সাক্ষাৎকারে ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ সচিব
দেশে দেশে পারমাণবিক তৃষ্ণা বাড়াচ্ছে মার্কিন আগ্রাসন
- যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক অবরোধে সহায়তা করলেই হামলা

ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সচিব মহসেন রেজাই। ছবি: সংগৃহীত
বিশ্ব জুড়ে পারমাণবিক অস্থিতিশীলতার ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিয়েছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইরান হামলার বোকামি। দেশে দেশে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের তৃষ্ণা বাড়াচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসী কর্মকাণ্ড। গতকাল রবিবার রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে সম্প্রচারিত এক সাক্ষাৎকারে এ মন্তব্য করেছেন ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সচিব মহসেন রেজাই। একই সঙ্গে মার্কিন অর্থনৈতিক অবরোধে সহায়তা করলেই সংশ্লিষ্ট দেশগুলোকে হামলার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তিনি। তাসনিম, তাস।
সাক্ষাৎকারে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) অসহায়ত্বও তুলে ধরেছেন তিনি। বলেছেন, আইএইএ ও পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তি (এনপিটি) কার্যকর থাকলেও তা যুক্তরাষ্ট্রকে কোনো দেশ আক্রমণ করা থেকে বিরত রাখার নিশ্চয়তা দিতে পারছে না। ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক অবরোধ সম্পর্কে বলেছেন, মার্কিন এ নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নে কোনো দেশ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সহায়তা করলেই তা শত্রুতামূলক আচরণ হিসেবে বিবেচনা করবে তেহরান। এ পরিস্থিতিতে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোকে ইরানের সামরিক হামলার সম্মুখীন হতে হবে। টেলিভিশনে সম্প্রচারিত ওই সাক্ষাৎকারে রেজাই আরও জানালেন, ‘ইরানের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ও চাপ বাড়াতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নতুন পরিকল্পনা কার্যকর করা হলে এক ফোঁটা তেলও পারস্য উপসাগর কিংবা হরমুজ প্রণালি দিয়ে বের হতে দেবে না। শুধু হরমুজ প্রণালি নয়, সমগ্র পারস্য উপসাগরই ইরানের জন্য তেল রপ্তানির ক্ষেত্র হয়ে উঠবে এবং ওই পথে কোনো তেলবাহী জাহাজ চলাচল করতে পারবে না।’ তেহরানের শীর্ষ এই কর্মকর্তার বক্তব্যকে আজ সোমবার মার্কিন প্রশাসনের ঘোষিতব্য নতুন নিষেধাজ্ঞার প্রেক্ষাপটে দেওয়া সবচেয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট এরই মধ্যে (২০ আগস্ট) এই নিষেধাজ্ঞাকে ইরানের বিরুদ্ধে ‘ইতিহাসের কঠোরতম অর্থনৈতিক দমননীতি’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তার দাবি, এই নিষেধাজ্ঞা শুধু ইরানের বর্তমান অর্থনৈতিক কাঠামোকেই নয়; বরং দেশটির ভবিষ্যৎ অবকাঠামোকেও গভীরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। ১৯ আগস্ট ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়ানোর হুঁশিয়ারি দেন ট্রাম্প। পরদিনই ওয়াশিংটনের মিত্রদের উদ্দেশে কঠোর বার্তা দেন অর্থমন্ত্রী। জানালেন, ইরানকে অর্থনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন করার এই বৈশ্বিক উদ্যোগে তাদের ‘যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে থাকা নাকি তার মুখোমুখি দাঁড়ানো’— এ দুইয়ের মধ্যে একটি বেছে নিতেই হবে। বেসেন্ট তার বার্তায় স্পষ্ট করেন, ‘এটি বিশ্বের ইতিহাসে সর্ববৃহৎ সমন্বিত অর্থনৈতিক বিচ্ছিন্নতা কার্যক্রম হবে। আমরা আমাদের মিত্রদের বলে দিচ্ছি, হয় তোমরা আমাদের পক্ষে থাকবে, নয়তো আমাদের বিপক্ষে।’ ওইদিনই মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ঘোষণা করেন, ইরান ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্র এখন ‘সম্পূর্ণ নতুন অধ্যায়ে’ প্রবেশ করেছে। তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন, ইসলামি প্রজাতন্ত্রের পারমাণবিক সক্ষমতা পুনরুদ্ধার ঠেকাতে ধারাবাহিক অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগই হবে ওয়াশিংটনের প্রধান হাতিয়ার। মার্কিন এই ‘চূড়ান্ত হুঁশিয়ারির’ পাল্টা জবাবে মহসেন রেজাই ইরানের সব প্রতিবেশী দেশকে উদ্দেশ্য করে হুমকি দিয়ে বলেছেন, ‘আমরা স্পষ্ট জানিয়ে দিচ্ছি, ইরানবিরোধী এই অর্থনৈতিক অভিযানে কেউ শামিল হবেন না। কেউ এতে জড়িয়ে পড়লে আমরা তাকে শত্রু মনে করব। প্রথম পর্যায়ে আমরা আলোচনার মাধ্যমে তাদের সতর্ক করব। কিন্তু যদি তারা সেই সতর্কতা অমান্য করে অর্থনৈতিক যুদ্ধে অংশগ্রহণ অব্যাহত রাখে, তাহলে আমরা সে দেশকে সরাসরি হামলার মুখে ফেলব।’ মহসেন রেজাই অবশ্য ট্রাম্প প্রশাসনের এই উদ্যোগকে নেহাতই ‘প্রচারমূলক কৌশল’ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। তিনি দাবি করেন, ‘নৌবন্দর অবরোধ কিংবা তেল রপ্তানিতে বাধা দেওয়ার বিষয়টি আজকের নয়; ইরান সব সময়ই এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সক্ষম ছিল।’ তিনি আরও দাবি করেন, গত এক থেকে দুই মাসে ইরান প্রায় ৭০ মিলিয়ন ব্যারেল তেল রপ্তানি করতে সক্ষম হয়েছে, যা প্রমাণ করে যে বৈশ্বিক নিষেধাজ্ঞার বাইরেও ইরানের তেল বিক্রির নিজস্ব পথ রয়েছে।
ভেনেজুয়েলা হবে না ইরান
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বলেছেন, দেশটি বর্তমানে ‘পূর্ণমাত্রার অর্থনৈতিক, সামরিক ও নিরাপত্তা যুদ্ধের’ মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ইরান আরেকটি ভেনেজুয়েলায় পরিণত হবে, যুক্তরাষ্ট্রের এই ভবিষ্যদ্বাণী ভুল বলেও উল্লেখ করেন তিনি। ‘যুদ্ধও নয়, শান্তিও নয়,’ এমন পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসা প্রয়োজন বলে যোগ করেন তিনি।







