আমিরাতের ওপেক ত্যাগ তেলের বাজারে কী প্রভাব ফেলবে

আবুধাবির শাসক শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ান। ছবি : সংগৃহীত
জ্বালানি তেল রপ্তানিকারক দেশগুলোর সংগঠন ওপেক থেকে বেরিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত। আগামী ১ মে সংগঠন ছাড়ছে দেশটি। এ ঘোষণাটি অত্যন্ত বড় ঘটনা হিসেবে দেখা হচ্ছে, কারণ ১৯৭১ সালে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশের আগে থেকেই আমিরাত এর সদস্য ছিল।
১৯৬০ সালে ইরাকে রাজধানী বাগদাদে ওপেক গঠিত হয়। এটি উপসাগরীয় তেল রপ্তানিকারক দেশগুলোর একটি জোট। বর্তমানে ওপেকের সদস্য সংখ্যা ১২টি দেশ, যাদের অধিকাংশই মধ্যপ্রাচ্যের। আমিরাত ১৯৬৭ সালে এই সংগঠনে যোগ দেয়।
সংগঠনটির মূল লক্ষ্য ছিল তেল নীতিমালা সমন্বয় করা এবং বিশ্ববাজারে ন্যায্য ও স্থিতিশীল তেলের দাম নিশ্চিত করা। ছয় দশকেরও বেশি সময় ধরে সদস্য দেশগুলোর কে কতটুকু তেল উৎপাদন করবে ও রপ্তানি করবে তা নির্ধারণ করে ওপেক। কোটা বণ্টনের মাধ্যমে অপরিশোধিত তেলের মূল্য নিয়ন্ত্রণ করে আসছে এ জোট।
ওপেকে সৌদি আরবের অনেক বেশি প্রভাব রয়েছে। অধিকাংশ সিদ্ধান্ত রিয়াদ থেকে আসে বলে মনে করা হয়। ওপেক কোটা কারণে আমিরাতের উৎপাদন দৈনিক ৩ থেকে ৩.৫ মিলিয়ন ব্যারেলে সীমিত করে রাখতে বাধ্য হয়েছে।
জোট সদস্যপদের কারণে আমিরাতকে বিশাল রাজস্ব ক্ষতির ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছিল। যেকারণে চুক্তিটি অসম বলে মনে করে দেশটি।
ওপেক ছাড়ার ঘোষণায় ইউএই জানিয়েছে, তারা দীর্ঘমেয়াদী কৌশল ও অর্থনৈতিক দূরদৃষ্টির অংশ হিসেবে এই পদক্ষেপ নিয়েছে। ২০২৭ সাল নাগাদ পর্যায়ক্রমে দৈনিক তেলের উৎপাদন প্রায় ৩৬ লাখ ব্যারেল থেকে বাড়িয়ে ৫০ লাখ ব্যারেলে বাড়ানোর পরিকল্পনা করেছে। সহজ কথায়, আমিরাত তার তেলখাতে বিনিয়োগ করা বিপুল সক্ষমতাকে কাজে লাগাতে চাইছে।
ইরান যুদ্ধের কারণে আমিরাত দ্রুত এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে মনে করা হয়। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইএ) অনুমান অনুযায়ী, গত বছর এই জোট বিশ্বের মোট তেল ও তেলজাত তরল পণ্যের প্রায় ৫০ শতাংশ উৎপাদন করেছে। আমিরাত ছিল ওপেক প্লাসের চতুর্থ বৃহত্তম উৎপাদক দেশ।
যুক্তরাষ্ট্র–ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে, ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে আমিরাত প্রতিদিন ৩ দশমিক ৩ মিলিয়ন ব্যারেল তেল উৎপাদন করত। তাদের সক্ষমতা ছিল ৪ দশমিক ৫ থেকে ৫ মিলিয়ন ব্যারেল পর্যন্ত।
ওপেকে আমিরাতের গুরুত্ব ছিল অনেক, কারণ সৌদি আরবের সঙ্গে মিলিয়ে তাদের অতিরিক্ত উৎপাদন ক্ষমতা ছিল, যা প্রয়োজন হলে বাজারে সরবরাহ বাড়াতে ব্যবহার করা যেত।
তবে ইরান যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট নজিরবিহীন বাজার অস্থিরতা এবং কার্যত হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর এই পরিস্থিতি বদলে যায়।
এই সংকটের কারণে মার্চ মাসে উপসাগরীয় ওপেক প্লাস দেশগুলোর তেল উৎপাদন ফেব্রুয়ারির তুলনায় প্রতিদিন প্রায় ৮ মিলিয়ন ব্যারেল কমে যায় বলে জানায় ওপেক।
এই উৎপাদন হ্রাসের কারণ ছিল রপ্তানি সীমাবদ্ধতা। যদিও সৌদি আরব ও আমিরাতের বিকল্প রপ্তানি ব্যবস্থা রয়েছে।
সৌদি আরবের প্রতিদিন ৭ মিলিয়ন ব্যারেল ক্ষমতাসম্পন্ন একটি পাইপলাইন রয়েছে, যা রেড সি পর্যন্ত তেল পরিবহন করতে পারে। অন্যদিকে আমিরাত ফুজাইরাহ বন্দরের মাধ্যমে প্রতিদিন ১ দশমিক ৫ থেকে ১ দশমিক ৮ মিলিয়ন ব্যারেল রপ্তানি করতে সক্ষম।
যুদ্ধের কারণে পরিবর্তিত পরিস্থিতি তেল বেশি রপ্তানি করে রাজস্ব ভারসাম্য আনতে চাইছে আমিরাত।
তবে, আশার কথা আমিরাত এ সিদ্ধান্তে অটল থাকলে তেলের দাম কমবে। তারা কমমূল্যে বেশি তেল বাজারে সরবারহ করতে চাইবে। ওপেকের সঙ্গে বিশেষ করে সৌদি আরবের সঙ্গে পাল্লা দিতে চাইলে আমিরাতের কাছে এর বাইরে চিন্তা করার সুযোগ নেই।
যদিও ওপেকের দাবি, তারা বাজারের ভারসাম্য রক্ষার জন্য তেল উৎপাদন বাড়ায় বা কমায়।
তবে সমালোচকরা মনে করেন, এই জোট তেলের দাম নিয়ন্ত্রণ করে প্রভাব বিস্তার করে, যদিও ওপেক এই অভিযোগ অস্বীকার করে।
২০২৫ সালে ওপেকের অপরিশোধিত তেল রপ্তানি বিশ্বব্যাপী সমুদ্রপথে তেল রপ্তানির প্রায় ৪৭ শতাংশ ছিল বলে কেপলারের তথ্য জানায়। তবে মার্চে এটি কমে ৩৪ দশমিক ৭ শতাংশে নেমে আসে।
উপসাগরীয় অঞ্চলের এই উত্তপ্ত পরিস্থিতি ইরানের সঙ্গে সংযুক্ত আরব আমিরাতের সম্পর্কে প্রভাব ফেলেছে এবং সৌদি আরবের সঙ্গে এর আগে থেকেই টানাপোড়েনের সম্পর্ককে আরও প্রভাবিত করতে পারে।
আমিরাতের বেরিয়ে যাওয়া ওপেকের জন্য এটি একটি বড় ধাক্কা। এমন এক সময়ে এ ঘোষণা এলো, যখন এর দীর্ঘমেয়াদী ঐক্য নিয়ে বিশ্ববাজারে প্রশ্ন উঠছে।



