ওপেক থেকে আমিরাতের বিদায়, নেপথ্যে সৌদি-পাকিস্তান ফ্যাক্টর

সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের সঙ্গে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ। ছবি: এএফপি
দীর্ঘ প্রায় ৬০ বছর পর তেল রপ্তানিকারক দেশগুলোর সংস্থা ‘ওপেক’ থেকে সরে গেল সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই)। এই সিদ্ধান্ত যতটা না ব্যবসায়িক, তার চেয়ে বেশি রাজনৈতিক। আবুধাবির এই পদক্ষেপ কেবল তেল জোট এবং এর অঘোষিত নেতা সৌদি আরবের জন্য বড় ধাক্কা নয়। একে রিয়াদের প্রতিরক্ষা অংশীদার পাকিস্তানের জন্যও অশনি সংকেত হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।
আবুধাবি ও রিয়াদের মধ্যে উত্তেজনা অনেকদিনের। ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর পাল্টে গেছে অনেক সমীকরণ। উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর তেহরানের হামলার কারণে সেই ফাটল কিছুটা চাপা পড়েছিল। কারণ দেশগুলোর স্বার্থ ছিল এক।
‘এই সীমাবদ্ধতার মধ্যে থাকতে মোটেও খুশি না আমিরাত। বিশেষ করে যখন তারা তেলের উৎপাদন বাড়াতে চেয়েছে তখন কমাতে চেয়েছে সৌদিরা।’ ফিনান্সিয়াল টাইমসকে বর্ণনা করছিলেন ইউরেশিয়া গ্রুপের মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক পরিচালক ফিরাস মাকসাদ।
সৌদি আরবের সঙ্গে পাকিস্তানের উত্তরোত্তর ঘনিষ্ঠতা এবং মধ্যপ্রাচ্য সংকটে ইসলামাবাদের ভূমিকার কারণে আমিরাত বেশ হতাশ। বিশেষ করে উপসাগরীয় অঞ্চলে হামলার জন্য তেহরানকে দায়ী করেনি আবুধাবী। তবে যুদ্ধে পাকিস্তানের মধ্যস্থতাকে ভালোভাবে নেয়নি তারা।
চ্যাথাম হাউসের অ্যাসোসিয়েট ফেলো নিল কুইলিয়ামের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিকে ওয়ান ওয়ে হিসেবেই দেখছে আমিরাত। তাদের দৃষ্টিতে এখানে নিরপেক্ষ থাকা বা মধ্যপন্থা নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। আপনি যদি মধ্যস্থতা করেন, তবে আপনি মাঝপথে আছেন বলে ধরে নেওয়া হয়। আর এ বিষয়টি পছন্দ করছে না আবুধাবী।
ওপেক ত্যাগে আমিরাতের সুবিধা
ওপেকের তৃতীয় বৃহত্তম উৎপাদক হিসেবে ১৯৬৭ সালে এই জোটে যোগ দেয় আমিরাত। কিন্তু ওপেকের উৎপাদন কোটা বরাবরই নিয়ন্ত্রণ করত সৌদি। তাই বেশি পরিমাণে তেল রপ্তানিতে বাধা পেত আমিরাত। ওপেক থেকে বেরিয়ে আসায় এখন থেকে স্বাধীনভাবে তেল উৎপাদন করতে পারবে আবুধাবি। সেইসঙ্গে দীর্ঘমেয়াদী মুনাফা নিশ্চিত করতে পারবে দেশটি।
এছাড়া এই সিদ্ধান্তকে সৌদি আরবের মর্যাদাহানি হিসেবেও দেখা হচ্ছে। কারণ এতে তেলের দাম নিয়ন্ত্রণে রিয়াদের একক আধিপত্য শেষ হবে। পাশাপাশি ওপেকের দীর্ঘদিনের সমালোচক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়তেও আমিরাতকে সাহায্য করবে এই পদক্ষেপ।
সৌদি আরবের জন্য ধাক্কা
আমিরাতের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান অ্যাডনকের তথ্য অনুযায়ী, ওপেক ছাড়ায় ২০২৭ সালের মধ্যে আবুধাবির অপরিশোধিত তেল উৎপাদন দৈনিক ৩৪ লাখ ব্যারেল থেকে বেড়ে ৫০ লাখ ব্যারেলে পৌঁছাবে। যুদ্ধের কারণে কয়েক দশকের মধ্যে সর্বনিম্নে পৌঁছেছে ওপেকের মোট উৎপাদন। এমন পরিস্থিতিতে আমিরাতের এককভাবে চলার সিদ্ধান্ত জোটের সংহতিকে আরও দুর্বল করে তুলবে। এমনটা ভাবছেন বিশ্লেষকরা।
পাকিস্তান ফ্যাক্টর ও আঞ্চলিক মেরুকরণ
ওপেক ছাড়ার আগেই প্রভাব খাটাতে শুরু করেছে আমিরাত। চলতি মাসের শুরুর দিকে পাকিস্তানের কাছে জমা রাখা ৩৫০ কোটি ডলার ফেরত নিয়েছে আবুধাবী। যা ইসলামাবাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের পাঁচ ভাগের এক ভাগ। এটি ইরানের ইস্যুতে পাকিস্তানের নিরপেক্ষ অবস্থানের প্রতি আমিরাতের অসন্তুষ্টিরই বহিঃপ্রকাশ। পরিস্থিতি সামাল দিতে তখন পাকিস্তানের পাশে দাঁড়াতে হয় সৌদির।
বিশ্লেষকদের মতে, এখন পাকিস্তান, তুরস্ক এবং মিসরের সঙ্গে অনেক বেশি জোটবদ্ধ রিয়াদ। এটি আমিরাতের স্বার্থের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
ফিনান্সিয়াল টাইমসকে কুইলিয়াম জানান, সৌদি-পাকিস্তান ক্রমবর্ধমান ঘনিষ্ঠতাকে স্বার্থের জন্য বাধা হিসেবে দেখছে আবুধাবি। ওপেক ছাড়ার মাধ্যমে আমিরাত কেবল মার্কিন সমর্থনই নিশ্চিত করতে চায় না, বরং সৌদি-পাকিস্তান জোটের বলয়ও ভাঙতে চায়।
ভারতের জন্য সুসংবাদ
আমিরাত ওপেক ছাড়ার কারণে বৈশ্বিক বাজারে তেলের সরবরাহ বাড়বে এবং দাম কমবে। এটি ভারতের মতো বড় আমদানিকারক দেশের জন্য বড় স্বস্তি। এর ফলে ভারতের আমদানি খরচ কমবে এবং মূল্যস্ফীতির চাপ হ্রাস পাবে।
গ্রান্ট থর্নটন ভারতের পার্টনার সৌরভ মিত্রের মতে, মধ্যমেয়াদী এই সরবরাহ বৃদ্ধি ভারতের অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক প্রভাব বয়ে আনবে।





