লেগো অ্যানিমেশন দিয়ে যেভাবে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে ‘জিতল’ ইরান

লেগো অ্যানিমেশনের একটি দৃশ্য
চাঁদের আলোয় ফাঁকা প্রান্তরে ঘোড়ায় চড়ে এগিয়ে আসে এক নেটিভ আমেরিকান প্রধান। তারপর দ্রুত দৃশ্য পাল্টায়। শিকলবন্দি কৃষ্ণাঙ্গ আমেরিকান থেকে শুরু করে ইরাকের কুখ্যাত আবু গারিব কারাগারের নির্যাতিতদের পর্যন্ত— যেন একে একে দেখানো হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের মাধ্যমে হওয়া বিভিন্ন ভুক্তভোগীকে।
এরপর ক্যামেরা ঘুরে যায় ইরানি সেনাদের দিকে। তারা ক্ষেপণাস্ত্রে বড় বড় ব্যানার লাগাচ্ছে—ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক তখন চড়তে শুরু করেছে। ‘চুরি হয়ে যাওয়া কৃষ্ণাঙ্গদের জন্য’, লেখা ব্যনার লাগালেন একজন। আরেকজন লাগালেন, ‘হিরোশিমা ও নাগাসাকির মানুষের জন্য’ লেখা।
তারপর ১৯৮৮ সালে মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্রে ভূপাতিত বিমানের ২৯০ যাত্রীর কথা উল্লেখ করে ‘ইরান এয়ার ফ্লাইট ৬৫৫-এর নিহতদের স্মরণে’ লেখা ব্যানার। এরপর গাজায় ইসরায়েলি বুলডোজারের নিচে চাপা পড়ে মারা যাওয়া মার্কিন কর্মীর কথা উল্লেখ করে —‘র্যাচেল কোরির সংগ্রামের স্মরণে’ লেখা। আফগানিস্তান, ভিয়েতনাম, ইরাক— সব জায়গার যুদ্ধের শিকার, এমনকি ‘এপস্টাইন দ্বীপের শিশুরাও’ সবাই যেন একে একে সেই ক্ষেপণাস্ত্রে পেয়েছে জায়গা। তারপর সেগুলো ছুটে যায় আকাশে।
শেষ দৃশ্যে ভেঙে পড়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প আর বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বিশাল মূর্তি। পর্দায় বড় সাদা অক্ষরে ভেসে ওঠে—‘সবার জন্য নেওয়া প্রতিশোধ’।
এসব একটি অ্যানিমেশন ভিডিওর গল্প। দেখতে সাধারণ লেগো স্টাইলের অ্যানিমেশনের মতো, কিন্তু সাধারণ নয়। যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসনে ভুক্তভোগীদের গল্প এবং প্রতিশোধের বার্তা উঠে এসেছে এসব অ্যানিমেশনে।
২৯ মার্চের এই ভিডিওটি বানিয়েছে ‘এক্সপ্লোসিভ মিডিয়া’, যারা লেগোর মতো পরিচিত খেলনা দিয়ে বানানো অ্যানিমেশন দিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় ঝড় তুলছে। সেই সঙ্গে যুদ্ধের মধ্যে ছড়িয়ে দিচ্ছে তেহরানের বার্তাও। কাজ করছে ইরানভিত্তিক এমন বেশ কয়েকটি দল।
ভিডিওটি এক্সে প্রায় দেড় লাখবার দেখা হয়েছে। যদিও তাদের ইউটিউব চ্যানেল মুছে দিয়েছে গুগল, তবু তারা থামেনি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দলের এক সদস্য জানান, সহিংসতা ছড়ানোর অভিযোগে তাদের চ্যানেল বন্ধ করা হয়েছে। তবে তাদের মতে, লেগো অ্যানিমেশন তো সহিংসতার কিছুই না।
তার ভাষ্য, ‘খারাপ লেগেছে, কিন্তু অবাক হইনি। পশ্চিমা দুনিয়া এমনই—সত্যকে চেপে রাখে, আর যারা সত্য বলে তাদের চুপ করাতে চায়।’
প্রতীকী হলে গভীর অর্থপূর্ণ
এই ভিডিওগুলো কখনো গম্ভীর, ইতিহাসভিত্তিক—আবার কখনো র্যাপ গান আর ব্যঙ্গাত্মক ভঙ্গিতে তৈরি। সবই লেগো স্টাইলের চরিত্র দিয়ে।
সবুজ আর লাল রঙও এখানে প্রতীকী। সবুজ হোসাইনকে বোঝায়, অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়ের লড়াই; আর লাল অত্যাচারীর প্রতীক।
দলের ওই সদস্য উল্লেখ করেন, ‘যখন ক্ষেপণাস্ত্রে হেলমেট বসানো হয়— ওই দৃশ্যটা আমাদের সবার খুব পছন্দের।’
অন্যান্য ভিডিওতে ট্রাম্পকে ব্যঙ্গ করা হয়। ‘লুজার’, ‘এপস্টিন রেজিম’—এমন শব্দ ব্যবহার করে দেখানো হয়, কীভাবে তিনি নিজের কথাই ভেঙেছেন।
‘লুজার আমাদের সেরা কাজগুলোর একটি’, উল্লেখ করেন ওই সদস্য। ‘ট্রাম্প যেমন অন্যদের লুজার বলেন, আমরা সেটা উল্টে দিয়েছি—শেষে তিনিই সবচেয়ে বড় লুজার।’
কখনো ট্রাম্প-সদৃশ চরিত্রকে হাতে পুতুল নিয়েও দেখানো হয়।
আরেকটি ভিডিওতে লেবাননের মানুষকে উদ্দেশ করে বলা হয়, ইরানের আইআরজিসি তাদের ছেড়ে যাবে না। এটি প্রকাশ করা হয় এমন সময়, যখন মাত্র ১০ মিনিটে সেখানে শতাধিক বোমা ফেলা হয়েছিল।
এই পুরো কাজটা করছে ১০ জনের একটি দল। তাদের সবার বয়স ১৯ থেকে ২৫।
তথ্যযুদ্ধের নতুন অস্ত্র
শুধু এক্সপ্লোসিভ মিডিয়াই নয়—পার্সিয়াবয়, সাউদার্ন পাঙ্কসহ অনেকেই একই ধরনের ভিডিও বানাচ্ছে। এমনকি এই ট্রেন্ড ছড়িয়ে গেছে পাকিস্তানেও।
বিশ্লেষক ফাসি জাকা জানান, এই ভিডিওগুলোর শক্তি হলো—এগুলো সেই তথ্যযুদ্ধের দেয়াল ভেঙে সামনে আসে, যেখানে দীর্ঘদিন ধরে পশ্চিমা বয়ানই প্রাধান্য পেয়েছে।
তার মতে, যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরের দুর্বলতা যেভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে, তা খুবই কৌশলী।
তার ভাষ্য, ‘দেখতে মজার লাগলেও, আসলে এগুলো খুব হিসাব করে বানানো।’
‘স্মার্ট প্রোপাগান্ডা’
মার্ক ওউন জোন্সের মতে, ইরান জানে, সামরিকভাবে জেতা কঠিন। তাই তারা জনমত জয়ের লড়াইয়ে নেমেছে।
তার ভাষ্য, ‘এই ধরনের কটাক্ষভরা, ট্রলধর্মী কনটেন্ট এখন খুব কার্যকর।’
তার মতে, এসব ভিডিও ভালোভাবে চিন্তা করে বানানো। এতে গল্প আছে, আছে বার্তাও।
সব মিলিয়ে, লেগোর মতো সরল জিনিসকে ব্যবহার করে তৈরি হয়েছে এক নতুন ধরনের তথ্যযুদ্ধ, যেখানে খেলনার আড়ালে লুকিয়ে আছে কঠিন রাজনৈতিক বার্তা।

