লাল আমেরিকায় নীল ঝড়
- ভোট বাক্সে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে ক্ষোভের বিস্ফোরণ
- মধ্যবর্তী নির্বাচনে দুই কক্ষই হাতছাড়া রিপাবলিকানদের

সংগৃহীত ছবি
লাল আমেরিকায় নীল ঝড়। আমেরিকার মধ্যবর্তী নির্বাচনে শুধু রিপাবলিকানদের হার হয়নি; বরং ভোট বাক্সে ধরা পড়েছে ডোনাল্ড ট্রাম্পের শাসন নিয়ে জমে থাকা অসন্তোষও। দ্রব্যমূল্যের চাপ, ইরান যুদ্ধের অভিঘাত, জ্বালানির চড়া দাম, অভিবাসননীতি, বর্ণবিদ্বেষী ও বিভাজনমূলক বক্তব্য— সব মিলিয়ে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে ক্ষোভের প্রকাশ ঘটেছে নির্বাচনের ফলাফলে। গত ৩ নভেম্বরের ভোটে ডেমোক্র্যাটরা কংগ্রেসের দুই কক্ষ—প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটের নিয়ন্ত্রণ ছিনিয়ে নিয়েছে। ১৯৭৪ সালের পর কোনো প্রেসিডেন্টের দলের বিরুদ্ধে এমন বড় নির্বাচনী ধাক্কা খায়নি যুক্তরাষ্ট্র। দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট, নিউ ইয়র্ক টাইমস, ইউএসএ টুডে, এলএ টাইমস।
২০২৪ সালে ভোটার জোয়ারের ‘লাল সুনামি’ নিয়ে হোয়াইট হাউজে ফিরেছিলেন ট্রাম্প। জীবনযাত্রার খরচ কমানো, কর্মসংস্থান বাড়ানো এবং ‘মেক আমেরিকা অ্যাগেইন’ স্লোগানে যুক্তরাষ্ট্রকে আবার শক্তিশালী করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু ক্ষমতায় ফেরার প্রায় দুেই বছরের মাথায় নির্বাচনী সেই ইশতেহারের সঙ্গে ক্রমেই স্পষ্ট হয়েছে সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতার ফারাক।
দ্রব্যমূল্যের চাপেই ক্ষোভের শুরু
আমেরিকার শ্রম পরিসংখ্যান দপ্তরের (বিএলএস) ভোক্তা মূল্যসূচক অনুযায়ী, ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদ শুরুর ঠিক আগে, ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে সামগ্রিক মূল্যসূচক ছিল ৩১৫ দশমিক ৬। ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৩৬ দশমিক ৯। অর্থাৎ এ সময়ে সাধারণ পণ্য ও পরিষেবার দামের সূচক বেড়েছে প্রায় ৬ দশমিক ৮ শতাংশ। খাদ্যপণ্যের ক্ষেত্রেও চাপ রয়েছে। বাড়িতে রান্নার জন্য কেনা খাবারের মূল্যসূচক একই সময়ে প্রায় ৪ দশমিক ৩ শতাংশ বেড়েছে। ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে বার্ষিক মূল্যবৃদ্ধির হার ছিল ৩ দশমিক ৭ শতাংশ। এ ছাড়া শুল্কনীতি, জ্বালানির বাজারে অস্থিরতা এবং যুদ্ধের প্রভাব নতুন করে খরচ বাড়িয়েছে। ভোটারদের বড় অংশের কাছে অর্থনীতি তাই নির্বাচনের প্রধান প্রশ্ন হয়ে ওঠে।
ওয়াশিংটন পোস্টের নির্বাচনী সমীক্ষা বলছে, ভোটারদের কাছে অর্থনীতি, স্বাস্থ্য পরিষেবা এবং ইরান যুদ্ধ ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তিনটি বিষয়। মাত্র ১২ শতাংশ ভোটার জানিয়েছেন, তাদের পরিবারের আর্থিক অবস্থার উন্নতি হচ্ছে। অন্যদিকে, ২৯ শতাংশ বলেছেন, তারা পিছিয়ে পড়ছেন। অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানকে প্রধান সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করা ভোটারদের মধ্যে ডেমোক্র্যাটরা ১২ পয়েন্টে এগিয়ে ছিলেন। ২০২৪ সালে এই ভোটারদের মধ্যেই ট্রাম্পের ২০ পয়েন্টের ব্যবধান ছিল।
ইরান যুদ্ধের মাশুল গুনছেন সাধারণ মানুষ
ট্রাম্প প্রশাসনের ইরান যুদ্ধও ক্ষোভের বড় কারণ। যুদ্ধের জেরে মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল সরবরাহ ব্যাহত হয়েছে। তার সরাসরি প্রভাব পড়েছে আমেরিকার জ্বালানির বাজারে। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের (এপি) হিসাব অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর আগে আমেরিকায় ১ গ্যালন সাধারণ পেট্রলের গড় দাম ছিল ২ দশমিক ৯৮ ডলার। যুদ্ধের পর মে মাসে তা বেড়ে ৪ দশমিক ৫৬ ডলারে পৌঁছায়। অক্টোবরের মাঝামাঝি দাম ছিল ৪ দশমিক ৩৩ ডলার, যা যুদ্ধ-পূর্ব দামের তুলনায় প্রায় ৪৫ শতাংশ বেশি। ২ নভেম্বর পর্যন্ত মার্কিন জ্বালানি দপ্তরের হিসাবে সাধারণ পেট্রলের জাতীয় গড় দাম কিছুটা কমে ৪ দশমিক ১৫ ডলারের কাছাকাছি দাঁড়ালেও তা এখনো যুদ্ধের আগের দামের তুলনায় অনেক বেশি।
ডিজেলের দামও বেড়েছে। এপি জানিয়েছে, যুদ্ধের আগে ১ গ্যালন ডিজেলের দাম ছিল ৩ দশমিক ৭৬ ডলার। পরে তা ৬ দশমিক ৩৩ ডলারে পৌঁছায়। পরিবহন খরচ বাড়ায় পণ্য সরবরাহের খরচও বেড়েছে। মুডিজ অ্যানালিটিকসের প্রধান অর্থনীতিবিদ মার্ক জান্ডির হিসাব, যুদ্ধের জেরে জ্বালানি, সুদের হার ও সামরিক ব্যয় মিলিয়ে একটি মার্কিন পরিবারের ওপর প্রায় ২ হাজার ডলারের সমপরিমাণ অতিরিক্ত আর্থিক চাপ সৃষ্টি হয়েছে।
বেকারত্ব বৃদ্ধি
কর্মসংস্থানের ছবিও পুরোপুরি স্বস্তির নয়। বিএলএসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে আমেরিকার বেকারত্বের হার ছিল ৪ শতাংশ। ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে তা বেড়ে ৪ দশমিক ২ শতাংশ হয়েছে। অর্থাৎ বৃদ্ধি শূন্য দশমিক ২ শতাংশ পয়েন্ট। একে বিপুল বেকারত্ব সংকট বলা যাবে না। তবে চাকরির বাজারে অনিশ্চয়তা এবং সংসার চালানোর ক্রমবর্ধমান খরচ ভোটারদের উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
অভিবাসননীতি ও বিভাজনের রাজনীতির বিরুদ্ধে জবাব
ট্রাম্প প্রশাসনের কঠোর অভিবাসননীতিও ভোটে প্রভাব ফেলেছে। ব্যাপক ধরপাকড় ও বহিষ্কারের অভিযানে বিশেষ করে লাতিনো ভোটারদের একাংশের মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছে। ২০২৪ সালে ট্রাম্পকে সমর্থন করা বহু ভোটার এবার মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন বলে নির্বাচনী বিশ্লেষণে উঠে এসেছে। ওয়াশিংটন পোস্টের সমীক্ষায় দেখা গেছে, লাতিনো, ক্যাথলিক এবং ৩০ বছরের কম বয়সী ভোটারদের মধ্যে ডেমোক্র্যাটদের দিকে উল্লেখযোগ্য ঝোঁক সৃষ্টি হয়েছে।
বিতর্ক বাড়িয়েছে ট্রাম্পের প্রচার বক্তব্য
ডেমোক্র্যাটদের ‘কমিউনিস্ট’, ‘উগ্রপন্থী’ ও ‘জিহাদি’ বলে আক্রমণ করেছেন তিনি। মিশিগানের মুসলিম ডেমোক্র্যাট প্রার্থী আবদুল এল-সাইয়েদকে ‘জিহাদি’ বলেছেন। কৃষ্ণাঙ্গ ও ইহুদি ভোটাররা তাকে ভোট দিলে ‘পাগলামি’ করবেন বলেও মন্তব্য করেছেন। দক্ষিণ ক্যারোলিনার প্রার্থী অ্যানি অ্যান্ড্রুজকে নিয়ে আপত্তিকর কটাক্ষ করেছেন। কিন্তু এই বিভাজনমূলক প্রচার শেষ পর্যন্ত ভোটারদের মন জিততে পারেনি।
এপস্টেইন নথি, দুর্নীতির অভিযোগ ও ক্ষমতার দম্ভ
ট্রাম্পের বিরুদ্ধে ক্ষোভের আরেকটি জায়গা ছিল প্রয়াত অর্থলগ্নিকারী ও দণ্ডিত যৌন অপরাধী জেফ্রি এপস্টেইন-সংক্রান্ত বিচার বিভাগের নথি প্রকাশে তার বিরোধিতা। প্রচারের সময় এ নিয়ে প্রতিবাদও হয়েছে। ডেমোক্র্যাটরা এখন কংগ্রেসের তদন্ত ও তলবের ক্ষমতা ব্যবহার করে ট্রাম্প পরিবারের আর্থিক লেনদেন, অভিবাসন দপ্তরের ভূমিকা এবং এপস্টেইন নথি নিয়ে তদন্তের কথা বলছেন।
ট্রাম্প নিজেও নির্বাচনকে নিজের জনপ্রিয়তার পরীক্ষা বানিয়ে ফেলেছিলেন। ভোটারদের অন্তত ৪১ বার বলেছিলেন, তারা যেন তাকে ব্যালটে থাকা প্রার্থী হিসেবেই ভাবেন। অথচ ফল খারাপ হতেই সামাজিক মাধ্যমে লিখলেন, ‘আমি ব্যালটে ছিলাম না। থাকলে আমরা বিপুল ব্যবধানে জিততাম।’ পরাজয়ের দায় নিজের কাঁধে নিতে চাননি তিনি; বরং অন্য রিপাবলিকানদের দিকে আঙুল তুলেছেন।
লাল দুর্গেও নীল ঢেউ
ফলাফলে সেই ক্ষোভের প্রতিফলন স্পষ্ট। টেক্সাসে ডেমোক্র্যাট জেমস তালারিকো রিপাবলিকান কেন প্যাক্সটনকে হারিয়ে সিনেটে জয়ী হয়েছেন। ১৯৮৮ সালের পর এই প্রথম টেক্সাস থেকে ডেমোক্র্যাট সিনেটর নির্বাচিত হলেন। কানসাসে ৯৪ বছর পর সিনেটে আসন পেলেন ডেমোক্র্যাটরা। দক্ষিণ ক্যারোলিনায় প্রায় তিন দশক পর ডেমোক্র্যাট প্রার্থী অ্যানি অ্যান্ড্রুজ জয়ী হয়েছেন। নর্থ ক্যারোলাইনায় রয় কুপার, ওহাইওতে শেরড ব্রাউন এবং মেইনে ট্রয় জ্যাকসনের জয়ও রিপাবলিকানদের জন্য বড় ধাক্কা।
টেক্সাসে গ্রেগ অ্যাবটকে হারিয়ে জিনা হিনোজোসা গভর্নর হয়েছেন। জর্জিয়ায় কিশা ল্যান্স বটমস প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ মহিলা গভর্নর নির্বাচিত হয়েছেন। ওহাইওতে ট্রাম্পসমর্থিত বিবেক রামাস্বামীকে হারিয়েছেন ডেমোক্র্যাট অ্যামি অ্যাক্টন। নিউ হ্যাম্পশায়ারে সিনেট আসন জিতেছেন ক্রিস পাপাস। জর্জিয়া থেকে পুনর্নির্বাচিত হয়েছেন জন অসফ।
এপির বুথফেরত সমীক্ষা ও ওয়াশিংটন পোস্টের বিশ্লেষণ বলছে, ২০২৪ সালে ট্রাম্পকে ভোট দেওয়া কিছু মানুষও এবার ডেমোক্র্যাটদের সমর্থন করেছেন। আইওয়া, কানসাস, নর্থ ক্যারোলাইনা ও টেক্সাসে ট্রাম্পের পুরনো ভোটারদের প্রায় ১০ শতাংশ ডেমোক্র্যাট প্রার্থীকে ভোট দিয়েছেন। এবার যারা ভোট দিয়েছেন, তাদের ১৫ শতাংশ ২০২৪ সালে ভোট দেননি। তাদের সমর্থনও ডেমোক্র্যাটদের দিকে গেছে।
ভোটারদের ৬০ শতাংশ ট্রাম্পের কাজকর্মে অসন্তোষ জানিয়েছেন। তাদের ৮১ শতাংশ ডেমোক্র্যাটদের ভোট দিয়েছেন। অক্টোবরে ট্রাম্পের অনুমোদনের হার নেমে এসেছিল ৩৩ শতাংশে। প্রায় তিন-চতুর্থাংশ ভোটার মূল্যবৃদ্ধি ও জীবনযাত্রার খরচ সামলাতে তার ভূমিকা নিয়ে অসন্তুষ্ট ছিলেন। ৭২ শতাংশের মতে, দেশ ভুল পথে এগোচ্ছে।
রিপাবলিকানদের নির্বাচনী প্রচারে বিপুল অর্থ খরচও এই ক্ষোভ ঠেকাতে পারেনি। ট্রাম্পঘনিষ্ঠ সুপারপ্যাক অন্তত ৩৮০ মিলিয়ন ডলার এবং ইলন মাস্ক ৪০০ মিলিয়ন ডলারের বেশি অর্থ খরচ করেছেন বলে ওয়াশিংটন পোস্টের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবু ভোটের রায় বদলানো যায়নি।
এখন কংগ্রেসের দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ ডেমোক্র্যাটদের হাতে যাওয়ায় ট্রাম্পের বাকি মেয়াদ আরও কঠিন হতে চলেছে। তার প্রশাসনের বিরুদ্ধে তদন্ত, ইরান যুদ্ধের ক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন, শুল্কনীতি ও অভিবাসন অভিযানের বিরোধিতা— সবক্ষেত্রেই চাপ বাড়াতে পারবেন বিরোধীরা। সিনেটে নিয়ন্ত্রণ থাকায় মন্ত্রিসভা ও বিচার বিভাগের নিয়োগও আটকে দিতে পারবেন তারা। আইন পাসের ক্ষেত্রে ৬০ ভোটের বাধা থাকলেও নজরদারি ও তদন্তের ক্ষমতা তাদের হাতে।
আমেরিকার ভোটাররা তাই শুধু বিরোধী দলকে জেতাননি। তারা ট্রাম্প প্রশাসনকে জানিয়ে দিয়েছেন—ক্ষমতার দম্ভ, যুদ্ধের খরচ, সংসারের বাড়তি বোঝা আর বিভাজনের রাজনীতি অনির্দিষ্টকাল মেনে নেওয়া হবে না। লাল আমেরিকার বুকেই তাই এবার উঠেছে নীল ঝড়।





