ত্রাণকর্মী হত্যায় তদন্ত নয়, ইসরায়েলের সিদ্ধান্তে মিত্রদের ক্ষোভ

ইসরায়েলি সেনাবাহিনী ঘটনাটিকে একটি ‘গুরুতর ভুল’ বলে দাবি করছে।
গাড়ির ছাদে স্পষ্ট করে আঁকা ছিল ত্রাণসংস্থার প্রতীক। যাত্রাপথের তথ্যও জানানো হয়েছিল ইসরায়েলি সেনাবাহিনীকে। তার পরেও গাজার রাস্তায় একের পর এক ড্রোন হামলায় ছিন্নভিন্ন হয়ে যায় ত্রাণবাহী তিনটি গাড়ি। মারা যান সাত মানবিক সহায়তাকর্মী। দু’বছরের বেশি সময় পরে সেই ঘটনায় কারও বিরুদ্ধে ফৌজদারি তদন্ত না চালানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইসরায়েল। আর তাতেই এ বার একসঙ্গে ক্ষোভে ফেটে পড়ল ব্রিটেন, অস্ট্রেলিয়া ও কানাডা। শুক্রবার তিন দেশের যৌথ বিবৃতিতে ইসরায়েলের সিদ্ধান্তকে সরাসরি ‘লজ্জাজনক’ বলা হয়েছে।
ঘটনাটি ১ এপ্রিল ২০২৪-এর। মার্কিন ত্রাণসংস্থা ওয়ার্ল্ড সেন্ট্রাল কিচেনের (ডব্লিউসিকে) কর্মীরা গাজার সাধারণ মানুষের কাছে খাবার পৌঁছে দিয়ে ফিরছিলেন। সেই সময় তাদের গাড়িবহরে ইসরায়েলি ড্রোন হামলা হয়। নিহত হন সাত জন: তিন ব্রিটিশ নাগরিক জন চ্যাপম্যান, জেমস হেন্ডারসন ও জেমস কিরবি; অস্ট্রেলিয়ার লালজাওমি ‘জোমি’ ফ্র্যাঙ্ককম; পোল্যান্ডের ড্যামিয়ান সোবোল; দ্বৈত মার্কিন-কানাডীয় নাগরিক জ্যাকব ফ্লিকিঙ্গার এবং ফিলিস্তিনি কর্মী সাইফেদ্দিন ইসাম আয়াদ আবুতাহা। হামলাটি সে সময় বিশ্বজুড়ে তীব্র নিন্দার জন্ম দিয়েছিল।
ইসরায়েলি সেনাবাহিনী প্রথম থেকেই ঘটনাটিকে একটি ‘গুরুতর ভুল’ বলে স্বীকার করেছিল। পরে সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরীণ তদন্তে বলা হয়, গাড়িতে থাকা কয়েক জনকে ভুল করে সশস্ত্র হামাস সদস্য মনে করেছিলেন সংশ্লিষ্ট সেনা কর্মকর্তারা। তাদের দাবি, ত্রাণবহরটি আগে থেকে সমন্বয় করা পথ থেকেও সরে গিয়েছিল। তবে শেষ পর্যন্ত সেনাবাহিনীর আইনি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, কমান্ডারদের সিদ্ধান্তে এমন কোনও ‘যৌক্তিক সন্দেহ’ পাওয়া যায়নি, যার ভিত্তিতে ফৌজদারি অপরাধের তদন্ত শুরু করা যায়।
এই সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা হয় ১৯ আগস্ট বিশ্ব মানবিক সহায়তা দিবসে। সেই সময়টিকেও কড়া ভাষায় আক্রমণ করেছে ব্রিটেন, অস্ট্রেলিয়া ও কানাডা। যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়েছে, যে দিনে বিশ্বজুড়ে মানবিক কর্মীদের সাহস ও আত্মত্যাগকে সম্মান জানানো হয়, সে দিনই এমন সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা ‘বিশেষভাবে নিন্দনীয়’। তিন দেশের ভাষায়, সিদ্ধান্তটি “খুবই সামান্য এবং অনেক দেরিতে এসেছে।” নিহতদের পরিবার ন্যায়বিচার ও জবাবদিহির দাবিদার বলেও জানানো হয়েছে।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, গাজায় জবাবদিহি না হওয়ার অসংখ্য ঘটনার মধ্যে ডব্লিউসিকে হামলা মাত্র একটি। যুদ্ধবিরতির পরিস্থিতি নাজুক হলেও এখনও মানবিক সহায়তা পৌঁছে দিতে গিয়ে জীবন হাতে নিয়ে কাজ করছেন কর্মীরা। ২০২৫ সালেই গাজায় ১৮৬ জন মানবিক সহায়তাকর্মী নিহত হয়েছেন বলে উল্লেখ করেছে তিন দেশ। তাদের দাবি, আন্তর্জাতিক মানবিক আইন মেনে চলা এবং ত্রাণকর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ইসরায়েলের দায়িত্ব।
সবচেয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া এসেছে অস্ট্রেলিয়া থেকে। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী পেনি ওং ইসরায়েলের সিদ্ধান্তে ‘ক্ষুব্ধ’ বলে জানিয়েছেন। ক্যানবেরায় ইসরায়েলের রাষ্ট্রদূত হিলেল নিউম্যানকে তলবও করেছে অস্ট্রেলিয়া। ওংয়ের বক্তব্য, ইসরায়েল যে মাত্রায় জবাবদিহি দেখিয়েছে, তা অস্ট্রেলিয়ার প্রত্যাশার অনেক নীচে। “জোমি এবং তাঁর সহকর্মীদের ন্যায়বিচারের জন্য আমরা চাপ দেওয়া বন্ধ করব না,” বলেছেন তিনি।
জোমি ফ্র্যাঙ্ককমের পরিবারও ইসরায়েলি সিদ্ধান্তকে তীব্র ভাষায় প্রত্যাখ্যান করেছে। পরিবারের বক্তব্য, একটি “অভ্যন্তরীণ ও অস্বচ্ছ প্রক্রিয়া” শেষে কয়েক লাইনের বিবৃতিতে সেনাদের ফৌজদারি দায় থেকে অব্যাহতি দেওয়া তাঁদের প্রিয়জনের স্মৃতির প্রতি অপমান। তারা সব প্রমাণ প্রকাশ এবং স্বাধীন তদন্তের দাবি জানিয়েছে।
ব্রিটিশ পররাষ্ট্র দপ্তরও নিহত তিন ব্রিটিশ নাগরিকের পরিবারের প্রতি আচরণে নিজেদের ‘স্তম্ভিত ও ক্ষুব্ধ’ বলে জানিয়েছে। পোল্যান্ডও একই ঘটনায় ইসরায়েলি রাষ্ট্রদূতকে তলব করেছে। নিহত ড্যামিয়ান সোবোলের ঘটনায় পোল্যান্ডের নিজস্ব তদন্ত চলছে। ওয়ারশ জানিয়েছে, প্রয়োজনীয় নথি ও প্রমাণ দিতে ইসরায়েলকে পূর্ণ সহযোগিতা করতে হবে।
ইসরায়েলের পক্ষ থেকে রাষ্ট্রদূত নিউম্যান বলেছেন, ঘটনাটি ‘ভুল’ ছিল, কিন্তু সেনাদের উদ্দেশ্য ত্রাণকর্মীদের হত্যা করা ছিল না। তাই ফৌজদারি দায়ও পাওয়া যায়নি। হামলার পরপরই দুই সেনা কর্মকর্তাকে পদ থেকে সরানো হয়েছিল এবং আরও তিন জনকে তিরস্কার করা হয়েছিল।
কিন্তু ডব্লিউসিকে সেই যুক্তি মানতে নারাজ। সংস্থাটির বক্তব্য, তাদের গাড়ির গতিবিধি ইসরায়েলি সেনার সঙ্গে আগে থেকেই সমন্বয় করা ছিল এবং গাড়ির ছাদে বড় করে সংস্থার প্রতীকও ছিল, যা আকাশ থেকে দেখা সম্ভব। তাদের মতে, হামলার কোনও অজুহাত বা বৈধতা ছিল না। ইসরায়েলি বিবরণকে ‘অসম্পূর্ণ’ ও ‘বিভ্রান্তিকর’ বলেও স্বাধীন তদন্ত দাবি করেছে সংস্থাটি।
আর এখানেই উঠছে আরও বড় প্রশ্ন। একই সপ্তাহে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী পাঁচ বছরের ফিলিস্তিনি শিশু হিন্দ রজব ও তার পরিবারের মৃত্যু, এবং ২০২৫ সালে ১৫ ফিলিস্তিনি প্যারামেডিককে হত্যার ঘটনায় ফৌজদারি তদন্তের ঘোষণা দিয়েছে। অথচ ডব্লিউসিকে কর্মীদের মৃত্যুর ঘটনায় সেই পথেই হাঁটেনি তারা। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর অভিযোগ, গাজায় সেনাদের বিরুদ্ধে তদন্ত খুব কম ক্ষেত্রেই দোষী সাব্যস্ত হওয়া পর্যন্ত পৌঁছায়।
গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, গাজা যুদ্ধের শুরু থেকে ইসরায়েলি হামলায় ৭৩ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন৷ ইসরায়েল দাবি করে আসছে, তাদের লক্ষ্য নাকি হামাস যোদ্ধারা এবং বেসামরিক প্রাণহানির ঘটনায় প্রয়োজনমতো তদন্ত করা হয়। অন্য দিকে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো বারবার স্বাধীন তদন্ত ও জবাবদিহির দাবি তুলেছে।
দু’বছর আগে গাজার ধ্বংসস্তূপের মধ্যে খাবার পৌঁছে দিতে গিয়ে প্রাণ দিয়েছিলেন সাত জন। আজ প্রশ্ন আর শুধু সেই রাতের তিনটি ড্রোন হামলা নিয়ে নয়৷ প্রশ্ন, ভুল স্বীকার করাই কি যথেষ্ট, না কি সাতটি মৃত্যুর জন্য কাউকে আইনের সামনে দাঁড়াতেও হবে? ব্রিটেন, অস্ট্রেলিয়া ও কানাডার শুক্রবারের কড়া বার্তা সেই পুরনো প্রশ্নটিই আবার ইসরায়েলের সামনে এনে রাখল৷






