শান্তির আশায় যুদ্ধাস্ত্র
দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে, পারমাণবিক বোমা চান সাধারণ ইরানিরা

যুদ্ধের ক্ষত শুকায়নি। সামনে আবারও ধ্বংসের আশঙ্কা। বাঁচতে হবে, ঘুরে দাঁড়াতে হবে। দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া ইরানের সাধারণ মানুষ তাই চাইছে এমন এক অস্ত্র, যার নাম শুনলেই শিউরে ওঠে পৃথিবী। পারমাণবিক বোমা। যে অস্ত্র তৈরি না করার অঙ্গীকার কয়েক দশক ধরে রাষ্ট্রীয় নীতির ভিত্তি, এবার সেই অঙ্গীকারই ভাঙার দাবি উঠেছে মসজিদ থেকে সংসদে। যুক্তি একটাই— শত্রুকে ভয় দেখানোর শক্তি না থাকলে যুদ্ধের হাত থেকে মুক্তি নেই। অথচ শান্তির এই আকাঙ্ক্ষার মধ্যেই লুকিয়ে রয়েছে আরও ভয়ংকর সংঘাতের আশঙ্কা।
এর মধ্যেই ইউরোপকে ঘিরে নতুন হুঁশিয়ারি। ইরানের এক সংসদ সদস্য জানিয়েছেন, ইউরোপের সামরিক ঘাঁটি ব্যবহার করে আমেরিকা হামলা চালালে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রও সেখানে আঘাত হানবে। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গিয়ে তেহরান কি যুদ্ধের সীমানা আরও বিস্তৃত করতে চলেছে? আর প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খোমেনির পরমাণু অস্ত্রবিরোধী নীতি কি বদলে দেবেন তার উত্তরসূরি মোজতবা খোমেনি?
গত মঙ্গলবার নিউ ইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পরমাণু অস্ত্র তৈরির দাবি আর কট্টরপন্থীদের বিচ্ছিন্ন বক্তব্যে সীমাবদ্ধ নেই। মসজিদ থেকে রাজনৈতিক মহল— বিভিন্ন জায়গায় উঠছে সেই দাবি। পশ্চিমাঞ্চলীয় কুহদাশতে জুমার নামাজে ধর্মীয় নেতা আলি সেপাহভান্দ বলেছেন, আমেরিকার মোকাবিলায় ইরানকে পরমাণু অস্ত্রে সজ্জিত হতে হবে। উপস্থিত মুসল্লিদের স্লোগান ছিল, ‘পরমাণু প্রতিরোধ আমাদের অবিচ্ছেদ্য অধিকার’।
গত শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) তেহরানের ধর্মীয় নেতা মোহাম্মদ জাভাদ হাজ আলি আকবরি পরমাণুনীতি পুনর্বিবেচনাকে ‘জাতীয় দাবি’ বলেছেন। তার দাবি, আগের কিছু জরিপে ৭০ শতাংশের বেশি মানুষ নীতির পরিবর্তনের পক্ষে মত দিয়েছেন। যদিও জরিপের বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করেননি তিনি। সংসদ সদস্য মাহমুদ নাবাভিয়ান পরমাণু অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তি (এনপিটি) থেকে বেরিয়ে আসারও আহ্বান জানিয়েছেন।
২০১৫ সালে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, রাশিয়া, চীন ও জার্মানির সঙ্গে ঐতিহাসিক পরমাণু চুক্তি করেছিল ইরান। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, পরমাণু কর্মসূচিতে কঠোর সীমাবদ্ধতা আরোপের বিনিময়ে দেশটির ওপর থেকে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ২০১৮ সালে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একতরফাভাবে যুক্তরাষ্ট্রকে ওই চুক্তি থেকে প্রত্যাহার করে নেন। এরপর ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের মাত্রা বাড়তে থাকে। ২০২৫ সালে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয় দেশটির পরমাণু স্থাপনাগুলো। চলতি ফেব্রুয়ারিতে নতুন যুদ্ধের শুরুতে নিহত হন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খোমেনি। ক্ষমতায় আসেন তার ছেলে মোজতবা খোমেনি।
প্রয়াত খোমেনির ধর্মীয় নির্দেশনায় পরমাণু অস্ত্র তৈরি ও ব্যবহার নিষিদ্ধ ছিল। ইরান এখনো নিজের পরমাণু কর্মসূচিকে শান্তিপূর্ণ বলে দাবি করে। অথচ আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা প্রয়োজনীয় পরিদর্শন করতে না পারায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের বর্তমান অবস্থান পুরোপুরি যাচাই করতে পারছে না।
এর মধ্যেই গত বুধবার প্রকাশিত ইউরোনিউজের প্রতিবেদনে নতুন হুঁশিয়ারির বিষয়টি সামনে এসেছে। ইরানের সংসদীয় নিরাপত্তা কমিটির সদস্য আহমাদ বাখশায়েশ আরদেস্তানি বলেছেন, ‘আমেরিকা যদি ইতালি, জার্মানিসহ ইউরোপের ঘাঁটি ব্যবহার করে ইরানে হামলা চালায়, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রও ইউরোপের দিকে যাবে।’
তার বক্তব্য, আগের দুই যুদ্ধে এমন পদক্ষেপ না নিলেও এবার ছাড় দেওয়া হবে না। আরেক সংসদ সদস্য ফাদা হোসেইন মালেকি জানিয়েছেন, নতুন সংঘাতের জন্য ভিন্ন পরিকল্পনা প্রস্তুত রয়েছে। গতকাল বুধবার বিপ্লবী রক্ষীবাহিনীও ‘ভৌগোলিক সীমা ছাড়াই’ পাল্টা আঘাত হানার অঙ্গীকার করেছে। জার্মান দূতাবাসের বাইরেও ইউরোপকে সতর্ক করে ব্যানার টানানো হয়েছে।
তবে পরমাণু বোমা তৈরির দাবি মানেই সরকারি সিদ্ধান্ত নয়। জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের প্রধান মোহসেন রেজায়ি জানিয়েছেন, পরমাণুনীতি বদলের আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত হয়নি। মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে ওয়াশিংটনের সঙ্গে যোগাযোগও চলছে।
এখন তেহরানের সামনে দুটি বিপজ্জনক প্রশ্ন। পরমাণু বোমা কি যুদ্ধ ঠেকাবে? নাকি ইউরোপ পর্যন্ত প্রতিশোধের হুমকি নতুন যুদ্ধকে আরও কাছে টানবে? যে অস্ত্রকে নিরাপত্তার শেষ ভরসা ভাবা হচ্ছে, সেটিই কি শেষ পর্যন্ত নিরাপত্তাহীনতার সবচেয়ে বড় কারণ হয়ে উঠবে?



