লেবাননে যুদ্ধবিরতির খবরে ইসরায়েলজুড়ে ‘হতাশা’

ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। ফাইল ছবি
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় লেবাননে যুদ্ধবিরতি হওয়ায় হতাশ হয়ে পড়েছেন ইসরায়েলিরা। তারা নিজেদের ভাবছেন প্রতারিত। এই প্রতারণা করেছে তাদের নিজ দেশের সরকার।
এর আগে ওয়াশিংটনে আলোচনার পর যুদ্ধবিরতিতে পৌঁছায় ইসরায়েল ও লেবানন। গতকাল বৃহস্পতিবার এ ঘোষণা দেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
যুক্তরাষ্ট্রের পূর্বাঞ্চলীয় সময় বিকাল ৫টা থেকে (বাংলাদেশ সময় রাত ৩টা) আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর হয় ১০ দিনের এ যুদ্ধবিরতি।
উভয় দেশের মধ্যে ‘স্থায়ী শান্তি’ প্রতিষ্ঠায় কাজ করতে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওকে নির্দেশ দেন ট্রাম্প।
যুদ্ধবিরতির খবরে রাজধানী বৈরুতসহ লেবাননজুড়ে বইছে খুশির জোয়ার। মধ্যরাতে বৈরুতের রাজপথে জাতীয় পতাকা হাতে মিছিল করেছেন অনেক লেবানিজ।
উল্টোচিত্র দেখা গেছে ইসরায়েলে, বিশেষ করে উত্তর ইসরায়েলে। এ অঞ্চলটিতে সবচেয়ে বেশি হামলা করেছে ইরান-সমর্থিত লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ।
ইসরায়েলের উত্তরাঞ্চলের বাসিন্দারা লেবাননের সঙ্গে যুদ্ধবিরতির ঘটনায় প্রচণ্ড হতাশ বলে মন্তব্য করেছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক আবেদ আবু শাহেদাহ।
তার দাবি, প্রথমত, ইসরায়েলিরা অবাক যে হিজবুল্লাহ যুদ্ধবিরতির শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত পূর্ণ সামরিক সক্ষমতা বজায় রেখে চালিয়ে যেতে পেরেছে লড়াই।
দ্বিতীয় কারণ, ইসরায়েল সরকার তাদের যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, তা যুদ্ধবিরতি নয়, যোগ করেন শাহেদাহ।
এ রাজনৈতিক বিশ্লেষকের ভাষ্য, চূড়ান্ত বিজয়ের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল উত্তরাঞ্চলীয় ইসরায়েলিদের। তাদের বলা হয়েছিল, ইসরায়েল পুরো দক্ষিণ লেবাননকে পরিণত করবে একটি বাফার জোনে (নিরপেক্ষ অঞ্চল)। কিন্তু সেটি করতে পারেনি ইসরায়েলের সামরিক বাহিনী।
এই যুদ্ধবিরতি অনেক ইসরায়েলির মধ্যে এই ধারণাকেও জোরদার করেছে, নিজেদের সরকারই তাদের সঙ্গে করছে মিথ্যাচার, দাবি রাজনৈতিক বিশ্লেষক শাহেদাহ’র।
এই বিশ্লেষকের জোর দাবি, ইসরায়েলিরা এমন একটা ধারণাও করছে যে, মার্কিন-ইরান যুদ্ধবিরতি চুক্তি প্রসঙ্গে তাদের সত্য বা সবকিছু বলা হয়নি।
লেবাননের যুদ্ধবিরতির নিন্দা জানিয়েছেন ইসরায়েলি বিরোধীদলীয় নেতা ইয়ার লাপিদ। তিনি বলেছেন, লেবাননের এই সংঘাতের অবসান কেবল একটি পথেই হতে পারে। আর তা হচ্ছে উত্তরাঞ্চলীয় বসতিগুলোর ওপর থেকে হুমকি স্থায়ীভাবে দূর করা।
ইসলামাবাদের মধ্যস্থতায় সাময়িক যুদ্ধবিরতির প্রথম থেকেই তেহরান ও পাকিস্তানের দাবি, যুদ্ধবিরতির আওতায় অন্তর্ভুক্ত লেবাননও।
ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর কার্যালয় তখনই এ দাবির বিরুদ্ধে দেয় বিবৃতি। এরপর এ যুদ্ধের সবচেয়ে ভয়াবহ হামলা চালানো হয় লেবাননজুড়ে। এতে নিহত হন আড়াইশর বেশি মানুষ। পরবর্তী সময়েও হামলা অব্যাহত রাখে তেল আবিব। পরে লেবানন ছাড়াই যুদ্ধবিরতি হয়েছে বলে জানান ডোনাল্ড ট্রাম্প ও রিপাবলিকান প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তারা।
যুদ্ধবিরতির প্রথম থেকেই লেবাননে শান্তি ছাড়া কোনো চুক্তি হবে না বলে সাফ জানিয়ে দেয় তেহরান। এমনকি গত শনিবারে ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত যুদ্ধবিরতির আলোচনায় ওয়াশিংটনের কাছে তেহরানের অন্যতম দাবি ছিল এটি।
২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে হামলা চালায় ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র। তেহরান এর জবাব দিলে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ে পুরো মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে। মার্চের শুরুতে ইরানের সমর্থনে ইসরায়েলি হামলা শুরু করে হিজবুল্লাহ। এর প্রতিক্রিয়ায় দক্ষিণাঞ্চলসহ পুরো লেবাননজুড়ে নির্বিচার হামলা চালাতে থাকে ইসরায়েলি বাহিনী।
এই যুদ্ধে কিছুটা বিরতি আসে গতকাল বৃহস্পতিবার কার্যকর হওয়া যুদ্ধবিরতির মাধ্যমে। যুদ্ধবিরতি শুরুর এক ঘণ্টার মধ্যেই ইসরায়েলের বিরুদ্ধে তা লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলেছে লেবানন।
দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পরও দক্ষিণ লেবাননের খিয়াম ও দিব্বিনে হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল। পশ্চিম বেকা উপত্যকার রাশায়া অঞ্চল এবং জাবাল আল-শেইখের পশ্চিম ঢালজুড়ে তৎপরতা বৃদ্ধি পেয়েছে ইসরায়েলি নজরদারি বিমানের।
মার্চের শুরু থেকে ইসরায়েলি হামলায় এ পর্যন্ত অন্তত ২ হাজার ১৯৬ জন বা তার বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছ লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। আহত হয়েছেন ৭ হাজারের বেশি। এই সংঘাতে বাস্তুচ্যুত হয়েছেন ১০ লাখের বেশি লেবানিজ।
সূত্র: আলজাজিরা



