মার্কিন সেনাদের ফোনের ভিডিও দেখে ঘাঁটিতে হামলা করছে ইরান
- সেনাসদস্যদের থেকে মোবাইল ফোন জমা নেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করছে পেন্টাগন
- আগামী দিনের যুদ্ধে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি কি শুধু শত্রুর অস্ত্র, নাকি নিজের হাতের স্মার্টফোনও?

এআই নির্মিত ছবি
যুদ্ধক্ষেত্রে এখন শুধু বন্দুক, ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোন নয়–একটি স্মার্টফোনও হয়ে উঠতে পারে নিরাপত্তার বড় ঝুঁকি। মার্কিন সেনাদের মোবাইলে ধারণ করা ভিডিও, ছবি এবং অনলাইনে দেওয়া পোস্ট ব্যবহার করে ইরান তাদের সামরিক ঘাঁটি সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংগ্রহ করছে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে যুক্তরাষ্ট্র।
এই পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন কিছু মার্কিন সেনার কাছ থেকে মোবাইল ফোন জমা নেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে। মার্কিন সামরিক কর্তাদের মতে, ব্যক্তিগত মোবাইল ডিভাইস থেকে প্রকাশিত তথ্য শত্রুপক্ষকে হামলার লক্ষ্য নির্ধারণে সাহায্য করতে পারে।
শত্রুর হাতে পৌঁছে যাচ্ছে যুদ্ধক্ষেত্রের ছবি
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) প্রধান অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপার সেনাদের উদ্দেশে এক সতর্কবার্তায় জানিয়েছেন, মোবাইল ফোনে ধারণ করা ভিডিও ও ছবি থেকে ইরান মার্কিন সামরিক অবস্থান সম্পর্কে ধারণা নিতে পারছে।
কুপারের বক্তব্য অনুযায়ী, সাংবাদিকদের পোস্ট এবং সেনাদের নিজেদের মোবাইল থেকে প্রকাশিত ছবি ও ভিডিও বিশ্লেষণ করে ইরান হামলার ফলাফল সম্পর্কে দ্রুত তথ্য পেয়ে যাচ্ছে।
তার সতর্কবার্তায় বলা হয়েছে, এই ধরনের ‘ওপেন সোর্স ইন্টেলিজেন্স’ বা প্রকাশ্য তথ্য সংগ্রহ পদ্ধতি শত্রুপক্ষকে হামলার কার্যকারিতা বুঝতে সাহায্য করে এবং পরবর্তী আক্রমণ আরও নিখুঁত করার সুযোগ দিতে পারে।
একটি ভিডিও কীভাবে বিপদ ডেকে আনতে পারে?
সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতে, সাধারণ একটি ভিডিও থেকেও অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বের করা সম্ভব। যেমন– ভিডিওর পেছনের স্থাপনা দেখে ঘাঁটির অবস্থান শনাক্ত করা যায়; আলো, শব্দ বা পরিবেশ দেখে সময় ও পরিস্থিতি বোঝা যায়, ইউনিফর্ম, যানবাহন বা সামরিক সরঞ্জাম দেখে সেনাদের অবস্থান সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট থেকে সেনাদের গতিবিধি সম্পর্কে তথ্য মিলতে পারে৷ আধুনিক যুদ্ধে এই ধরনের তথ্যকে ‘ডিজিটাল গোয়েন্দা তথ্য’ হিসেবে ব্যবহার করা হয়।
মারাত্মক হামলার পর উদ্বেগ বেড়েছে
মার্কিন কর্তাদের উদ্বেগ আরও বেড়েছে সাম্প্রতিক কয়েকটি হামলার পর। তাদের মতে, ইরান বা ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলি মার্কিন ঘাঁটির ওপর হামলার আগে ও পরে অনলাইন তথ্য বিশ্লেষণ করছে।
একটি ঘটনায় হামলার পর প্রকাশিত ভিডিও ফুটেজ থেকে আক্রমণের প্রভাব সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছিল বলে মার্কিন কর্মকর্তারা মনে করছেন।
মার্কিন সামরিক বাহিনীর আশঙ্কা, সেনাদের ব্যক্তিগত ফোনের তথ্য শত্রুপক্ষের হাতে গেলে শুধু ঘাঁটির অবস্থান নয়, সেনাদের দৈনন্দিন কার্যক্রম সম্পর্কেও ধারণা পাওয়া সম্ভব।
ফোন জমা নেওয়ার সিদ্ধান্ত কতটা কঠিন?
তবে সেনাদের মোবাইল ফোন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা সহজ সিদ্ধান্ত নয়।
মধ্যপ্রাচ্যে দায়িত্ব পালনরত হাজার হাজার মার্কিন সেনা পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য ব্যক্তিগত ফোন ব্যবহার করেন। যুদ্ধ পরিস্থিতিতেও পরিবারকে নিজেদের নিরাপত্তার খবর জানানোর অন্যতম মাধ্যম এই ফোন।
ফলে সামরিক নিরাপত্তা এবং ব্যক্তিগত যোগাযোগের প্রয়োজন–দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখাই এখন মার্কিন বাহিনীর সামনে বড় চ্যালেঞ্জ।
শুধু ভিডিও নয়, মোবাইল ট্র্যাকিং নিয়েও উদ্বেগ
এর আগে মার্কিন কর্মকর্তারা সতর্ক করেছিলেন, স্মার্টফোনের অবস্থান শনাক্তকারী প্রযুক্তি, মোবাইল নেটওয়ার্ক এবং বিভিন্ন অ্যাপের তথ্যও শত্রুপক্ষের হাতে গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ফোন শুধু যোগাযোগের যন্ত্র নয়–এটি ব্যবহারকারীর অবস্থান, চলাফেরা এবং আচরণ সম্পর্কেও বিপুল তথ্য বহন করে।
যুদ্ধের নতুন ময়দান: তথ্য
বিশ্লেষকদের মতে, আধুনিক যুদ্ধ এখন আর শুধু অস্ত্রের লড়াই নয়। তথ্যও একটি বড় অস্ত্র।
একটি ছোট ভিডিও, একটি ছবি বা একটি অনলাইন পোস্ট কখনও কখনও ক্ষেপণাস্ত্রের মতোই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। সেই কারণেই মার্কিন বাহিনী এখন সেনাদের স্মার্টফোন ব্যবহারের ওপর আরও কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপের কথা ভাবছে।
মধ্যপ্রাচ্যের উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠছে–আগামী দিনের যুদ্ধে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি কি শুধু শত্রুর অস্ত্র, নাকি নিজের হাতের স্মার্টফোনও?




