২০২৯ সালের আগেই যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে আসবে গ্রিনল্যান্ড, দাবি ট্রাম্পের

ছবি: রয়টার্স
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আবারও গ্রিনল্যান্ডের ভূরাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে বিতর্ক উসকে দিয়েছেন। তিনি দাবি করেছেন, তার প্রেসিডেন্টের মেয়াদ ২০২৯ সালে শেষ হওয়ার আগেই গ্রিনল্যান্ড যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে।
‘রিয়েল আমেরিকাস ভয়েস’-এর উপস্থাপক স্টিভ গ্রুবারকে শুক্রবার দেওয়া এক টেলিফোন সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প এ মন্তব্য করেন। এর আগেও এ ধরনের বক্তব্য গ্রিনল্যান্ডের প্রতিনিধি, ডেনমার্কের কর্মকর্তাদের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের প্রভাবশালী সদস্যদের তীব্র প্রতিক্রিয়ার মুখে পড়েছে।
গ্রুবার বললেন, ‘আমি এই অনুষ্ঠানেই বলেছিলাম, আপনি দায়িত্ব ছাড়ার আগেই গ্রিনল্যান্ড আমাদের কার্যকর নিয়ন্ত্রণে থাকবে। পশ্চিম গোলার্ধের প্রতিরক্ষার জন্য এটি এখনো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’
জবাবে ট্রাম্প বললেন, ‘তারা খুবই গুরুত্বপূর্ণ কিছু করতে চায়। গ্রিনল্যান্ড আমাদের দৃষ্টিকোণ থেকে গুরুত্বপূর্ণ, তাদের দৃষ্টিকোণ থেকে নয়। আপনি চাইলে এ নিয়ে বাজি ধরতে পারেন।’
ট্রাম্প প্রশাসন জাতীয় নিরাপত্তার যুক্তিতে গ্রিনল্যান্ডকে যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে আনার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। তাদের দাবি, আর্কটিক অঞ্চলে রাশিয়া ও চীনের কৌশলগত প্রতিযোগিতা বেড়ে যাওয়ায় এ পদক্ষেপ প্রয়োজন। বিশ্বের সবচেয়ে বড় দ্বীপ গ্রিনল্যান্ড উত্তর আমেরিকা ও ইউরোপের মধ্যবর্তী একটি গুরুত্বপূর্ণ ভৌগোলিক অবস্থানে রয়েছে।
দ্বীপটিতে যুক্তরাষ্ট্রের পিটুফিক মহাকাশ ঘাঁটির মাধ্যমে এরই মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক উপস্থিতি রয়েছে। এ ঘাঁটি ক্ষেপণাস্ত্র হামলার আগাম সতর্কতা ও মহাকাশ নজরদারির মতো গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম পরিচালনা করে। এ ছাড়া আধুনিক প্রযুক্তি ও প্রতিরক্ষা শিল্পে প্রয়োজনীয় বিরল খনিজ এবং গুরুত্বপূর্ণ খনিজসম্পদের বিশাল মজুদও রয়েছে গ্রিনল্যান্ডে।
গ্রিনল্যান্ড ও ডেনমার্কের প্রত্যাখ্যান
গ্রিনল্যান্ডের নেতা এবং সাধারণ মানুষ ট্রাম্প প্রশাসনের দাবি স্পষ্টভাবে প্রত্যাখ্যান করেছেন। তারা আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী দ্বীপটির আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের ওপর জোর দিয়েছেন।
গ্রিনল্যান্ডের বাসিন্দা ও দ্বীপটির সার্বভৌমত্ব নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বলা অরলা জোয়েলসেন শনিবার এক্সে লিখেছেন, ‘এটা কখনোই হবে না। এটাই শেষ কথা। #স্ট্যান্ডউইথগ্রিনল্যান্ড।’
গ্রিনল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ইয়েন্স-ফ্রেডেরিক নিলসেনও দীর্ঘদিন ধরে ট্রাম্পের বক্তব্যের সমালোচনা করে আসছেন। জানুয়ারিতে তিনি লিখেছিলেন, ‘গ্রিনল্যান্ড বিক্রির জন্য নয়।’
তিনি আরও বলেছেন, ‘গ্রিনল্যান্ড যুক্তরাষ্ট্রের মালিকানায় যেতে চায় না। যুক্তরাষ্ট্র থেকে শাসিত হতে চায় না। যুক্তরাষ্ট্রের অংশও হতে চায় না।’
সম্প্রতি সাংবাদিক কেটি কুরিককে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে অ্যারিজোনার সিনেটর মার্ক কেলি বলেছেন, ট্রাম্পের গ্রিনল্যান্ড-সংক্রান্ত অবস্থানের সময় তার সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী নিলসেন এবং ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেদেরিকসেনের কথা হয়েছিল। তার ভাষায়, দুই নেতা ‘স্পষ্টতই ক্ষুব্ধ’ ছিলেন এবং জানতে চেয়েছিলেন, ট্রাম্প সত্যিই কি গ্রিনল্যান্ডে সামরিক অভিযান চালানোর কথা ভাবছেন।
কেলি বললেন, ‘গ্রিনল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী আমাকে বলেছেন, এখন গ্রিনল্যান্ডের শিশুরা আমেরিকানদের ভয় পায়।’
এক্সে দেওয়া এক পোস্টে রবিবার অরলা জোয়েলসেনও একই বক্তব্যের সমর্থন জানিয়ে লিখেছেন, “সিনেটর কেলি বলেছেন, ‘গ্রিনল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী আমাকে বলেছেন, এখন গ্রিনল্যান্ডের শিশুরা আমেরিকানদের ভয় পায়।’ আমি নিশ্চিত করছি, এটি সত্য। সত্য কথা বলার জন্য ধন্যবাদ, সিনেটর।”
ডেনমার্কের নেতৃত্বও একইভাবে কঠোর অবস্থান বজায় রেখেছে। চলতি বছরের শুরুতে প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেদেরিকসেন সরাসরি এ প্রস্তাবের জবাব দিয়ে বললেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র গ্রিনল্যান্ডের মালিক হতে এবং সেটি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিতে চায়— এটি সবারই জানা। তবে এটাও সমানভাবে সবার জানা থাকা উচিত যে, তা কখনোই ঘটবে না।’
ডেনমার্ক রাজ্যের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল হিসেবে গ্রিনল্যান্ডের ভবিষ্যৎ শুধু দ্বীপটির জনগণই নির্ধারণ করবে বলে কোপেনহেগেন ও নুক— দুই সরকারই বারবার জানিয়েছে। তারা গ্রিনল্যান্ড কেনা বা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একীভূত করার সব ধারণা প্রত্যাখ্যান করেছে।
কংগ্রেসের রিপাবলিকানদেরও আপত্তি
গ্রিনল্যান্ড নিয়ে ট্রাম্পের অবস্থান রিপাবলিকান দলের ভেতর থেকেও অস্বাভাবিক মাত্রার সমালোচনার মুখে পড়েছে। কয়েকজন রিপাবলিকান আইনপ্রণেতার মতে, এ ধরনের বক্তব্য ন্যাটো মিত্রদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
নেব্রাস্কার প্রতিনিধি ডন বেকন এ বিষয়ে সবচেয়ে সরব রিপাবলিকান সমালোচক। জুলাইয়ে ন্যাটো সম্মেলনে ট্রাম্প আবারও গ্রিনল্যান্ডের দাবি তোলার পর তিনি বলেছেন, এতে ইউরোপে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান দুর্বল হয়েছে।
তিনি লিখেছেন, ‘গ্রিনল্যান্ড নিয়ে প্রেসিডেন্টের নির্বোধ মন্তব্য ইউরোপে আমাদের ব্যাপক ক্ষতি করেছে। গ্রিনল্যান্ড ও ডেনমার্ক ন্যাটোর মিত্র। আফগানিস্তানে ডেনমার্ক আমাদের পাশে লড়েছে। ট্রাম্পের হুমকি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি ইউরোপের যে আস্থা ছিল, তা মারাত্মকভাবে দুর্বল করেছে। এই বোকামি বন্ধ করুন।’
জানুয়ারিতে বেকন আরও বলেছিলেন, গ্রিনল্যান্ডে সামরিক অভিযান চালানোর চেষ্টা হবে ‘চরম হাস্যকর কাজ’। এমন কিছু হলে তিনি ট্রাম্পকে অভিশংসনের পক্ষে ঝুঁকবেন বলেও ইঙ্গিত দেন। পরে তিনি ট্রাম্পের গ্রিনল্যান্ড-সংক্রান্ত অবস্থানকে ‘নৈতিকতাবিরোধী’ এবং পুরো বিষয়টিকে ‘অত্যন্ত লজ্জাজনক’ বলে মন্তব্য করেন।
এক পর্যায়ে তিনি সতর্ক করেন, জোর করে গ্রিনল্যান্ডকে যুক্তরাষ্ট্রের অংশ করার চেষ্টা ‘তার প্রেসিডেন্সির সমাপ্তি ডেকে আনবে’। বিষয়টি আরও এগোলে রিপাবলিকানদের হোয়াইট হাউসের বিরুদ্ধেও দাঁড়াতে হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
নর্থ ক্যারোলাইনার সিনেটর থম টিলিসও প্রকাশ্যে ট্রাম্পের গ্রিনল্যান্ড নীতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
চলতি বছরের শুরুতে তিনি বলেছিলেন, কোনো সার্বভৌম রাষ্ট্রের ভূখণ্ড দখলের চেষ্টা হলে কংগ্রেসে তার প্রবল বিরোধিতা হবে। গ্রিনল্যান্ডকে ‘অবৈধভাবে দখলের’ মতো কোনো উদ্যোগ এলে আইনপ্রণেতারা একজোট হয়ে তার বিরোধিতা করবেন বলেও মন্তব্য করেন তিনি। পাশাপাশি এমন ধারণাকে বাস্তবসম্মত বলে যারা তুলে ধরছেন, তাদেরও সমালোচনা করেন।
টিলিস বলেছেন, ‘কোনো সার্বভৌম রাষ্ট্রের অংশ এমন ভূখণ্ড দখলের মতো পদক্ষেপ বাস্তবায়নের চেষ্টা হলে কংগ্রেসে এর বিরুদ্ধে যথেষ্ট শক্তিশালী বিরোধিতা হবে।’
এর আগেও তিনি বলেছিলেন, বলপ্রয়োগ করে গ্রিনল্যান্ড অধিগ্রহণের যেকোনো প্রচেষ্টার বিরোধিতা করবেন আইনপ্রণেতারা।
আরও কয়েকজন রিপাবলিকানও একই ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। সিনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা জন থুন বলেছেন, সামরিক পদক্ষেপ কোনো বিকল্প নয়। আলাস্কার সিনেটর লিসা মুরকাউস্কি বলেছেন, কংগ্রেসের উচিত গ্রিনল্যান্ডের সার্বভৌমত্বের প্রতি সমর্থন জানানো। কেনটাকির সিনেটর মিচ ম্যাককনেলও প্রশ্ন তুলেছেন, ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের সঙ্গে বিদ্যমান চুক্তির মাধ্যমে যে সুবিধা পাওয়া যাচ্ছে, তার বাইরে যুক্তরাষ্ট্রের গ্রিনল্যান্ড থেকে আর কী প্রয়োজন।
বিদ্যমান চুক্তি ও বাস্তবতা
প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞরা স্বীকার করেন, রাশিয়ার সামরিক তৎপরতা এবং আর্কটিকে চীনের ক্রমবর্ধমান আগ্রহের কারণে অঞ্চলটির কৌশলগত গুরুত্ব বেড়েছে। তবে সমালোচকদের মতে, ডেনমার্কের সঙ্গে বিদ্যমান প্রতিরক্ষা চুক্তিগুলোই যুক্তরাষ্ট্রকে প্রয়োজনীয় সামরিক ও কৌশলগত সুবিধা নিশ্চিত করছে। তাই গ্রিনল্যান্ডের ভূখণ্ড অধিগ্রহণের প্রয়োজন নেই।
দেশের ভেতরে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক বিরোধিতা সত্ত্বেও ট্রাম্প প্রশাসন এ বিষয়ে তাদের অবস্থান থেকে সরে আসার কোনো ইঙ্গিত দেয়নি।




