টানা সপ্তম দিনে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র পাল্টাপাল্টি হামলা, নিহত ৩

সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফুজাইরাহতে ৩ মার্চ ইরানের হামলায় আগুন লেগে যায়। ছবি : রয়টার্স
শুক্রবার রাতভর ইরানের বিভিন্ন স্থানে তীব্র বিমান হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এতে কমপক্ষে তিনজন নিহত হয়েছেন। জবাবে, মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন মার্কিন ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা করেছে তেহরান।
শনিবার ভোরে সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, মার্কিন সামরিক বাহিনী ইরানের বিরুদ্ধে টানা সপ্তম রাতের হামলা শেষ করেছে।
ইরানের সংবাদমাধ্যমের বরাতে জানা গেছে, মার্কিন বিমান হামলায় মধ্যাঞ্চলীয় শহর ইয়াজদ ও দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর লার, আহভাজ, সিরিক, বুশেহর, বন্দর আব্বাস ও দারাবে বিস্ফোরণের খবর পাওয়া গেছে।
হরমুজ প্রণালির কাছাকাছি কেশম দ্বীপেও টানা আরও এক রাত ধরে বিস্ফোরণ ঘটেছে।
হরমোজগান প্রদেশের স্থানীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, মার্কিন বিমান হামলায় প্রদেশটির দুটি সেতু ও একটি সুড়ঙ্গ লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে।
হরমোজগানের ডেপুটি গভর্নর বলেছেন, শনিবার ভোররাতে প্রদেশজুড়ে বিভিন্ন স্থানে ‘শত্রু’ বাহিনীর হামলায় তিনজন নিহত ও আটজন আহত হয়েছেন।
সেন্টকম বিবৃতিতে বলেছে, সর্বেশেষ হামলাটির ধাপটি শুক্রবার রাত সাড়ে ৯টায় শুরু হয়ে রাত দেড়টায় শেষ হয়েছে।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, সর্বাধিনায়কের নির্দেশে সেন্টকম ইরানের বন্দরগুলোর বিরুদ্ধে নৌ অবরোধ সম্পূর্ণরূপে বলবৎ রেখেছে। মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে ৫০ হাজারেরও বেশি মার্কিন সেনা সদস্য কর্মরত আছেন এবং তারা সতর্ক ও প্রস্তুত রয়েছেন।
এদিকে,ইরানের নৌবাহিনী ও ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে থাকা মার্কিন সামরিক স্থাপনায় প্রতিশোধমূলক হামলার কথা জানিয়েছে।
আইআরজিসি জানিয়েছে, তারা জর্ডানে মোতায়েন মার্কিন যুদ্ধবিমানগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করেছে।
বাহিনীটির ঘনিষ্ঠ ইরানি সংবাদ সংস্থা তাসনিম জানিয়েছে, ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র মুওয়াফফাক সালতি বিমানঘাঁটিতে সফলভাবে আঘাত হেনেছে।
আরব গণমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, জর্ডানে মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে বিস্ফোরণের শব্দ এতটাই জোরালো ছিল যে তা ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড থেকেও শোনা গেছে।
জর্ডানের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, শনিবার ভোরে দেশটির আকাশসীমায় ১০টি ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র তাদের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা প্রতিহত করে ভূপাতিত করেছে।
সেনাবাহিনী জানিয়েছে, দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং জননিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য প্রচলিত প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা অনুযায়ী এই অভিযানটি চালানো হয়েছে।
এই প্রতিরোধ অভিযানগুলোতে কোনো হতাহত বা বস্তুগত ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি এবং রয়্যাল ইঞ্জিনিয়ার্স ইউনিটগুলো ইতোমধ্যে আঘাতপ্রাপ্ত স্থানগুলো থেকে ধ্বংসাবশেষ অপসারণ ও সুরক্ষিত করার কাজ শুরু করেছে বলেও জানানো হয়েছে।
ইরানের সামরিক বাহিনী মধ্যপ্রাচ্যের আরেক দেশ বাহরাইনে মার্কিন সামরিক সরঞ্জাম ও জ্বালানি ট্যাংক লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয়েছে বলে জানিয়েছে।
সেনাবাহিনীর এক বিবৃতি অনুসারে, বাহরাইনে একটি মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় মার্কিন সামরিক সরঞ্জাম ও জ্বালানি ট্যাংক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
বিবৃতিতে ইরানের সামরিক বাহিনী দাবি করেছে, আধিপত্যবাদের জবাবে তারা শেখ ইসা ঘাঁটির বিমান হ্যাঙ্গার ও পার্কিং লট, জ্বালানি ট্যাংক এবং বাহরাইনের বেশ কয়েকটি যোগাযোগ সেতুকে লক্ষ্যবস্তু করেছে।
এতে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ঘাঁটিটি ব্যবহার করে আঞ্চলিক লক্ষ্যবস্তু, বিশেষ করে আমাদের দেশের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়েছে।
বাইরাইনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আজ ভোর থেকে শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র হামলার সতর্কতায় সাইরেন বাজানোর কথা জানিয়েছে।
তাসনিমের প্রতিবেদন অনুসারে, আইআরজিসির স্থলবাহিনী কুয়েতের ক্যাম্প আরিফজানে অবস্থিত একটি মার্কিন সামরিক রসদ কেন্দ্রে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে এবং সেখানকার কর্মীদের হতাহতের ঘটনা ঘটিয়েছে বলে দাবি করেছে।
একইসঙ্গে, আইআরজিসি দাবি করেছে যে তারা কুয়েতে অবস্থিত মার্কিন আলি আল সালেম বিমান ঘাঁটিতে হামলা চালিয়েছে এবং এর রাডার ব্যবস্থা অকার্যকর করে দিয়েছে। জানা গেছে, এই অভিযানে ওই ঘাঁটির একটি অস্ত্র রক্ষণাবেক্ষণ হ্যাঙ্গার এবং একটি ড্রোন স্থাপনাতেও আঘাত হেনে তা ধ্বংস করা হয়েছে।
কুয়েতের সেনাবাহিনী জানিয়েছে, তারা ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার জবাব দিচ্ছে এবং জনসাধারণকে কর্তৃপক্ষের নিরাপত্তা ও সুরক্ষা নির্দেশাবলী মেনে চলার আহ্বান জানিয়েছে।
গত কয়েক ঘণ্টার মধ্যে এই নিয়ে তৃতীয়বারের মতো কুয়েতি সেনাবাহিনী শত্রুপক্ষের হামলা প্রতিহত করার কথা জানাল।
সর্বশেষ বিবৃতিতে আইআরজিসি মার্কিন সামরিক বাহিনীকে আশ্রয়দানকারী দেশগুলোকে উপযুক্ত জবাবের জন্য প্রস্তুত থাকতে সতর্ক করেছে।
আইআরজিসি সতর্ক করেছে, এ দেশগুলো যেন তাদের নাগরিকদের সুরক্ষার জন্য বেসামরিক প্রতিরক্ষা ইউনিটগুলোকে সক্রিয় করে এবং সম্ভাব্য সামরিক লক্ষ্যবস্তু থেকে তাদের সরিয়ে নেয়।
বাহিনীটির দাবি, দেশগুলোর ভূখণ্ড ইরানের বিরুদ্ধে আগ্রাসনের উৎক্ষেপণ কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
আঞ্চলিক সংঘাত বেড়ে যাওয়ায় মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর মধ্যপ্রাচ্য ভ্রমণে আমেরিকানদের বাড়তি সতর্কতা অবলম্বনের আহ্বান জানিয়েছে।
মার্কিন দপ্তর সতর্ক করেছে, মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনার কারণে নিরাপত্তা পরিস্থিতি জটিল আকার নিয়েছে এবং অপ্রত্যাশিতভাবে পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার সম্ভাবনা আছে, যার ফলে নাগরিকদের তাদের ভ্রমণ পরিকল্পনা পুনর্বিবেচনা করার জন্য জোরালো সুপারিশ করা হয়েছে।
এতে উল্লেখ করা হয়েছে, আমেরিকানদের মধ্যপ্রাচ্যে ভ্রমণ বা এর মধ্য দিয়ে যাওয়ার বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করা উচিত।
সূত্র : আলজাজিরা




