ঘণ্টায় ঘণ্টায় লোডশেডিং, গরমে হাঁসফাঁস সিলেটবাসী

প্রতীকী ছবি
গত তিন দিন ধরে সিলেটে দেখা দিয়েছে তীব্র বিদ্যুৎ সংকট। দিন-রাতজুড়ে ঘন ঘন লোডশেডিংয়ে হাঁসফাঁস করছে মানুষ, গরমে নাজেহাল হয়ে উঠেছে জনজীবন। শহর থেকে গ্রাম, কোথাও মিলছে না স্বস্তি। কোথাও ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ নেই, আবার কোথাও বারবার আসা-যাওয়ায় থমকে গেছে স্বাভাবিক জীবন।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) ও পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের তথ্যানুসারে, সিলেটে মোট বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ৬০৩ মেগাওয়াট। কিন্তু এর বিপরীতে সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কম থাকায় গড়ে ২৫ থেকে ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত ঘাটতি তৈরি হয়েছে। পিডিবির ক্ষেত্রে ১৭০ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ মিলছে প্রায় ১৩০ মেগাওয়াট। অন্যদিকে পল্লী বিদ্যুতের ৪৩৩ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ২৫৩ মেগাওয়াট। যা সংকটকে আরও তীব্র করে তুলেছে।
এই ঘাটতির ফলে ঘন ঘন লোডশেডিং হচ্ছে শহরাঞ্চলেও । তবে গ্রামীণ এলাকাগুলোতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। অনেক জায়গায় দিনে ৬ থেকে ৭ ঘণ্টা পর্যন্ত থাকছে না বিদ্যুৎ। আবার কোথাও রাতভর বিদ্যুৎহীন অবস্থায় কাটাতে হচ্ছে বাসিন্দাদের। এতে করে শিশু, বয়স্ক এবং অসুস্থদের সবচেয়ে বেশি বেড়েছে দুর্ভোগ।
পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড সিলেটের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী পরেশ চন্দ্র মন্ডল বলেছেন, ‘গ্রাহকদের বিপুল চাহিদার তুলনায় সরবরাহ অনেক কম থাকায় বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। প্রতিদিন প্রয়োজনীয় বিদ্যুতের তুলনায় প্রায় অর্ধেকের মতো কম সরবরাহ পাওয়ায় বাধ্য হয়েই ঘন ঘন লোডশেডিং করতে হচ্ছে।’
বিদ্যুতের এই ঘাটতি কমানো না গেলে পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি সম্ভব নয় বলেও উল্লেখ করেছেন তিনি।
সংশ্লিষ্টরা জানান, বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে যাওয়ার পেছনে রয়েছে একাধিক কারণ। বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের প্রভাবে জ্বালানি তেলের সরবরাহে বিঘ্ন ঘটছে। পাশাপাশি যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে সিলেটের কয়েকটি বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ থাকায় উৎপাদন আরও কমে গেছে। এর প্রভাব পড়েছে জাতীয় গ্রিডেও।
এদিকে তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে বিদ্যুতের চাহিদা বেড়ে গেলেও সরবরাহ বাড়েনি। ফলে পরিস্থিতি হয়ে উঠেছে আরও জটিল। বিদ্যুৎ বিভাগ জানিয়েছে, জাতীয় পর্যায়ে উৎপাদন না বাড়লে এ সংকট থেকে দ্রুত মুক্তি পাওয়ার সম্ভাবনা কম।
লোডশেডিংয়ের কারণে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ছেন সাধারণ মানুষ। ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাটে বাসা-বাড়িতে ছোট শিশু ও বয়স্কদের নিয়ে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। গরমের মধ্যে বিদ্যুৎ না থাকায় জীবনযাত্রা হয়ে উঠেছে কষ্টকর ও অসহনীয়।
ব্যবসা-বাণিজ্যেও এর নেতিবাচক প্রভাব স্পষ্ট। ব্যবসায়ীরা জানিয়েছে, আগে থেকেই সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে দোকান বন্ধ রাখার নির্দেশনা থাকায় সময় সীমিত হয়ে গেছে। তার ওপর দিনের বড় একটি সময় বিদ্যুৎ না থাকায় ক্রেতাদের উপস্থিতিও কম। ফলে লোকসানের আশঙ্কা বাড়ছে।
মহানগর ব্যবসায়ী ঐক্য কল্যাণ পরিষদের সভাপতি আব্দুর রহমান রিপন বলেছেন, ‘বর্তমান লোডশেডিং পরিস্থিতিতে ব্যবসা পরিচালনা করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে দোকান বন্ধ রাখতে হচ্ছে, আবার দিনের বেশিরভাগ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় ক্রেতাও কমে গেছে। এভাবে চলতে থাকলে ব্যবসায়ীরা বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়বেন।’
‘বর্তমান পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে ব্যবসা খাতে নেতিবাচক প্রভাব আরও বাড়বে। তাই লোডশেডিং মোকাবিলায় সৌরবিদ্যুৎকে কার্যকর ও টেকসই সমাধান হিসেবে গ্রহণ করা জরুরি। সরকারি সহযোগিতা পেলে শপিংমল ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে নিজস্ব বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হবে। যা নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে সহায়ক হবে। - যোগ করেন তিনি।
অন্যদিকে সামনে এসএসসি পরীক্ষা শুরু হতে যাচ্ছে; যা শিক্ষার্থীদের জন্য নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। নিয়মিত বিদ্যুৎ না থাকায় পড়াশোনায় ব্যাঘাত ঘটছে বলে জানিয়েছেন অভিভাবক ও পরীক্ষার্থীরা।
বিদ্যুৎ সংকট সিলেটের মানুষের দৈনন্দিন জীবন, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং শিক্ষাব্যবস্থায় বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করেছে। দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে এই সংকট আরও গভীর হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড সিলেট বিভাগের প্রধান প্রকৌশলী মোহাম্মদ ইমাম হোসেন বলেছেন, ‘সাম্প্রতিক সময়ে হঠাৎ করে বিদ্যুতের চাহিদা বেড়ে গেলেও উৎপাদন সেই অনুপাতে বাড়েনি। উপরন্তু, কয়েকটি বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ থাকায় সরবরাহে ঘাটতি তৈরি হয়েছে। ফলে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ বজায় রাখা সম্ভব হচ্ছে না এবং বাধ্য হয়েই লোডশেডিং করতে হচ্ছে।’
জাতীয় পর্যায়ে উৎপাদন বাড়ানো গেলে পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।

