মুজিবনগর সরকার কেন রাষ্ট্রপতি শাসিত ছিল
- আ.লীগের হাইকমান্ড থেকে মুজিবনগর সরকার
- রাষ্ট্রপতি থেকে প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিব
- কারাবন্দি থেকেও প্রধান নেতা শেখ মুজিব
- কীভাবে হলো গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ

গ্রাফিক্স: আগামীর সময়
মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের ২৪ দিন পর ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি স্বাধীন দেশে পা রাখেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। পাকিস্তান কারাগার থেকে দেশে ফিরে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এর আগে স্বাধীনতার রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের ৯ মাস পাকিস্তান কারাগারে বন্দি ছিলেন তিনি।
কেন স্বাধীন দেশে ফিরে রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুব রহমান প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নিলেন? মুজিবনগর সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদকে কেন স্বাধীন দেশে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব থেকে সরিয়ে অর্থমন্ত্রী করা হয়েছিল? সম্পর্কের টানাপোড়েনে কেন বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দুরুত্ব তৈরি হয়েছিল তাজউদ্দীনের? তা নিয়ে জনমনে রয়েছে নানা প্রশ্ন।
‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ। তাজউদ্দীন ভাইয়ের পছন্দ হলো। নামটি ঠিক করার সময় আমাদের মাথায় গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের কথা মনে হচ্ছিল’
গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা মনে করেন, সংসদীয় গণতন্ত্রের রাজনীতির জন্যই আজীবন লড়াই করা শেখ মুজিব যে স্বাধীন দেশে ফিরে সেই ধারা বজায় রাখবেন, তা ছিল অনেকটাই অনুমেয়।
তবে মুক্তিযুদ্ধের মতো একটা বিপ্লবী ঘটনার পর ‘বিপ্লবী সরকার’ গঠন কেন করা হলো না? তা নিয়ে যেমন প্রশ্ন আছে, আবার ‘সর্বদলীয় সরকার’ গঠনের জন্য মুজিবকে পরামর্শও দিয়েছিলেন কেউ কেউ। শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীন দেশে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে সংসদীয় গণতন্ত্রের পথেই হাঁটলেন।
রাষ্ট্রপতি থেকে প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিব
গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ তার বেলা-অবেলা (বাংলাদেশ ১৯৭২-১৯৭৫) বইয়ে লিখেছেন, ‘১১ জানুয়ারি (১৯৭২) ‘বাংলাদেশ অস্থায়ী সংবিধান আদেশ’ জারি করা হলো। এই আদেশে বলা হলো, ১৯৭০ সালের ডিসেম্বরে ও ১৯৭১ সালের জানুয়ারি মাসে অনুষ্ঠিত জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদের আসনগুলোতে বিজয়ী এবং আইনের দ্বারা অযোগ্য বিবেচিত নন-এমন সব নির্বাচিত প্রতিনিধিকে নিয়ে গঠিত হবে ‘গণপরিষদ’। আগের প্রাদেশিক হাইকোর্ট বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিল। একটি অস্থায়ী হাইকোর্ট গঠনের প্রয়োজন হলো। ১১ জানুয়ারি হাইকোর্টের বিচারপতি আবুসাদাত মোহাম্মদ সায়েমকে নিয়োগ দেওয়া হয় প্রধান বিচারপতি পদে।’
মহিউদ্দিন আহমদ আগামীর সময়কে বলছিলেন, ‘শেখ মুজিব তো সংসদীয় গণতন্ত্রই চেয়েছিলেন। আর স্বাধীনতার পর তিনি যে সংসদীয় গণতন্ত্রের পথে হাঁটবেন, সেটা আগে থেকেই অনেকটা বোঝা গিয়েছিল।’
‘১০ জানুয়ারি দেশে ফিরে প্রথমে রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নিয়ে পরে তিনি গণপরিষদ গঠন করেন এবং গণপরিষদ সংবিধান মেনেই প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শেখ মুজিবকে নির্বাচিত করেন। ১৯৭৩ সালের নির্বাচনের মাধ্যমে সংসদীয় গণতন্ত্রের পথে হাঁটেন শেখ মুজিব’-বলছিলেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মোহাম্মদ ফায়েক উজ্জামান।
আগামীর সময়কে এই অধ্যাপক আরও জানালেন, ‘শেখ মুজিবুর রহমানের সারাজীবনের রাজনীতিই তো ছিল সংসদীয় গণতন্ত্রের জন্য। ফলে তিনি দেশে ফিরে রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার থেকে প্রধানমন্ত্রী শাসিত সরকার ব্যবস্থায় নিয়ে যান। মুজিবনগর সরকার যেহেতু বিশেষ মুহূর্তে গঠিত সরকার। আর মুক্তিযুদ্ধের প্রধান নেতা শেখ মুজিব। ফলে তখন শেখ মুজিবকে রাষ্ট্রপতি করাটাও ছিল বাস্তবিক কারণেই।’
কারাবন্দি থেকেও প্রধান নেতা শেখ মুজিব
১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধুকে তার ধানমণ্ডির ৩২ নম্বর সড়কের বাড়ি থেকে পাকিস্তানি সেনারা আটক করে তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানে নিয়ে যায়। ২৫ মার্চ রাত থেকেই ‘অপারেশন সার্চ লাইট’ নামে বাংলাদেশের নিরস্ত্র মানুষের ওপর বর্বর হামলা চালায় পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী।
‘প্রধানমন্ত্রী কে হবেন? দ্বিধা না করে এবারও জবাব দিলাম, ২৫ মার্চের পর থেকে আজ পর্যন্ত যিনি প্রধান দায়িত্ব পালন করে আসছেন। তিনিই স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় দায়িত্ব পালন করবেন’
নয় মাসের রক্তক্ষয়ী স্বাধীনতা যুদ্ধে সশরীরে উপস্থিত না থাকলেও বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্ব গঠিত হয় প্রবাসী সরকার, যা মুজিবনগর সরকার নামে পরিচিত। মুজিবনগর সরকারের রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত করা হয়েছিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। তবে তিনি কারাগারে বন্দি থাকায় উপরাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন। এ সরকারের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন তাজউদ্দীন আহমদ।
অন্য সদস্যরা হলেন, অর্থমন্ত্রী এম মনসুর আলী, স্বরাষ্ট্র, ত্রাণ ও পুনর্বাসন মন্ত্রী এ এইচ এম কামারুজ্জামান এবং পররাষ্ট্র ও আইনমন্ত্রী খন্দকার মোশতাক আহমেদ। এছাড়াও মুজিবনগর সরকারকে পরামর্শ প্রদানের জন্য ছয় সদস্যের একটি উপদেষ্টা কমিটিও গঠন করা হয়। তাজউদ্দীন আহমদকে আহ্বায়ক করে গঠিত সর্বদলীয় উপদেষ্টা পরিষদের অন্য সদস্যরা হলেন- ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির (ন্যাপ-ভাসানী) মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির (মোজাফফর) অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমদ, কমিউনিস্ট পার্টির কমরেড মণি সিংহ, জাতীয় কংগ্রেসের মনোরঞ্জন ধর, পদাধিকারবলে মুজিবনগর সরকারে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খন্দকার মোশতাক আহমেদ এবং আওয়ামী লীগের দুজন প্রতিনিধি।
‘বর্তমানে বাংলাদেশের যে মনোগ্রাম সরকারি কাগজপত্রে ব্যবহৃত হচ্ছে, তা আমার হাতে আঁকা। চারপাশে গোলাকৃতি লালের মাঝখানে সোনালি রঙের মানচিত্র। মনোগ্রাম দেখে তাজউদ্দীন ভাই পছন্দ করলেন’
মুজিবনগর সরকারের অস্থায়ী কার্যালয় হিসেবে কলকাতার থিয়েটার রোডের ৮ নম্বর বাড়িটি ব্যবহার করা হয়। এই ঠিকানা থেকেই মুজিবনগর সরকারের সব কার্যক্রম পরিচালনা করা হত। মুজিবনগর সরকার মুক্তিযুদ্ধকে সঠিকভাবে পরিচালনার জন্য বাংলাদেশকে ১১টি সেক্টরে ভাগ করে কমান্ডার নিয়োগ ও মুক্তিবাহিনীকে ৩টি বিগ্রেড ফোর্সে ভাগ করে। এছাড়াও মুক্তিবাহিনীর প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা ও ভারতে আশ্রয়প্রাপ্ত শরণার্থীদের দেখভালের দায়িত্ব সফলতার সঙ্গে পালন করে মুজিবনগর সরকার।
আওয়ামী লীগের হাইকমান্ড থেকে মুজিবনগর সরকার
২৫ মার্চ কালরাতে ঢাকা শহরে পাকিস্তানিদের হত্যাযজ্ঞ চালানোর পর সীমান্তের ঝুঁকিপূর্ণ পথ পাড়ি দিয়ে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তাজউদ্দীন আহমদ কলকাতায় পৌঁছান। সঙ্গী ছিলেন সেই সময়কার তরুণ ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলাম।
‘মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি’ বইয়ে আমীর-উল ইসলাম লিখেছেন, ‘সরকার গঠনের জন্য বিভিন্ন ফ্রন্ট থেকে চাপ আসা অব্যাহত রয়েছে। সরকার গঠন করার ব্যাপারে তাজউদ্দীন ভাইকে খুবই চিন্তিত মনে হয়। অস্ফুট স্বরে তিনি বলে ফেললেন, ‘বঙ্গবন্ধু আমাকে কি বিপদে ফেলে গেলেন’। আমি বিরক্তির সঙ্গে জানতে চাইলাম, সরকার গঠন করার বিষয়ে তাজউদ্দীন ভাই দ্বিধাগ্রস্ত কেন? জবাবে তাজউদ্দীন ভাই বলেন, ‘আপনি আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি জানেন না। সরকার গঠন করার প্রয়োজনীয়তার কথা বুঝি। জাতির বৃহত্তর স্বার্থেই তা প্রয়োজন। কিন্তু বঙ্গবন্ধু ও অন্যান্য নেতার অনুপস্থিতিতে সরকার গঠন করে সম্মুখীন হতে হবে নাজুক পরিস্থিতির।’
আমার সরল মনের কাছে দেশের এমন একটি ভয়াবহ পরিস্থিতিতে সরকার গঠনের প্রয়োজনীয়তা রাজনৈতিক চেতনার দিক দিয়ে প্রথম ও প্রধান কর্তব্য বলে মনে হয়। তাজউদ্দীন ভাই আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘কাকে নিয়ে সরকার গঠন করা হবে? আমি স্বাভাবিক উত্তর দিলাম। বঙ্গবন্ধু সরকার গঠন করে রেখে গেছেন।’
‘আমি বললাম, যে ৫ জন নিয়ে বঙ্গবন্ধু হাইকমান্ড গঠন করেছিলেন, এই ৫ জনকে নিয়েই সরকার গঠন করা হবে। দলীয় প্রধান বঙ্গবন্ধু, সাধারণ সম্পাদক, তিনজনসহ সভাপতি নিয়ে এই হাইকমান্ড পূর্বেই গঠিত হয়েছিল।
তাজউদ্দীন ভাই পুনরায় প্রশ্ন করেন, প্রধানমন্ত্রী কে হবেন? দ্বিধা না করে এবারও জবাব দিলাম, ২৫ মার্চের পর থেকে আজ পর্যন্ত যিনি প্রধান দায়িত্ব পালন করে আসছেন। তিনিই স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় দায়িত্ব পালন করবেন। তাজউদ্দীন ভাই অনেকক্ষণ ভাবলেন। আমার প্রস্তাবের যৌক্তিকতা কোনোভাবেই নাকচ করতে পারলেন না।’
সে সময় আওয়ামী লীগ নেতাদের মৃত্যুর খবর নিয়েও গুজব ছড়ানোর কথা উঠে আসে আমীর-উল ইসলামের লেখায়। তিনি লিখেছেন, ‘আওয়ামী লীগের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের কথা স্মরণ করেন তাজউদ্দীন ভাই। তারা কে কোথায় কী অবস্থায় আছেন, এ নিয়ে তিনি বিশেষভাবে চিন্তা করছেন। পত্রিকায় ইতোমধ্যে অনেকের মৃত্যুসংবাদ পরিবেশিত হয়েছে। অবশ্য পত্রিকাতে প্রকাশিত নিহতের তালিকায় তাজউদ্দীন ভাই এবং আমার নামও রয়েছে। নিহতের তালিকায় আমাদের দুজনের নাম দেখে ভেবেছিলাম, হয়তো জীবিত রয়েছেন আমাদের নেতারাও।’
বঙ্গবন্ধুকে প্রধান করা হলে তার নিরাপত্তা সমস্যা হবে কিনা, তাও আলোচনা হয়েছিল উল্লেখ করে আমীর-উল ইসলাম লিখেছেন, ‘আমাদের আরো চিন্তা হলো, বঙ্গবন্ধুকে প্রধান করা হলে আমাদের আন্দোলনের ব্যাপারে কী প্রতিক্রিয়া হবে। অথবা তার জীবনের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার কারণ দেখা দেবে কিনা। এ নিয়ে দুজনে অনেক রাত পর্যন্ত আলোচনা করি। পক্ষে-বিপক্ষে যুক্তি দিই, আবার খণ্ডন করি। শেষে সিদ্ধান্ত নিলাম, ফলাফল যা-ই হোক, বঙ্গবন্ধুকে সরকারের রাষ্ট্রপতি ঘোষণা করতে হবে।
তাজউদ্দীন ভাই বলেন, ‘আমি দীর্ঘদিন ধরে বঙ্গবন্ধুর সহকর্মী হিসেবে তার সঙ্গে কাজ করেছি। তবে এই বিষয়ে আমি স্থির নিশ্চিত যে, কোনো প্রকার ভয়ভীতি বা চাপের মাধ্যমে পাক সরকার বঙ্গবন্ধুকে দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষে কোনো বিবৃতি দিতে সমর্থ হবে না।’
যেভাবে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ
দেশের নাম কি হবে, তা নিয়েও আলোচনা করার কথা উল্লেখ করে আমীর-উল ইসলাম লিখেছেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের সিপাহশালার শত্রুর হাতে বন্দি। আবার তাকে বাদ দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের কথা কল্পনাও করা যায় না। তারপর কথা উঠল, দেশের নাম কী হবে। আমি বললাম, ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ’। তাজউদ্দীন ভাইয়ের পছন্দ হলো। নামটি ঠিক করার সময় আমাদের মাথায় গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের কথা মনে হচ্ছিল।
এ সময় সরকারি কাগজপত্রে ব্যবহারের জন্য একটি মনোগ্রাম ঠিক করা দরকার। মনোগ্রাম আমাদেরকেই ঠিক করতে হবে। বর্তমানে বাংলাদেশের যে মনোগ্রাম সরকারি কাগজপত্রে ব্যবহৃত হচ্ছে, তা আমার হাতে আঁকা। চারপাশে গোলাকৃতি লালের মাঝখানে সোনালি রঙের মানচিত্র। মনোগ্রাম দেখে তাজউদ্দীন ভাই পছন্দ করলেন। পরে তা অনুমোদনও করেন। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে এটি তার প্রথম সরকারি অনুমোদন।’




