তালেবান শাসনে নারীদের দমবন্ধ দিনলিপি
খোলা আকাশও যেন বদ্ধ খাঁচা, নিঃশ্বাসটাও আসে লুকিয়ে!

সংগৃহীত ছবি
‘নারীকে আপন ভাগ্য জয় করিবার কেন নাহি দিবে অধিকার? এক শতাব্দীরও বেশি সময় পরে রবি ঠাকুরের সেই প্রশ্নই যেন নতুন করে ফিরে আসে আফগানিস্তানের দিকে তাকালে। কারণ সেখানে আজ নারীদের শুধু অধিকারই সংকুচিত হয়নি, সংকুচিত হয়েছে তাদের অস্তিত্বের পরিসরও। যে আকাশ সবার জন্য খোলা থাকার কথা, সেটিই যেন তাদের জন্য বদ্ধ খাঁচা হয়ে উঠেছে। বাজারে যেতে ভয়, পথে চলতে ভয়, একা যাতায়াতে ভয়, এমনকি বসন্তের ফুল দেখতে বা নদীর ধারে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে নিঃশ্বাস নিতেও ভয়। তালেবান-শাসিত আফগানিস্তানের বহু নারীর কাছে জীবন এখন এমন এক বাস্তবতা, যেখানে স্বাভাবিক জীবনের চেয়ে আতঙ্ক বেশি পরিচিত।
একটি সমাজকে কতটা বদলে দেওয়া যায়? একটি রাষ্ট্র কতদূর পর্যন্ত মানুষের ব্যক্তিগত জীবনে প্রবেশ করতে পারে? আর একজন নারীকে কতটা ভয় দেখানো সম্ভব, যাতে সে নিজের ছায়াকেও সন্দেহ করতে শুরু করে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর লুকিয়ে আছে আফগানিস্তানের দুই শহরে— হেরাত ও ফয়জাবাদে। দুই নারীর অভিজ্ঞতায়। দুই ভিন্ন ঘটনার মধ্যে। অথচ শেষ পর্যন্ত দুটি গল্পই গিয়ে মিশে যায় একই বাস্তবতায়, সেটি হলো ভয়।
হেরাতের সেই শুক্রবার বিকালের কথা। খবর ছড়িয়ে পড়েছে, তালেবান প্রশাসন নতুন করে হিজাববিধি কঠোরভাবে কার্যকর করবে। যারা নির্ধারিত পোশাক পরবে না, তাদের গ্রেপ্তার করা হতে পারে। খবরটি ছড়িয়ে পড়তেই এক তরুণীর পরিবার তাকে চাদর নামাজ কিনে আনার জন্য বাজারে যেতে বলে। কিন্তু সেই মুহূর্তে তার মনে যে প্রশ্নটি জেগেছিল, সেটি ছিল নির্মম। চাদর নামাজ ( chador e namaz) কিনতে যাওয়ার আগে যদি তার কাছে চাদর না থাকে, তাহলে তাকে কি গ্রেপ্তার করা হবে? তার হাত কাঁপছিল। পা কাঁপছিল। ভয় কখনো কখনো দৃশ্যমান হয় না, কিন্তু শরীর তাকে লুকিয়ে রাখতে পারে না।
মায়ের সঙ্গে সে বেরিয়ে পড়ে। যে বাজারে সাধারণত শুক্রবারে নারী ও কিশোরীদের ভিড় থাকে, যেখানে শিশুরা খেলতে যায়, পরিবারগুলো ঘুরতে যায়, নারীরা পোশাক কেনেন, রাস্তার ধারের খাবার খান- সেই বাজার যেন এক বিকালে নিজের চেহারা বদলে ফেলেছে। নারী নেই। তরুণী নেই। হাসি নেই। শুধু পুরুষদের চোখ। তার মনে হচ্ছিল, চারদিকের মানুষ যেন তাকে দেখছে। যেন সে একজন অপরাধী। তার কানে ভেসে আসে একটি মন্তব্য- ‘নির্লজ্জদের জেলে পাঠানো উচিত। অপেক্ষা করো, ওদের নিয়ে যাওয়া হবে।’
সে মায়ের আড়ালে নিজেকে লুকিয়ে ফেলে। মা-মেয়ে দোকান থেকে দোকানে ঘুরে চাদর খুঁজছিলেন। হঠাৎ তারা একটি ঠেলাগাড়িতে অনেকগুলো চাদর দেখতে পান। দ্রুত সেদিকে এগিয়ে যান। ঠিক তখনই সেখানে এসে থামে সৎগুণ প্রচার ও অসৎ কাজ প্রতিরোধ মন্ত্রণালয়ের (Ministry for the Promotion of Virtue and the Prevention of Vice) একটি গাড়ি। এক মুহূর্তে পরিস্থিতি বদলে যায়। মা মেয়েকে টেনে নিয়ে গিয়ে নারীদের গয়না বিক্রি করা একটি ঠেলাগাড়ির আড়ালে লুকিয়ে ফেলেন। রঙিন কাপড়ের আড়ালে বসে থাকা মেয়েটির মাথার মধ্যে তখন একটি চিন্তাই ঘুরছিল- তারা এসেছে। তারা নারীদের ধরে নিয়ে যাবে। বিশেষ করে যাদের গায়ে চাদর নেই। কয়েক মিনিট? নাকি কয়েক ঘণ্টা? ভয় সময়কে বিকৃত করে দেয়।
অবশেষে মায়ের ডাক শোনা যায়। পর্দা সরিয়ে মাথা তুলতেই একটি কালো ফুলেল চাদর এসে পড়ে তার মাথার ওপর। পরে সে লিখেছে, যেন আকাশ থেকে কোনো ফেরেশতা নেমে এসে তাকে ঢেকে দিয়েছে। স্বস্তি এসেছিল। কিন্তু স্বাধীনতা নয়। কারাগার থেকে বেঁচে যাওয়ার স্বস্তি। বাজার থেকে বের হওয়ার সময়ও তাদের রেহাই মেলেনি। একজন তালিবান সদস্য পথ আটকে দাঁড়ায়। কোথায় যাচ্ছেন? মেয়ে কে? বাড়ি কোথায়? কেন এত তাড়া? মেয়েকে বাঁচাতে মা ভুল ঠিকানা বলে দেন। বাড়ি ফিরে গিয়েও ভয় কাটেনি। জানালার ফাঁক দিয়ে গলির দিকে দেখতে থাকেন। কারণ যদি তারা অনুসরণ করে এসে থাকে? যদি দরজায় কড়া নাড়ে?
পরদিন সকালেই সেই তরুণী- আভা নিখইয়ার (ছদ্মনাম) আবার বের হন। কারণ তিনি একজন স্বাধীন নারী সাংবাদিক। তিনি দেখতে চেয়েছিলেন, শুধু তার সঙ্গে নয়, তার দেশের অন্য নারীদের সঙ্গেও কী ঘটছে। হেরাতের ৬৪-মিটার এলাকার বাজারে গিয়ে তিনি যা দেখলেন, তা ছিল আরও ভয়াবহ। একজন নারীও নেই। যে শহর নারীদের পদচারণায় অভ্যস্ত ছিল, সেখানে যেন হঠাৎ অর্ধেক মানুষ অদৃশ্য হয়ে গেছে। একটি শেয়ারড ট্যাক্সিতে উঠে তিনি কয়েকজন নারীর কথা শুনতে পান। সবাই চাদর নামাজ ও মুখোশে ঢাকা। সবাই ক্ষুব্ধ। কেউ কেউ তালেবানকে অভিশাপ দিচ্ছেন। এক নারী বলে ওঠেন, আমাদের জীবন্ত কবর দেওয়া হয়েছে। সম্ভবত সমকালীন আফগানিস্তানের সবচেয়ে শক্তিশালী বর্ণনা এই একটিমাত্র বাক্য।
এরপর লিলামি রোডে যাওয়ার পথে তার থ্রি-হুইলার থামায় নীতি পুলিশ। দরজা খুলে তাকে জিজ্ঞাসা করা হয়, কোথায় যাচ্ছেন। ঠিকানা বলার পর তাকে নামতে বলা হয়। তিনি প্রতিবাদ করেন। বলেন, তিনি হিজাব পরেছেন। কিন্তু জবাবে তাকে বলা হয়, হিজাব পরলেই হবে না। তাকে ‘অবিশ্বাসী’, ‘মন্দ নারী‘ অনৈতিক নারী’ বলে অপমান করা হয়। প্রশ্ন করা হয়, তার মাহরাম কোথায়। কেন তিনি একজন যুবকের গাড়িতে বসেছেন। কেন সঙ্গে স্বামী নেই, বাবা নেই, ভাই নেই। অন্তত একটি শিশু বা আরেকজন নারীও নেই। সেই মুহূর্তে তার মধ্যে জমে থাকা ক্ষোভ বিস্ফোরিত হয়।
তিনি বলে ওঠেন, শয়তানও তোমাদের চেয়ে ভালো। তোমরা মানুষকে ধর্মকে ঘৃণা করতে বাধ্য করছ। চারপাশের মানুষ তাকিয়ে ছিল। অনেকেই ভিডিও করছিল; কিন্তু তালিবান সদস্যরা অন্যদের ভিডিও না করতে বলছিল। তাকে দপ্তরে নিয়ে যাওয়ার হুমকি দেওয়া হয়। কিন্তু তিনি বলেছেন, কোনো অপরাধ না করেও তাকে গ্রেপ্তার করার অধিকার কারও নেই।
অবশেষে তিনি হাঁটতে শুরু করেন। প্রচণ্ড রোদে, একা। সেই দিনের ভয়, ক্ষুধা, গরম আর মানসিক চাপ তার শরীরকে ভেঙে দেয়। পরদিন তিনি এতটাই অসুস্থ হয়ে পড়েন যে পরিবারের লোকজন তাকে ক্লিনিকে নিয়ে যান। চিকিৎসকরা জানান, মানসিক বিপর্যয় ও হিটস্ট্রোকের কারণে তার অবস্থা খারাপ হয়েছে। রক্তচাপও বিপজ্জনকভাবে নেমে গিয়েছিল।
কিন্তু হাসপাতাল থেকেও ফেরার পথে তালেবান তাদের থামায়। ভাইয়ের মোটরসাইকেলের কাগজপত্র পরীক্ষা করা হয়। ভাইকে আলাদা করে জেরা করা হয়। তারপর তার বাবার নাম, দাদার নাম, পরিচয়-সব যাচাই করে তবেই বাড়ি ফিরতে দেওয়া হয়।
হেরাতের গল্প এখানেই শেষ নয়। কারণ কয়েকশ কিলোমিটার দূরে বাদাখশানের ফয়জাবাদে আরেক ধরনের নীরবতা জন্ম নিচ্ছে। সেখানে আরেক নারী সাংবাদিক জারিরা শেকোহমান্দ (ছদ্মনাম)
লিখছেন, এখন যেন একটি অলিখিত নিয়ম চালু হয়েছে— প্রকৃতিও নারীদের জন্য নয়। ফয়জাবাদ, যে শহর সামাজিক মাধ্যমে তার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য পরিচিত, সেখানে আজ পাহাড়, নদী, উদ্যান- সবই যেন পুরুষদের অধিকারে। নারীরা ঘরে। পুরুষরা বাইরে। বসন্ত এসেছে। ঘাসে নতুন সবুজ পাতা। গাছে ফুল। পাখির ডাক। বৃষ্টি। মেঘ। নীল আকাশ। কিন্তু একজন নারী যদি সেই সৌন্দর্যের কাছে যেতে চান, তাহলেও তাকে শাস্তির ভয় তাড়া করে।
এক তরুণী জানাচ্ছেন, রমজানের আগে নৈতিকতা পুলিশের সদস্যরা তাকে বলেছিল, মুখোশ হিজাব নয়। বোরকা বা চাদর পরতে হবে। তাদের চোখ যেন এমনভাবে প্রশিক্ষিত, যা নারীর চুলের একটি গোছাও খুঁজে বের করতে পারে। একদিন কয়েকজন নারী আত্মীয়কে নিয়ে তিনি কৃষি উদ্যানে যাচ্ছিলেন। সবাই পূর্ণ ইসলামি পোশাক পরে ছিলেন। কিন্তু সেতু পার হতেই নৈতিকতা পুলিশের গাড়ি এসে দাঁড়ায়। একজন কর্মকর্তা নেমে প্রথমেই প্রশ্ন করেন, তোমাদের লজ্জা করে না? কিসের লজ্জা? এই জায়গা নারীদের জন্য নয়। এখানে আসতে পারো না। এত পুরুষ তোমাদের দেখছে। তারপর হুমকি— চলে যাও, না হলে দপ্তরে নিয়ে যাওয়া হবে। কিছুক্ষণ আগেও যে জায়গাটি ছিল প্রকৃতি, কয়েক মুহূর্তের মধ্যে সেটি হয়ে ওঠে ‘পুরুষদের এলাকা’। তারা ফিরে যান নীরবে।
আফগানিস্তানের নারীরা আজ শুধু চাকরি হারাননি। শুধু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হারাননি। শুধু জনজীবনে অংশগ্রহণের অধিকার হারাননি। অনেক ক্ষেত্রে তারা হারাচ্ছেন পৃথিবীর সঙ্গে স্বাভাবিক সম্পর্কটুকুও।
একদিকে পুরুষরা কোকচা নদীর তীরে ছবি তুলছেন, বাগানে হাঁটছেন, পাহাড়ি বাতাসে শ্বাস নিচ্ছেন। অন্যদিকে নারীরা ঘরের ভেতর বন্দি। এমনকি একজন নারী যদি আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে রাস্তায় হাঁটেন, মানুষ অবাক হয়ে তাকায়— তিনি কে? সম্ভবত এই প্রশ্নটিই সবচেয়ে ভয়ংকর। কারণ যখন কোনো সমাজে নারীর উপস্থিতি অস্বাভাবিক বলে মনে হতে শুরু করে, তখন ক্ষতিগ্রস্ত হয় সেই সমগ্র সমাজই। কারণ অর্ধেক মানুষকে বদ্ধ খাঁচায় আটকে রেখে কোনো জাতি কখনো মুক্ত আকাশের দাবি করতে পারে না।




