অস্ত্র নির্মাতা, এআই প্রযুক্তিসহ ইরান যুদ্ধে সুবিধাভোগী যারা

নিউ ইয়র্ক স্টক এক্সচেঞ্জ। ছবি: এপি
কারো পৌষ মাস তো কারো সর্বনাশ। যুদ্ধে একদিকে হতাহত, ধ্বংস ও লাশের সারি দেখছে ইরান। অপরদিকে বিশ্ব ভুগছে জ্বালানি, রপ্তানি বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সঙ্কটে। একই যুদ্ধে আবার লাভবান কিছু প্রতিষ্ঠান, গোষ্ঠী ও বিভিন্ন খাত।
ইরান-ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের কারণে চলতি বছরের বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৩ থেকে কমিয়ে ৩ দশমিক ১ শতাংশ ঘোষণা করেছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। যুদ্ধ এবং হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকাকেই বৈশ্বিক অর্থনীতির এই অবনতির মূল কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে সংস্থাটি।
যুদ্ধের ফলে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি অবকাঠামোর। পাশাপাশি প্রণালি বন্ধের জবাবে মার্কিন নৌ-অবরোধের কারণে বন্দরে আটকে আছে তেল, গ্যাস, রাসায়নিক ও সারের মতো গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানি পণ্য।
তবে প্রতিটি অর্থনৈতিক সংকটেরই কিছু সুবিধাভোগী থাকে। সামষ্টিক অর্থনীতির হতাশাজনক পরিস্থিতি সত্ত্বেও বৈশ্বিক অর্থনীতির কিছু খাত এই অনিশ্চয়তাকে কাজে লাগিয়ে বেশ ভালো করছে।
এমন অন্তত পাঁচটি শিল্প আছে, যারা পরিস্থিতির কারণে বা পরিস্থিতি সত্ত্বেও দেখছে লাভের মুখ।
ওয়াল স্ট্রিটের বিনিয়োগ
গত বছর ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদ শুরুর পর থেকেই এক অস্থির পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীরা। ট্রাম্পের খামখেয়ালি সিদ্ধান্ত ব্যবসায়ীদের মাঝে ‘ট্যাকো ট্রেড’ শব্দটির জন্ম দিয়েছে। এর পূর্ণরূপ হলো— ‘ট্রাম্প অলওয়েজ চিকেনস আউট’। কারণ তিনি একদিন চরমপত্র দেন তো পরদিনই তা বদলে ফেলেন।
মর্নিংস্টার রিসার্চ সার্ভিসেসের ইক্যুইটি রিসার্চ ডিরেক্টর শন ডানল্যাপের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে এই অস্থিরতা বিনিয়োগকারীদের উদ্বিগ্ন করলেও বিনিয়োগ ব্যাংকগুলোর জন্য হয়েছে আশীর্বাদ। কারণ বাণিজ্যের পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় তারা কমিশন ও রাজস্ব বাবদ আয় করছে লাখ লাখ ডলার।
‘গ্রাহকরা তাদের পুঁজি নতুন করে সাজাতে চান। তাই তারা ঘন ঘন লেনদেন করেন। এতে ব্যাংকগুলোর মতো মুনাফা বাড়ে মধ্যস্থতাকারীদের,’ আলজাজিরাকে বলছিলেন তিনি।
২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকের ফলাফলে দেখা গেছে, মরগান স্ট্যানলি ৫.৫৭ বিলিয়ন ডলার লাভ করেছে। গত বছরের তুলনায় এটি ২৯ শতাংশ বেশি। গোল্ডম্যান স্যাকস লাভ করেছে ৫.৬৩ বিলিয়ন ডলার, যা ১৯ শতাংশ বেশি।
জেপি মরগান চেজের আয়ও ১৩ শতাংশ বেড়ে ১৬.৪৯ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। এই ব্যাপক মুনাফার পেছনে উচ্চমাত্রার লেনদেন এবং শক্তিশালী গ্রাহক সম্পৃক্ততাকে প্রধান কারণ হিসেবে দেখিয়েছে ব্যাংকগুলো।
তবে এর ভবিষ্যৎ নিয়ে সতর্কতাও দিয়েছেন ডানল্যাপ। এ সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে সুদিন ফোরাতে পারে ব্যাংকগুলোর। কারণ বিনিয়োগকারীরা হয়ে যাবেন আরও অতিরিক্ত সতর্ক। লেনদেনের জন্য ঋণ নিতেও থাকবে না তাদের আগ্রহ।
প্রেডিকশন মার্কেট
ওয়াল স্ট্রিটের ব্যাংকগুলো যখন মুনাফা লুটছে, তখন ক্রিপ্টোভিত্তিক প্রেডিকশন প্ল্যাটফর্ম ‘পলিমার্কেট’ মাসের শুরু থেকে প্রতিদিন আয় করছে ১০ লাখ ডলারের বেশি। কারণ এই মার্কেটে ব্যবহারকারীরা খেলাধুলা থেকে শুরু করে নির্বাচন— সবকিছুর ওপর বাজি ধরতে পারেন। যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই পলিমার্কেট ভালো করছিল, তবে ৩০ মার্চ তারা তাদের ফি বা মাশুলের কাঠামো পরিবর্তন করে জনপ্রিয়তাকে আরও বেশি অর্থ উপার্জনে রূপান্তর করেছে।
কালশি, নভিগ এবং রবিনহুডের মতো প্রতিদ্বন্দ্বী প্ল্যাটফর্মগুলো একই ব্যবসায়িক মডেলে চললেও ২০২৬ সালে পলিমার্কেটই অপ্রতিদ্বন্দ্বী বিজয়ী। কারণ তারা বিতর্কিতভাবে ইরান যুদ্ধের মতো সংঘাতের ফলাফলের ওপর বাজি ধরার সুযোগ দিচ্ছে।
তথ্য বিশ্লেষণকারী ওয়েবসাইট ডেফিলামা জানিয়েছে, ১ এপ্রিল থেকে এই প্ল্যাটফর্মটি ফি বাবদ আয় করেছে ২১ মিলিয়ন ডলারের বেশি। অথচ পুরো মার্চ মাসে এই আয় ছিল ১১.৬ মিলিয়ন এবং ফেব্রুয়ারিতে ছিল মাত্র ৬.২৩ মিলিয়ন ডলার। এভাবে চললে শুধু ফি থেকেই এ বছর পলিমার্কেটের আয় হতে পারে ৩৪২ মিলিয়ন ডলার।
অ্যারোস্পেস ও প্রতিরক্ষা
ইউক্রেন, ইরান, সুদান, গাজা, লেবাননের যুদ্ধ এবং বৈশ্বিক প্রতিরক্ষা ব্যয় বৃদ্ধির কারণে অ্যারোস্পেস ও প্রতিরক্ষা শিল্প এ বছর তুঙ্গে থাকাটাই স্বাভাবিক।
আইএমএফের এপ্রিলের রিপোর্ট অনুযায়ী, বিশ্বের প্রায় অর্ধেক দেশ তাদের সামরিক বাজেট বাড়িয়েছে গত পাঁচ বছরে। এর ফলে ড্রোন থেকে শুরু করে মিসাইল— সবকিছুর চাহিদা এখন আকাশচুম্বী। বিশেষ করে ইউরোপে এই চাহিদা দ্রুত বাড়ছে, যেখানে ন্যাটো দেশগুলো ২০৩৫ সালের মধ্যে তাদের জিডিপির ৫ শতাংশ প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয়ের অঙ্গীকার করেছে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই)
জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংস্থা গত বছর পূর্বাভাস দিয়েছিল, ২০২৩ সালে ১৮৯ বিলিয়ন ডলারের এই শিল্প ২০৩৩ সাল নাগাদ ৪.৮ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছাবে। ইরান যুদ্ধ এই ধারায় কোনো ছেদ ঘটাতে পারেনি।
ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের প্রধান বিশ্লেষক নিক মারোর মতে, ইরান যুদ্ধের ধাক্কা সত্ত্বেও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির মতো খাতগুলো এখনো বেশ স্থিতিশীল।
পূর্ব এশিয়া থেকে সেমিকন্ডাক্টর চিপ রপ্তানির উচ্চ হারকে তিনি এই খাতের প্রবৃদ্ধির অন্যতম মাপকাঠি হিসেবে দেখছেন। তালিকার শীর্ষে রয়েছে তাইওয়ান। ইআইইউর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, মার্চ মাসে তারা রেকর্ড ৮০.২ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে, যা গত বছরের চেয়ে ৬১.৮ শতাংশ বেশি।
এই প্রবৃদ্ধির মূলে ছিল যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি, যা বছরে ১২৪ শতাংশ বেড়েছে। বিশ্বের শীর্ষ চিপ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান টিএসএমসি জানিয়েছে, ২০২৬ সালের প্রথম তিন মাসে তাদের নিট আয় হয়েছে ১৮.১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।
নবায়নযোগ্য জ্বালানি
ইরান যুদ্ধ শুধু পরিবেশগত কারণে নয়, বরং মনে করিয়ে দিয়েছে জ্বালানি নিরাপত্তার প্রয়োজনেও জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে সরে আসার গুরুত্ব। করোনা মহামারি ও ২০২২ সালে ইউক্রেন আক্রমণের পর এই যুদ্ধ চলতি দশকের তৃতীয় বড় জ্বালানি বিপর্যয়।
আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা জানিয়েছে, যুদ্ধ শুরুর আগেই বিভিন্ন দেশের সরকার ভূ-রাজনৈতিক কারণে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে নিয়েছিল বিনিয়োগের পদক্ষেপ। ১৫০টি দেশ গ্রহণ করেছে নবায়নযোগ্য ও পারমাণবিক শক্তি প্রসারে সক্রিয় নীতি। ৩২টি দেশ খনিজসম্পদ ও পরিচ্ছন্ন জ্বালানির সরবরাহব্যবস্থা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা দিচ্ছে।
ইরান যুদ্ধ এশিয়ায় নীতিনির্ধারণের এক নতুন ঢেউ তুলেছে। সাধারণত হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাওয়া তেল ও গ্যাসের ৮০ থেকে ৯০ শতাংশই ক্রয় করে এশীয় দেশগুলো। প্রণালি বন্ধ হওয়ার পর থেকে অঞ্চলটি জ্বালানির বিকল্প উৎস খুঁজতে হিমশিম খাচ্ছে। রেশনিং ও দাম নির্ধারণের মতো জরুরি পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হচ্ছে দেশগুলো।
সোলার প্যানেলে কর ছাড় থেকে শুরু করে নতুন নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্প, এমনকি পারমাণবিক চুল্লি পুনরায় চালু করার মতো নানা ঘোষণা দিয়েছে কয়েকটি দেশ। এই তালিকায় আছে দক্ষিণ কোরিয়া, থাইল্যান্ড, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, ভিয়েতনাম ও ফিলিপাইন।
নীতিমালার এই জোয়ার সুসংবাদ বয়ে এনেছে নবায়নযোগ্য শিল্প খাতে। এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল ক্লিন এনার্জি ট্রানজিশন ইনডেক্সের তথ্য অনুযায়ী গত এক বছরে এই খাতের প্রবৃদ্ধি ৭০.৯২ শতাংশ।

