাণ্ড নিয়ে একের পর এক বিব্রতকর সংবাদ প্রকাশিত হওয়ার পর এ প্রশ্ন ওঠে।
এ প্রশ্নের উত্তরে নতুন তথ্য জানান জাকারিয়া। তিনি নিশ্চিত করেন, সাবেক ফক্স নিউজ উপস্থাপক ও ট্রাম্পের বড় ছেলের সাবেক বাগ্দত্তা গিলফয়েলকে পদত্যাগ করতে বলেছেন প্রেসিডেন্ট।
তবে ডেইলি মেইলের পরবর্তী একটি সহজ প্রশ্নের মুখেই বিপাকে পড়েন জাকারিয়া। প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে আমতা-আমতা করতে থাকেন তিনি। একপর্যায়ে সংবাদ সম্মেলন শেষ করে কক্ষ ছেড়ে বেরিয়ে যান।
প্রশ্নটি ছিল, চার সন্তানের মা হিসেবে সন্তানদের দেখাশোনার সঙ্গে কীভাবে হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারির কঠিন দায়িত্ব সামলাবেন তিনি? তার পূর্বসূরি লেভিট মাত্র দুই সন্তানের দেখাশোনা ও চাকরির চাপ সামলানোর সমস্যার কথা উল্লেখ করে পদত্যাগ করেছিলেন।
এরপরই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।
জাকারিয়া বলেন, ‘নিজের বাচ্চাদের সঙ্গে সন্ধ্যা কাটাতে না পারার বিষয়টি পুরোপুরি অগ্রহণযোগ্য।’ এরপর স্বামী ও নিয়োগকর্তাকে গুলিয়ে ফেলেন তিনি।
তিনি বলেন, ‘তাই আমার প্রেসিডেন্ট—দুঃখিত, আমার স্বামী এখন এখানে আছেন।’
কক্ষে উপস্থিত সাংবাদিকদের হাসির মধ্যে পরিস্থিতি সামাল দিতে আবারও ট্রাম্পের প্রশংসা শুরু করেন জাকারিয়া। ট্রাম্পকে তিনি ‘আমাদের দেখা সবচেয়ে পরিবারবান্ধব প্রেসিডেন্ট’ বলে অভিহিত করেন।
তিনি বলেন, ‘তিনি পরিবার আছে, এমন আরও বেশি নারীকে নিয়োগ দিয়েছেন। আমার চারটি সন্তান আছে এবং এই চাকরির চাপ কেমন হবে, তা জানার পরও তিনি আমার ওপর আস্থা রেখেছেন। এতে বোঝা যায়, আমি দায়িত্বটি সামলাতে সক্ষম।’
এরপরই ব্রিফিং শেষ ঘোষণা করেন জাকারিয়া। তিনি বলেন, ট্রাম্প ‘ঐতিহাসিক আলাস্কা সফরের জন্য মেরিন ওয়ানে উঠতে যাচ্ছেন, সেখানে আমরা তাকে সব প্রশ্ন করতে পারব।’
তবে প্রেসিডেন্টের কয়েক ঘণ্টা পর আলাস্কার উদ্দেশে রওনা হওয়ার কথা ছিল।
জাকারিয়ার সংক্ষিপ্ত এই সংবাদ সম্মেলন সাংবাদিকদের বিস্মিত করেছে। ট্রাম্পের কট্টর সমর্থকদের মধ্যেও তার পারফরম্যান্স নিয়ে অসন্তোষ দেখা গেছে।
ট্রাম্প প্রশাসনের সাবেক এক কর্মকর্তা, দ্য ইন্ডিপেনডেন্টকে খুদে বার্তায় জাকারিয়ার প্রথম সংবাদ সম্মেলনকে ‘পুরোপুরি বিপর্যয়’ বলে বর্ণনা করেন। এর আগে তাকে ‘হাস্যকর নিয়োগ’ বলে অভিহিত করে ওই কর্মকর্তা বলেছিলেন, ছয় মাসের মধ্যে তার চাকরি চলে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
আলাদাভাবে, বর্তমান প্রশাসনের এক কর্মকর্তা এমএস নাউকে বলেন, জাকারিয়া ‘শুরুতেই ভুল পথে পা দিয়েছেন’ এবং চাকরি টিকিয়ে রাখতে হলে তাকে ‘দ্রুত, অনেক উন্নতি করতে হবে’। তা না হলে ট্রাম্পের সাবেক যোগাযোগ পরিচালকদের একজন, হেজ ফান্ড ব্যবস্থাপক অ্যান্থনি স্কারামুচির ১১ দিনের চাকরির রেকর্ডের চেয়েও দ্রুত তার বিদায় ঘটতে পারে।
তবে অন্তত প্রকাশ্যে নতুন প্রেস সেক্রেটারের পাশে দাঁড়িয়েছে হোয়াইট হাউস। হোয়াইট হাউসের যোগাযোগবিষয়ক পরিচালক স্টিফেন চিউং এক্সে লিখেছেন, জাকারিয়ার প্রথম সংবাদ সম্মেলন ছিল ‘দারুণ সূচনা’।
চিউং আরও বলেন, ‘তিনি কক্ষের নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে রেখেছিলেন এবং প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও তার প্রশাসন এখন পর্যন্ত যে অসাধারণ কাজ করেছে, তা কার্যকরভাবে মার্কিন জনগণকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন।’
সূত্র: দ্য ইনডিপেনডেন্ট





