বিনা বেতনে দেশ গড়ার লড়াইয়ে দক্ষিণ সুদানের শিক্ষকরা

গুম্বো বেসিক স্কুলের প্রধান শিক্ষক পল সান্তিনো। ছবি: সংগৃহীত
প্রতিদিন ভোরে ঘুম থেকে ওঠেন। প্রায় চার মাইল পথ হেঁটে পৌঁছে যান স্কুলে। হাতে বই, চোখে ভবিষ্যতের স্বপ্ন। দিনের শেষে আবার সেই পথ হেঁটেই বাড়ি ফেরেন। কিন্তু বিনিময়ে কোনো বেতন নেই। এক মাস নয়, দুই মাস নয়, এক বছরেরও বেশি সময় ধরে কোনো পারিশ্রমিক পাননি দক্ষিণ সুদানের বহু শিক্ষক। তবু ক্লাস বন্ধ করেননি তারা। কারণ তাদের কাছে শিক্ষা শুধু চাকরি নয়, যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের ভবিষ্যৎ বাঁচানোর শেষ অস্ত্র। দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে দক্ষিণ সুদানের শিক্ষকদের বাস্তবতা।
দেশটির রাজধানী জুবা শহরের গুম্বো বেসিক স্কুলের প্রধান শিক্ষক পল সান্তিনো। ৬৭ বছর বয়সী এই শিক্ষক প্রতিদিন স্কুলে আসেন, ক্লাসরুম ঘুরে দেখেন, শিক্ষার্থীদের খোঁজ নেন, শিক্ষক-শিক্ষিকাদের কাজ তদারক করেন। বাইরে থেকে দেখলে তাকে আর দশজন প্রধান শিক্ষকের মতোই মনে হবে। কিন্তু তার জীবনের বাস্তবতা সম্পূর্ণ আলাদা। গত এক বছরেরও বেশি সময় ধরে তিনি কোনো সরকারি বেতন পাননি। শুধু সান্তিনো নন। গুম্বো স্কুলের কোনো শিক্ষক বা কর্মীই নিয়মিত বেতন পাচ্ছেন না। এমনকি দক্ষিণ সুদানের বহু সরকারি স্কুলের শিক্ষকরাও একই সংকটের মধ্যে রয়েছেন। ফলে দেশের শিক্ষাব্যবস্থা এখন দাঁড়িয়ে আছে শিক্ষকদের ব্যক্তিগত ত্যাগ ও দায়বদ্ধতার ওপর।
স্বাধীনতার স্বপ্ন থেকে সংকটের বাস্তবতা
দক্ষিণ সুদান বিশ্বের সবচেয়ে নতুন দেশগুলোর একটি। কয়েক দশকের রক্তক্ষয়ী স্বাধীনতা সংগ্রামের পর ২০১১ সালে সুদান থেকে আলাদা হয়ে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে দেশটি। সে সময় মানুষের আশা ছিল, নতুন দেশ নিজের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও উন্নয়নের ভিত শক্ত করবে। কিন্তু স্বাধীনতার পর রাজনৈতিক অস্থিরতা, দুর্নীতি, গৃহযুদ্ধ এবং অর্থনৈতিক সংকট সেই স্বপ্নকে বারবার ধাক্কা দিয়েছে।
প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ মানুষের এই দেশে জনসংখ্যার বড় অংশই শিশু ও তরুণ। কিন্তু শিক্ষা খাতে দীর্ঘদিনের অবহেলায় স্কুলব্যবস্থা এখন ভয়াবহ চাপে। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যাওয়ার বয়সী শিশুদের মাত্র প্রায় ৪০ শতাংশ স্কুলে ভর্তি হতে পেরেছে। যারা ভর্তি হচ্ছে, তাদেরও অনেকের নিয়মিত পড়াশোনার সুযোগ নেই।
‘আমি আমার কাজকে ভালোবাসি’
বিনা বেতনে কেন প্রতিদিন স্কুলে আসেন, এই প্রশ্নের উত্তরে পল সান্তিনোর উত্তর, ‘আমি আমার চাকরিকে খুব ভালোবাসি।’ সরকারি বেতন না থাকায় নিজের সংসার চালাতে খরচ কমিয়ে দিয়েছেন তিনি। স্ত্রী ও ছয় সন্তানের দায়িত্ব সামলাতে গিয়ে জীবনযাপন আরও কঠিন হয়েছে। তবু স্কুল ছাড়েননি। কারণ তার বিশ্বাস, শিক্ষাই পারে দক্ষিণ সুদানকে বদলে দিতে।
অনেক সময় শিক্ষার্থীদের পরিবারও সামান্য অর্থ দিয়ে স্কুল চালিয়ে রাখতে সাহায্য করে। সেই টাকাতেই কোনোরকম চলে স্কুলের দৈনন্দিন খরচ। গুম্বো স্কুলে প্রতিটি শ্রেণিতে গড়ে প্রায় ৮৭ শিক্ষার্থী পড়াশোনা করে। দুপুরে শিশুদের জন্য গরম খাবারের ব্যবস্থাও করা হয়। তবে সমস্যার শেষ নেই। স্কুলের মাঠের নলকূপ নষ্ট হয়ে রয়েছে। সেটি থেকে লবণাক্ত পানি পাওয়া যেত। কিন্তু মেরামতের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থও নেই স্কুল কর্তৃপক্ষের কাছে।







