তারুণ্যের শিখায় জ্বলে উঠতে চায় বামপন্থা

গ্রাফিক্স: আগামীর সময়
পশ্চিমবঙ্গে প্রথম দফার ভোটের দিনে বামফ্রন্ট, বিশেষ করে কমিউনিস্ট পার্টি অব ইন্ডিয়া (মার্কসবাদী) নিয়ে লেখা কিছুটা মনে হতে পারে বেমানান। কিন্তু ইতিহাসের নিরিখে দেখলে বাম শাসনের ৩৪ বছরের (১৯৭৭-২০১১) প্রভাব ও তার পরবর্তী পরিবর্তন এখনো প্রাসঙ্গিক।
বিশ্বরাজনীতিতে কমিউনিস্ট শাসনের প্রসঙ্গ উঠলে যেমন রাশিয়া বা ফিদেল কাস্ত্রোর কিউবার কথা আসে, তেমনি ভারতীয় প্রেক্ষাপটে অবধারিতভাবে উঠে আসে পশ্চিমবঙ্গের নাম। সেই সময় ঘিরে এখনো রয়েছে নস্টালজিয়া, স্মৃতি ও নানা বিতর্ক।
২০১১ সালের মে মাসে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে তৃণমূল কংগ্রেস ক্ষমতায় আসার মধ্য দিয়ে দীর্ঘ বাম শাসনের অবসান ঘটে। ২৯৪ আসনের বিধানসভায় ১৮৪টি আসন জিতে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায় তৃণমূল, আর বামফ্রন্ট নেমে আসে ১০২-এ। তখন অনেকেই ভেবেছিলেন, সূচনা হলো নতুন এক আধুনিক রাজনৈতিক যুগের। কিন্তু সেই পরিবর্তন কতটা কাঙ্ক্ষিত ফল দিয়েছে, তা নিয়ে বিতর্ক আজও থামেনি।
বক্তব্যে আত্মবিশ্বাস, ভাষায় সাবলীলতা এবং উপস্থাপনায় নতুনত্ব আকৃষ্ট করছে অনেককেই
জ্যোতি বসুর আমলে প্রশাসনিক স্থিতিশীলতা, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও সাংস্কৃতিক বিকাশের কথা অনেকেই স্মরণ করেন। সল্ট লেক বা নিউ টাউনের মতো আধুনিক নগর পরিকল্পনার ভিত্তিও তখনই গড়ে ওঠে। অর্থনৈতিক দিক থেকে সীমাবদ্ধতা থাকলেও বৈষম্য তুলনামূলকভাবে কম ছিল— এমন মতও প্রচলিত। অন্যদিকে বর্তমান সময়ে উন্নয়নের দৃশ্যমান চিত্র যেমন বেড়েছে, তেমনি কর্মসংস্থান, দুর্নীতি ও সামাজিক ভারসাম্য নিয়ে উঠছে প্রশ্নও।
টানা তিন মেয়াদে ক্ষমতায় রয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এই সময়ে বাম দলগুলো ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ে, এমনকি গত বিধানসভা নির্বাচনে সিপিআই(এম) একটিও আসন পায়নি— যা একসময়ের শক্তিশালী রাজনৈতিক ঐতিহ্যের জন্য বড় ধাক্কা।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে নতুন প্রজন্মের কিছু তরুণ নেতার হাত ধরে বাম রাজনীতিতে দেখা যাচ্ছে কিছুটা নতুন সঞ্চার। যেমন— দীপশীতা ধর, শতরূপ ঘোষ, সৃজন ভট্টাচার্য, মীনাক্ষী মুখার্জি প্রমুখ। তাদের বক্তব্যে আত্মবিশ্বাস, ভাষায় সাবলীলতা এবং উপস্থাপনায় নতুনত্ব আকৃষ্ট করছে অনেককেই।
বর্তমান সময়ে উন্নয়নের দৃশ্যমান চিত্র যেমন বেড়েছে, তেমনি কর্মসংস্থান, দুর্নীতি ও সামাজিক ভারসাম্য নিয়ে উঠছে প্রশ্নও
গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব গৌতম ভট্টাচার্য মন্তব্য করেছেন, এই নতুন প্রজন্ম এরই মধ্যে পৌঁছে গেছে মানুষের ঘরে ঘরে। নির্বাচনে সাফল্য পেলে তা হবে জনআস্থারই প্রতিফলন। সাধারণ মানুষের মধ্যেও তাদের নিয়ে দেখা যাচ্ছে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া, বিশেষ করে তাদের বাচনভঙ্গি, সরল জীবনযাপন ও কথার সঙ্গে কাজের মিলের কারণে।
অন্যদিকে দলের প্রবীণ নেতা বিমান বসু এখনো সাদামাটা জীবনযাপনের জন্য আলোচিত। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে ব্যক্তিগত সততা ও ত্যাগের উদাহরণ হিসেবেও তাকে দেখা হয়।
একসময় গ্রামাঞ্চল ও শ্রমজীবী মানুষের মধ্যে বামদের শক্ত ঘাঁটি ছিল, যা এখন অনেকটাই অন্য রাজনৈতিক শক্তির দখলে। তবু এখানেই গল্পের শেষ নয়, বরং সূচনা হতে পারে নতুন এক অধ্যায়ের। পুনর্গঠনের রাজনীতি, নতুন মুখ ও নতুন ভাবনার মাধ্যমে পুরনো কাঠামো ভেঙে চেষ্টা চলছে নতুন বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয়তা, তরুণদের সঙ্গে সংযোগ এবং মাঠের রাজনীতিতে ফিরে আসার প্রচেষ্টার মধ্য দিয়ে বাম রাজনীতি আবার ঘুরে দাঁড়ানোর পথ খুঁজছে— এটাই এখন দেখার বিষয়।



