ইউক্রেনের হামলায় পঙ্গু হওয়ার পথে ‘রাশিয়ার গুগল’, বিপাকে ব্যবহারকারীরা

ছবি: রয়টার্স
‘কিছু না কিছু সব সময় নষ্ট হচ্ছে, কিছু না কিছু সব সময় কাজ করছে না।’ সেন্ট পিটার্সবার্গের বাসিন্দা ৩১ বছর বয়সী আন্তন এভাবেই নিজের অভিজ্ঞতা বর্ননা করছিলেন। এক রাতে বাড়ি ফিরে তিনি দেখলেন, চারপাশ অন্ধকার। জ্বলছে না তার স্মার্ট বাল্বগুলো।
বাল্বগুলো ‘রাশিয়ার গুগল’ খ্যাত প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ইয়ানডেক্সের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা হতো। প্রতিষ্ঠানটি ইন্টারনেটভিত্তিক সেবা ও ডিজিটাল পণ্য সরবরাহ করে। এর মধ্যে রয়েছে ক্লাউড সেবা, সার্চ ইঞ্জিন, মানচিত্র, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), রাইড শেয়ারিং ও খাবার সরবরাহ। অর্থাৎ গুগল, উবার ও অ্যামাজনের সেবাগুলোর সমন্বয়ে গড়ে ওঠা একটি ব্যবস্থার মতোই কাজ করে ইয়ানডেক্স।
আন্তন বলছিলেন, ‘অন্ধকার ঘরে বসে আছেন, অথচ বাতি জ্বালানোর কোনো উপায় নেই, এমন অনুভূতি অদ্ভুত। মনে হচ্ছিল বিদ্যুৎ চলে গেছে, তবে কারণটা ছিল বেশ অস্বাভাবিক।’
৮ অক্টোবর থেকে ইউক্রেনের হামলায় ইয়ানডেক্সের পাঁচটি প্রধান ডেটা সেন্টারের মধ্যে তিনটিই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে ব্যহত হচ্ছে লাখ লাখ ব্যবহারকারীর দৈনন্দিন জীবন। রাশিয়া এবং প্রতিবেশী কাজাখস্তান ও বেলারুশের মতো দেশগুলোয় অনলাইন লেনদেন, ব্যবসায়িক কার্যক্রম, সার্চ, নেভিগেশন, রাইড শেয়ারিং ও খাবার সরবরাহসহ বিভিন্ন সেবা বিঘ্নিত হচ্ছে।
ইউক্রেনের এ হামলা রাশিয়ার নিজস্ব ডিজিটাল অর্থনীতির দুর্বলতাগুলো সামনে এনেছে। পশ্চিমা প্রযুক্তির ওপর নির্ভরতা কমাতে নিজস্ব প্রযুক্তি খাতকে উৎসাহ দিয়ে আসছে মস্কো। ইউক্রেনের সঙ্গে যুদ্ধ শুরু পর পশ্চিমা কঠোর নিষেধাজ্ঞা এবং বিভিন্ন কোম্পানির রাশিয়া ছেড়ে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়। তবে রাশিয়ায় ডেটা সেন্টারগুলো এখন এই ডিজিটাল ব্যবস্থার অন্যতম দুর্বল জায়গা হয়ে উঠেছে।
কিয়েভ বলেছে, সেপ্টেম্বরে ইউক্রেনের ডেটা সেন্টারগুলোয় রাশিয়ার হামলার প্রতিশোধ হিসেবে এসব হামলা চালানো হয়েছে। রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ওই হামলাগুলোকে ব্যঙ্গ করে ‘ডিজিটাল ডিটক্স’ বলে অভিহিত করেছিল।
গত এক বছরে ক্রেমলিনও ‘নিরাপত্তার’ কারণ দেখিয়ে নিজ দেশে ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার প্রবণতা বাড়িয়েছে। একই সঙ্গে ভিপিএনের ব্যবহার সীমিত করেছে এবং টেলিগ্রাম ও হোয়াটসঅ্যাপের মতো জনপ্রিয় মেসেজিং অ্যাপ বন্ধ করে দিয়েছে।
আন্তন সিএনএনকে বলছিলেন, ‘প্রতিবার এমন কিছুর মুখোমুখি হলে ভীষণ বিরক্ত লাগে। আমার ক্ষেত্রে প্রতিবারই মনে হয়, (প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির) পুতিনের ওপর আমি কতটা বিরক্ত এবং কতটা ক্লান্ত।’
তিনি আরও বলেন, তার মনে হয়— এসব হামলা হলে আশপাশের মানুষ ইউক্রেনকে দায়ী করেন না। বরং তারা ভাবেন, ‘এসব কিছু শেষ পর্যন্ত কবে শেষ হবে?’
‘সবার মধ্যে একধরনের ক্লান্তি আছে। যুদ্ধ নিয়ে সামগ্রিক ক্লান্তি। প্রতিবারই আবার মনে হয়, ধুর, সবকিছু কতটা ক্লান্তিকর! এমন একটি পরিস্থিতিতে আমাদের বসবাস করতে হচ্ছে, এটা সত্যিই বোকামি’, বলছিলেন তিনি।
রাশিয়ার সাধারণ মানুষ যুদ্ধের সম্মুখসারির প্রাণঘাতী ভয়াবহতা থেকে অনেকটাই দূরে রয়েছেন। তবে ইউক্রেন রাশিয়ার ভূখণ্ডের গভীরে ড্রোন হামলা চালিয়ে যুদ্ধের পরিণতি সম্পর্কে রুশদের একটি বার্তা দিতে চেয়েছে। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি এসব হামলাকে ইউক্রেনে ক্রেমলিনের কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে ‘দূরপাল্লার নিষেধাজ্ঞা’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
এসব হামলার প্রভাবও পড়েছে রাশিয়ায়। পুতিন নিজেও প্রকাশ্যে দেওয়া বক্তব্যে তা স্বীকার করেছেন। তেল শোধনাগারে হামলার ফলে রাশিয়ায় ব্যাপক জ্বালানিসংকট দেখা দিয়েছে। অন্যদিকে রাশিয়ার বৃহত্তম অনলাইন খুচরা বিক্রেতা ওয়াইল্ডবেরিজ ও ওজোনের পরিচালিত গুদামগুলোয় হামলার কারণে তাদের ওপর নির্ভরশীল ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা বিপাকে পড়েছেন।
রাশিয়ার বৃহত্তম ব্যাংক সবারব্যাংকও বুধবার জানিয়েছে, সারাতভ অঞ্চলের বালাকোভোতে তাদের একটি ডেটা সেন্টারে হামলা হয়েছে। এদিকে ইউক্রেনের ড্রোন হামলা থেকে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো রক্ষার দায়িত্ব বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপরই ছেড়ে দিয়েছে ক্রেমলিন।
মস্কোর ৩৩ বছর বয়সী এক ট্যাক্সিচালক জানালেন, ১১ অক্টোবর ইয়ানডেক্সের একটি ডেটা সেন্টারে তৃতীয় দফা হামলার পর তিনি ও অন্য চালকরা ইয়ানডেক্স প্রো অ্যাপ চালাতে সমস্যার মুখে পড়েন। যাত্রীদের কাছ থেকে ভাড়া পাওয়ার অনুরোধ গ্রহণ ও পরিচালনার জন্য তারা এই অ্যাপ ব্যবহার করেন। নিজের জীবিকা নিয়ে উদ্বেগ থাকায় ওই চালক নাম প্রকাশ করতে চাননি।
তিনি বলছিলেন, ‘শুরুতে অ্যাপটি ঠিকমতো কাজ করছিল না। ঘণ্টার পর ঘণ্টা কোনো অর্ডার আসত না। আর যখন আসত, তখন প্রায়ই ভুল থাকত।’
তিনি জানিয়েছেন, সবচেয়ে গুরুতর সমস্যা ছিল, চালকরা তাদের উপার্জিত টাকা তুলতে পারছিলেন না। ফলে গাড়ি ভাড়া ও জ্বালানির খরচ মেটানো কঠিন হয়ে পড়ে।
তিনি বলেন, ‘অনেক চালকের জন্য এটি শুধু প্রযুক্তিগত ত্রুটি নয়। এর সঙ্গে তাদের কাজ চালিয়ে যাওয়া এবং নিজেদের ভরণপোষণের বিষয়টি জড়িত।’
মস্কোর বাসিন্দা তাতিয়ানাও (ছদ্মনাম) জানালেন, মঙ্গলবার ঘুম থেকে উঠে তিনি দেখেন— ইয়ানডেক্স পে অ্যাকাউন্টে তার সঞ্চিত ১৫ লাখ রুবল (প্রায় ১৭ হাজার ৮৩০ মার্কিন ডলার) আর দেখা যাচ্ছে না। এটি রাশিয়ার অ্যাপল সেভিংসের সমতুল্য একটি সেবা। তাতিয়ানা গাড়ি কেনার জন্য ওই অর্থ জমাচ্ছিলেন।
তিনি বললেন, ‘আতঙ্ক আমাকে গ্রাস করেছিল। আমি হাউমাউ করে কেঁদেছিলাম। নিজেকে বোঝানোর চেষ্টা করছিলাম, হয়তো ওই টাকা আর কোনো দিন দেখতে পাব না।’ তবে তিনি আশা করছেন, শেষ পর্যন্ত সব ঠিক হয়ে যাবে।
ইয়ানডেক্স এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, গ্রাহকদের অর্থ নিরাপদ আছে। তিনটি ডেটা সেন্টারে হামলার পর অ্যাপটির সেবা পুনরুদ্ধারে তারা কাজ করছে।
যুক্তরাষ্ট্রের মতো গুরুত্বপূর্ণ মিত্রের কাছ থেকে রাশিয়ার জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা বন্ধ করা এবং বৈশ্বিক বাজারে রাশিয়ার ডিজেল সরবরাহ অব্যাহত রাখার চাপের মুখে রয়েছে ইউক্রেন। তবে কিয়েভের বার্তা স্পষ্ট: ক্রেমলিনের জীবন দুর্বিষহ করে তোলার মতো উপায় এখনো তাদের হাতে রয়েছে।
সূত্র: সিএনএন।



