নয়াদিল্লি সফরে কোন পথ বেছে নেবেন বালেন্দ্র শাহ?

নরেন্দ্র মোদি ও বালেন্দ্র শাহ
ভারতই প্রথম বিদেশ সফরের গন্তব্য— নেপালের সরকারপ্রধানরা এই প্রথা মেনে চলছেন দীর্ঘদিন। ব্যতিক্রম নন নতুন প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহও। শোনা যাচ্ছে, শিগগিরই নয়াদিল্লি সফরে যেতে পারেন তিনি। যদিও এখনো নির্দিষ্ট নয় সফরসূচি।
গত শনিবার নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খানাল বলেছেন, ২৭ মার্চ দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই নতুন প্রধানমন্ত্রীকে আনুষ্ঠানিক সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন নরেন্দ্র মোদি। কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, দুই দেশই এই সফর আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ না রেখে অর্থবহ করতে চায়। আর এটাই ইতিবাচক দিক।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা অলির আমলে কাঠমান্ডু ও নয়াদিল্লির সম্পর্ক ছিল ওঠা-নামার মধ্যেই। এখন দুই পক্ষই নতুন করে সম্পর্ক পুনর্গঠনের মনোভাব দেখাচ্ছে।
২০১৫-১৬ সালে সীমান্ত অবরোধের সময় কঠোর জাতীয়তাবাদী অবস্থান নিয়েছিলেন পরবর্তী সময়ে ক্ষমতাচ্যুত হওয়া অলি। সে সময় থেকেই ভারতের সঙ্গে বাড়তে শুরু করে দূরত্ব। তাকে ‘চীন ঘনিষ্ঠ’ মনে করা হতো।
পরবর্তী সময়ে তিনি সংবিধান সংশোধন করে কালাপানি, লিম্পিয়াধুরা ও লিপুলেখ নেপালের মানচিত্রে অন্তর্ভুক্ত করেন। এই বিতর্কিত অঞ্চলগুলো মানচিত্রে অন্তর্ভুক্ত করার পর সম্পর্ক হয় আরও জটিল। এমনকি অলি ভারতের জাতীয় প্রতীক নিয়ে কটাক্ষ করেন এবং ভগবান রামের জন্মস্থান নিয়েও বিতর্কিত মন্তব্য করেছিলেন।
সেই অলি এখন রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা। রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টির (আরএসপি) নেতৃত্বে উত্থান হয়েছে বালেন্দ্র শাহ সরকারের। এই পরিস্থিতিতে সম্পর্ক পুনরুদ্ধারই হতে পারে সবচেয়ে বড় সুযোগ। তবে উপেক্ষা করা যাবে না বাস্তবতাও।
যেমন, কালাপানি ইস্যু। প্রায় ৪০০ বর্গকিলোমিটারের ওই পাহাড়ি এলাকাটি নেপালের সার্বভৌমত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলবে। ফলে সহজে আপস করতে পারবে না নতুন সরকার। ভারত ও চীন ইতোমধ্যে লিপুলেখ হয়ে সীমান্ত বাণিজ্য পুনরায় চালুর ঘোষণা দিয়েছে, আর তা নেপালের সঙ্গে পরামর্শ না করেই। ফলে বালেন্দ্র শাহর ওপর চাপ থাকবে, যাতে এই স্পর্শকাতর বিষয়টি ভারতের সঙ্গে আলোচনায় স্থান পায়।
একইসঙ্গে ক্ষমতার শুরুতেই ভারতকে বেশি ছাড় দিলে ক্ষতিগ্রস্ত হবে তার রাজনৈতিক অবস্থান। তবুও কাঠমান্ডু ও নয়াদিল্লি যদি সম্পর্ক আন্তরিক করতে চায়, তাহলে খোলা আছে সমঝোতার পথ। ভারত চাইলে নেপালকে একটি অতিরিক্ত আকাশপথ ব্যবহারের সুযোগ দিতে পারে, যা স্থলবেষ্টিত দেশটির সঙ্গে আন্তর্জাতিক যোগাযোগ সহজ করবে। পাশাপাশি লিপুলেখ হয়ে সীমান্ত বাণিজ্যে নেপালকে সম্পৃক্ত করার আশ্বাসও দেওয়া যেতে পারে।
অন্যদিকে নেপালের প্রধানমন্ত্রীকে স্পষ্টভাবে বলতে হবে, তিনি ভারত ও চীনের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার নামে কোনো ‘খেলা’ চান না; বরং তার পররাষ্ট্রনীতি হবে কেবল নেপালের জাতীয় স্বার্থে। পূর্বসূরিদের তুলনায় বালেন্দ্র শাহর এমন প্রতিশ্রুতি বেশি বিশ্বাসযোগ্য হবে। কারণ তার ওপর কোনো বড় শক্তির প্রভাব বা চাওয়া নেই।
একটি আকাশপথ বা লিপুলেখ সীমান্ত বাণিজ্যে নেপালের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গেলে তা নতুন প্রধানমন্ত্রীর জন্য বড় কূটনৈতিক অর্জন হবে। বাস্তবতা অগ্রাধিকার দিলে তার এই সফর কেবল সম্পর্ক পুনর্গঠনই নয়, বরং নেপাল-ভারত সম্পর্কের ইতিহাসে সূচনা করতে পারে একটি নতুন অধ্যায়ের— যেখানে অতীত নয়, পথ দেখাবে ভবিষ্যৎই।



