আগামীর সময়

দুর্গ নগরী থেকে ব্যস্ত মহানগরী মুম্বাই

দুর্গ নগরী থেকে ব্যস্ত মহানগরী মুম্বাই

‘কুইন্স নেকলেস’ নামে পরিচিত মুম্বাইয়ের মেরিন ড্রাইভের রাত্রিকালীন দৃশ্যের একটি চিত্রকর্ম

সাতটি আলাদা আলাদা ছোট দ্বীপ থেকে আজকের এই বিশাল নগরী মুম্বাই। ভারতের এই নগরে দুই কোটি মানুষের বাস। কয়েক শতাব্দী ধরে এই শহর দেখেছে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক শক্তির নানা পালাবদল।

সমুদ্রের কূল ঘেঁষে গড়ে ওঠা এই নগরী বর্তমান রূপ পেয়েছে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের অংশগ্রহণের মাধ্যমে।

মৎস্যজীবী জেলে সমাজই হোক কিংবা ঔপনিবেশিক নগর-পরিকল্পনাকারী, বলিউড তারকা থেকে শুরু করে টেক্সটাইল মালিক, অনেকেই পশ্চিম ভারতের এই শহরের দৃশ্যপট এবং পরিচয় গঠনে ভূমিকা রেখেছেন।

যেকোনো শহরের দৃশ্যপটই সময়ের সঙ্গে বদলায়। মুম্বাইয়ের রূপও বদলাচ্ছে প্রতিনিয়ত।

পুরনোই নতুনকে পথ করে দিচ্ছে। অতীত ধীরে ধীরে ঝাপসা হয়ে জন্ম নিচ্ছে নতুনের। বোম্বে তথা আজকের মুম্বাইয়ের ইতিহাসের দিকে তাকালে বলা যায়, মাছ ধরার জাল থেকে বন্দর, কলকারখানা থেকে শপিং মল, বারবার নিজেকে নতুন রূপে আবিষ্কার করছে এই মহানগরী।

সম্প্রতি ‘বোম্বে ফ্রেমড’ নামক নতুন একটি প্রদর্শনী হয় মুম্বাইয়ে। কয়েক শতাব্দী ধরে শহরের রূপান্তরের চিত্র তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছে এই আয়োজন। এই গ্যালারিতে চমৎকার সব পেইন্টিং, আলোকচিত্র এবং মাল্টিমিডিয়া প্রিন্ট প্রদর্শিত হয়।

তিন শতাব্দী জুড়ে বিস্তৃত ১০০টিরও বেশি ছবিতে শহরের যত বৈচিত্র্যময় রূপ ফুটে উঠেছে। যেখানে জরাথ্রুস্টীয় পার্সি বণিক থেকে শুরু করে তৎকালীন বলিউড তারকাদের অভিজাত জগত, সাধারণ শ্রমজীবী মানুষের জীবনযাত্রা সবই ফুটে উঠেছে।

এই চিত্রকর্মে ১৯৬০-এর দশকে মুম্বাইয়ের ট্রামগুলোকে চিত্রিত করা হয়েছে। ছবি: বিবিসি

এই প্রদর্শনীর কিউরেটর জ্ঞান প্রকাশ বলেছেন, এই ছবিগুলো আমাদের শহরটিকে একটি শিল্পকর্ম হিসেবে দেখতে বাধ্য করে।

‘আমাদের প্রদর্শিত শিল্পকর্মগুলো বহুস্তরীয়, জটিল এবং ভিন্ন ভিন্ন অভিজ্ঞতার সমন্বয়ে গঠিত’, যোগ করেন তিনি।

প্রকাশের মতে, বোম্বে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের সময় পার করে আজকের মুম্বাইতে পরিণত হয়েছে। যেমন ১৮৩০ ও ৪০-এর দশকে, যখন ভূমি পুনরুদ্ধার এবং বাঁধের মাধ্যমে সাতটি আলাদা দ্বীপকে যুক্ত করে একটি অখণ্ড দ্বীপে পরিণত করা হয়েছিল।

‘এর দুই দশক পর, ১৮৬০-এর দশকে দুর্গের দেয়ালগুলো ভেঙে ফেলা হয়। যা রাজকীয় ভবন নির্মাণের পথ প্রশস্ত করে। এই প্রক্রিয়া শহরটিকে একটি স্বতন্ত্র ঔপনিবেশিক পরিচয় দেয়।’

প্রকাশ জানান, ১৯২০ ও ৩০-এর দশকে মেরিন ড্রাইভের কর্নিশ এবং এর সংলগ্ন আর্ট ডেকোর মনমুগ্ধকর ভবনগুলো নির্মিত হয়। এই ভবনগুলো প্রথমবারের মতো ভিক্টোরিয়ান গথিক ঘরানা থেকে বেরিয়ে একটি অনন্য আধুনিক স্থাপত্যশৈলীর জন্ম দিয়েছিল।

‘২০০০ সালের পর থেকে শহরের পরিকল্পনাবিদরা সমুদ্রের ওপর নতুন সেতু এবং কোস্টাল রোড তৈরির মতো প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণে মনোনিবেশ করেছেন। যা আজকের শহরের চেহারাকে আমূল বদলে দিয়েছে’, যোগ করেন প্রদর্শনীর এ কিউরেটর।

প্রকাশের মতে, ইতিহাসের পরিক্রমায় বোম্বে সবসময়ই চরম বৈপরীত্যের শহর হয়ে থেকেছে। একদিকে আকাশচুম্বী বিলাসবহুল ভবন, অন্যদিকে বস্তি এলাকার ভিড়; প্রাণোচ্ছল শহরের কোলাহলের ঠিক উল্টো দিকেই শান্ত সমুদ্র, আর প্রাচীন ঐতিহ্যের পাশে আধুনিক নগরায়ণের আস্ফালন।

ঔপনিবেশিক যুগের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক কেন্দ্র হর্নিম্যান সার্কেলের একটি পুরোনো ছবি। ছবি: বিবিসি

মুম্বাই যেমন প্রাচীন গুহার শহর, আবার আধুনিক কলকারখানা ও পারমাণবিক গবেষণা কেন্দ্রের শহরও বটে। যার ফলে জীবনযাত্রা অনুযায়ী একেকজন মানুষের কাছে এই শহরের রূপ একেক রকম।

কিন্তু একটি শহরের প্রাণ কেবল তার দালানকোঠায় নয়, বরং সেখানে বসবাসকারী মানুষের অন্তরেও স্পন্দিত হয়। আর এই প্রদর্শনী সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের মধ্য দিয়ে সেই গল্পই বলার চেষ্টা করেছে।

প্রকাশের ভাষ্য অনুযায়ী, ব্রিটিশদের আঁকা সমুদ্র ও নৌকার পুরনো ছবিগুলোতেও মানুষের উপস্থিতি দেখা যায়, যা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, এখানকার পরিবেশ সবসময়ই মানুষের কর্মকাণ্ড দ্বারা প্রভাবিত হয়েছে।

পার্সি সমাজসেবীদের থেকে শুরু করে তৎকালীন মহারাষ্ট্রীয় অভিজাত শ্রেণিী, কলকারখানার শ্রমিক কিংবা প্রান্তিক অভিবাসী, প্রদর্শনীর আলোকচিত্রগুলোতে শহুরে জীবনের সেই বহুমুখী আবহমান রূপ আর সবার সমান অবদান ফুটে উঠেছে নান্দনিকভাবে।

পার্সি অভিজাতদের প্রতিকৃতিগুলো সেই সময়ের সামাজিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও প্রভাবশালী নেটওয়ার্কের প্রতিফলন ঘটায়। এই নেটওয়ার্কই ২০ শতাব্দীর শুরুর দিকে শহরের বাণিজ্যিক কাঠামো তৈরি করেছিল।

এর বিপরীতে, চিত্তপ্রসাদের মতো শিল্পীদের কাজ শ্রমজীবী মানুষের জীবনকে তুলে ধরেছে সূক্ষ্মভাবে। এই শিল্পী তার সময়ে সামাজিক ও রাজনৈতিক সমালোচনার জন্য জনপ্রিয় ছিলেন।

আগের বোম্বে যেমন ভারতকে সিনেমা উপহার দিয়েছে, সিনেমাও তেমনি সেলুলয়েড ছাড়িয়ে মিশে গেছে শহরের অলি-গলি্র দেয়ালে-দেয়ালে। প্রদর্শনীতে ১৯৫০ ও ৬০-এর দশকের ভিনটেজ ফিল্ম পোস্টারের এক উজ্জ্বল সংগ্রহ দেখতে পাওয়া গেছে। যেগুলো একসময় শহরের দেয়ালে-দেয়ালে পোস্টার হিসেবে শোভা পেত।

পাশাপাশি রয়েছে ‘ইন্ডিয়া ফটো স্টুডিও’র প্রতিষ্ঠাতা জে এইচ ঠাকরের তোলা ছবিও।

কিউরেটরের নোটে বলা হয়েছে, তার তোলা রাজ কাপুর, নার্গিস, দেব আনন্দ, মীনা কুমারী এবং দিলীপ কুমারের অত্যন্ত নিপুণ ও শৈল্পিক প্রতিকৃতিগুলোই দর্শকদের চোখে তারকাদের ভাবমূর্তি তৈরি করে দিয়েছিল।

প্রদর্শনীতে ১৯৫০ ও ৬০-এর দশকের চলচ্চিত্রের পোস্টারের প্রাণবন্ত সংগ্রহ তুলে ধরা হয়। ছবি: বিবিসি

৯০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে এই শহরের নাম আনুষ্ঠানিকভাবে বদলে যায়। ‘বোম্বে’ থেকে বদলে পরিণত হয় আজকের এই ‘মুম্বাই’ নগরে।

কর্তৃপক্ষের মতে, এটি ছিল ঔপনিবেশিক উত্তরাধিকার থেকে মুক্তির একটি পদক্ষেপ। পুরনো নামটি অনেকের কাছে রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর হয়ে উঠেছিল।

কিউরেটর প্রকাশ জানালেন তাদের প্রদর্শনীর নাম ‘মুম্বাই ফ্রেমড’ না হয়ে ‘বোম্বে ফ্রেমড’ হওয়ার কারণ। বেশিরভাগ ছবিই এমন সময়ের যখন শহরটি আনুষ্ঠানিকভাবে বোম্বে নামেই পরিচিত ছিল।

তার মতে, ‘মারাঠি ভাষাভাষীদের কাছে এটি সবসময়ই মুম্বাই ছিল। নামের ব্যাপারে আমি বা অনেক মানুষেরই কোনো গোঁড়ামি নেই। যেকোনো নামই এই শহরের দীর্ঘ ইতিহাস এবং ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন। বিষয়টি কেবল তখনই বিতর্কের সৃষ্টি করে যখন একে রাজনৈতিক রূপ দেওয়া হয়।’


বিবিসি থেকে অনূদিত


    শেয়ার করুন: