মিয়ানমারের জান্তার সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করছে বার্নহ্যাম সরকার, অভিযোগ মানবাধিকারকর্মীদের

অ্যাান্ডি বার্নহ্যাম— রয়টার্স
মিয়ানমারের সামরিক শাসনাধীন সরকারের প্রতিনিধিদের আতিথ্য দেওয়ায় জান্তা সরকারের প্রতি অবস্থান নরম করার অভিযোগ উঠেছে যুক্তরাজ্য সরকারের বিরুদ্ধে।
মিয়ানমারের মানবাধিকারকর্মীরা বলেছেন, লন্ডনে সরকারি বৈঠকে জান্তা সরকারের এক প্রতিনিধিকে আতিথ্য দিয়েছেন দুই মন্ত্রী। এর মধ্য দিয়ে অ্যান্ডি বার্নহ্যামের সরকার মিয়ানমার নীতিতে ‘উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন’ এনেছে।
লন্ডনভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা বার্মা ক্যাম্পেইন ইউকে বলেছে, ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর বিশ্বমঞ্চে বৈধতা অর্জনের চেষ্টা চালানো নিষেধাজ্ঞার আওতাধীন সামরিক শাসনের সঙ্গে যুক্তরাজ্য ‘নীরবে’ সম্পর্ক স্বাভাবিক করছে।
সংস্থাটির দাবি, বৈঠকগুলোর তথ্য সংশ্লিষ্ট ব্রিটিশ সরকারি দপ্তরগুলোর পরিবর্তে প্রকাশ করেছে মিয়ানমারের জান্তা সরকার।
২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর প্রায় পাঁচ বছর ধরে আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতা ও নিষেধাজ্ঞার মুখে থাকা মিয়ানমারের জেনারেল থেকে প্রেসিডেন্ট হওয়া মিন অং হ্লাইং এখন বিশ্বনেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়িয়ে কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করেছেন।
মিন অং হ্লাইংয়ের নেতৃত্বেই অং সান সু চির নির্বাচিত সরকারের কাছ থেকে ক্ষমতা দখল করে সামরিক বাহিনী। এর ফলে দেশটিতে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর হিসাবে, এই যুদ্ধে হাজারো মানুষ নিহত হয়েছেন।
গত ১৪ অক্টোবর লন্ডনে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীনিয়ন্ত্রিত দূতাবাসের চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স উইন জেয়ার তুনকে আতিথ্য দেয় যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্র দপ্তর। ইন্দো-প্যাসিফিকবিষয়ক দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী ব্যারোনেস উইন্টারটনের আতিথ্যে দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় দেশগুলোর জোট আসিয়ানের কূটনীতিকদের নিয়ে আয়োজিত বৈঠকে অংশ নেন তিনি।
পরে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীনিয়ন্ত্রিত পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দুই বৈঠকের ছবি প্রকাশ করে।
বার্মা ক্যাম্পেইন ইউকের অ্যাডভোকেসি কর্মকর্তা মিন টেন্ট বো বললেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বার্মার সামরিক বাহিনীর যোগাযোগ নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে আলোচনা হচ্ছে। কিন্তু একই সময়ে দেখা যাচ্ছে, ব্রিটিশ সরকার নীরবে বার্মার সামরিক শাসনের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করছে।’
তিনি আরও বলেছেন, ‘ব্রিটিশ সরকারের নীতিতে যে পরিবর্তন ঘটছে, তা স্পষ্ট। কিন্তু সামরিক বাহিনীর প্রতি নিজেদের অবস্থান কেন নরম করছে, তা প্রকাশ্যে ব্যাখ্যা করতে সরকার অনিচ্ছুক কিংবা অক্ষম বলে মনে হচ্ছে।’
সংস্থাটির মতে, আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতা কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করা জান্তা সরকারের নেতার হাতে এ ধরনের বৈঠক ‘আরেকটি প্রচারণার সুযোগ’ তুলে দিয়েছে।
এর আগে আসিয়ানের উদ্যোগে আয়োজিত বৈঠকে ব্রিটিশ কর্মকর্তারা মিয়ানমারের প্রতিনিধিদের সঙ্গে অংশ নিলেও সরকারি ভবনে মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠক এবং সেগুলোর ছবি প্রকাশের ঘটনা সরকারের আগের অবস্থান থেকে উল্লেখযোগ্য সরে আসার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
মিয়ানমারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ১৯ ও ২০ অক্টোবর প্রকাশিত বিবৃতিতে দুই বৈঠকের বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।
মন্ত্রণালয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, বৈঠকে উইন জেয়ার তুন যুক্তরাজ্যে পড়তে যেতে ইচ্ছুক মিয়ানমারের শিক্ষার্থীদের ওপর ভিসা-সংক্রান্ত বিধিনিষেধ পুনর্বিবেচনার আহ্বানও জানান।দ্বিতীয় বৈঠকে ক্ষুদ্র ব্যবসার ক্ষেত্রে সহযোগিতা, বিনিয়োগের সুযোগ এবং যুক্তরাজ্য ও আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে শিক্ষাবিষয়ক অংশীদারত্ব নিয়ে আলোচনা হয় বলে জানিয়েছে মন্ত্রণালয়।
মিন টেন্ট বো বললেন, ‘মিয়ানমারের সামরিক শাসনের একজন প্রতিনিধিকে সরকারি দপ্তরের বৈঠকে আমন্ত্রণ জানানো এবং তার সঙ্গে ছবি তোলা কোনো সমালোচনামূলক সম্পৃক্ততা নয়। এটি সামরিক শাসনকে স্বাভাবিক ও গ্রহণযোগ্য হিসেবে মেনে নেওয়া।’
তার ভাষ্য, ‘ব্রিটিশ সরকার বারবার বলছে, তারা বার্মার জনগণের পাশে আছে। কিন্তু নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপের জন্য আমাদের আহ্বান উপেক্ষা করছে। এর পরিবর্তে তারা আক্ষরিক অর্থেই বার্মার সামরিক বাহিনীর প্রতিনিধিদের পাশে দাঁড়াচ্ছে।’
২০২১ সালের অভ্যুত্থানের পরপরই মানবাধিকার লঙ্ঘনের জবাবে যুক্তরাজ্য সরকার একাধিক নিষেধাজ্ঞা জারি করে। এর মধ্যে সামরিক শাসনের তিন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির ওপর ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা এবং তাদের সম্পদ জব্দ করার পদক্ষেপও ছিল।
সামরিক শাসনের ‘গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনকে’ নিষেধাজ্ঞা আরোপের কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছিল ব্রিটিশ সরকার।
তবে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা বাড়তে থাকলেও প্রায় দুই বছর ধরে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে নতুন কোনো নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেনি যুক্তরাজ্য সরকার।
এমন পরিস্থিতিতে মিয়ানমারের মানবিক সংকটও ক্রমেই গভীর হচ্ছে। দেশটির বৈধ ও গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত অধিকাংশ নেতা কারাগারে রয়েছেন, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা সংকুচিত করা হয়েছে। জান্তা বাহিনী ও বিদ্রোহী গোষ্ঠী—উভয় পক্ষই নিয়মিত স্কুল, হাসপাতাল ও উপাসনালয়ে হামলা চালাচ্ছে।
জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, মিয়ানমারের মোট জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশ জরুরি মানবিক সহায়তার প্রয়োজনের মধ্যে রয়েছেন। অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা অন্তত ৪০ লাখ। তবে সংঘাতপূর্ণ এলাকায় জাতিসংঘের চেয়ে বেশি প্রবেশাধিকার থাকা স্থানীয় নাগরিক সমাজের সংগঠনগুলোর হিসাবে, এই সংখ্যা আরও অনেক বেশি—সম্ভবত ৫০ লাখ।
সূত্র: ইনডিপেনডেন্ট





