তেলাপোকা থেকে প্রতিবাদ
যখন গালি হয়ে ওঠে রাজনৈতিক পরিচয়

ছবি: এআই
একটি শব্দ কখনো কখনো শুধু শব্দ থাকে না; তা হয়ে ওঠে প্রতিবাদের ভাষা, রাজনৈতিক বার্তা এবং সামাজিক অসন্তোষের প্রতীক। সম্প্রতি ভারতের রাজনীতিতে ‘তেলাপোকা’ বা ‘ককরোচ’ শব্দকে ঘিরে তৈরি হওয়া বিতর্ক তেমনই এক ঘটনা। যা দেশের তরুণ সমাজের হতাশা ও ক্ষোভের নতুন বহিঃপ্রকাশ হিসেবে এসেছে আলোচনায়।
ভারতের সাবেক অর্থমন্ত্রী ও কংগ্রেস নেতা পি চিদাম্বরম তার সাম্প্রতিক এক নিবন্ধে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি) নামের একটি ব্যঙ্গাত্মক রাজনৈতিক ধারণা তুলে ধরেন। নিবন্ধে তিনি দেখানোর চেষ্টা করেন, কীভাবে একটি অবমাননাকর শব্দকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নতুন ধরনের রাজনৈতিক পরিচয় গড়ে উঠতে পারে।
চিদাম্বরমের ভাষ্য, ‘ককরোচ’ কোনো পোকামাকড়ের পরিচয় নয়; বরং এটি সেইসব মানুষের প্রতীক। যারা মনে করে রাষ্ট্র ও রাজনৈতিক ব্যবস্থা তাদের কথা শুনছে না। বিশেষ করে বেকার, হতাশ এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তায় ভোগা তরুণদের মধ্যেই এই অনুভূতি বেশি দেখা যাচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, ভারতের অর্থনীতি দ্রুত সম্প্রসারিত হলেও কর্মসংস্থানের সুযোগ সেই হারে বাড়ছে না। যুব বেকারত্ব এখনও একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
উচ্চশিক্ষা অর্জনের পরও অনেক তরুণ স্থায়ী ও মানসম্মত চাকরি পাচ্ছেন না। ফলে তাদের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা বাড়ছে। যা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন রূপে প্রকাশ পাচ্ছে।
অন্যদিকে জ্বালানি তেলের উচ্চমূল্য এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধিও সাধারণ মানুষের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করেছে। পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি কর্মসংস্থান ও ব্যবসায়িক সুযোগের ওপরও প্রভাব ফেলছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এসব বিষয় তরুণদের মধ্যে ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা আরও বাড়িয়ে তুলছে।
চিদাম্বরম তার নিবন্ধে ব্যঙ্গাত্মক ভঙ্গিতে উল্লেখ করেন, ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ সেইসব মানুষের প্রতিনিধিত্ব করতে চায়, যাদের ‘ব্যবস্থা গুনে রাখেনি’ বা গুরুত্ব দেয়নি। যদিও এটি একটি প্রতীকী ধারণা। তবুও এর মাধ্যমে সমাজের একটি বড় অংশের অসন্তোষের বিষয়টি সামনে এসেছে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, ইতিহাসে বহুবার দেখা গেছে যে অবমাননাকর কোনো শব্দ বা পরিচয় পরবর্তীতে প্রতিবাদের প্রতীকে পরিণত হয়েছে। যখন কোনো গোষ্ঠী নিজেদের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত শব্দকে গ্রহণ করে এবং নতুন অর্থ দেয়। তখন সেটি রাজনৈতিক শক্তির উৎস হয়ে উঠতে পারে।
‘ককরোচ’ বিতর্কও অনেকের কাছে সেই ধরনের একটি উদাহরণ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে এমন প্রতীক আরও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। একটি মন্তব্য, একটি হ্যাশট্যাগ কিংবা একটি ব্যঙ্গাত্মক প্রচারণাও অল্প সময়ের মধ্যে লাখো মানুষের আলোচনার বিষয় হয়ে উঠতে পারে। ফলে প্রচলিত রাজনৈতিক দলগুলোর বাইরে নতুন ধরনের জনমত ও প্রতিবাদের ক্ষেত্র তৈরি হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই বিতর্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—এটি ভারতের তরুণ সমাজের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উদ্বেগকে সামনে নিয়ে এসেছে। বেকারত্ব, মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা এবং সামাজিক বৈষম্যের মতো বিষয়গুলো যদি দীর্ঘমেয়াদে সমাধান না হয়। তবে সেই অসন্তোষ ভবিষ্যতে আরও বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জে রূপ নিতে পারে।
‘তেলাপোকা’ বিতর্ক একটি শব্দকে ঘিরে শুরু হলেও এর তাৎপর্য অনেক বিস্তৃত। এটি দেখিয়ে দিয়েছে, কোনো গালি বা অবমাননাকর পরিচয়ও কখনো কখনো প্রতিবাদের ভাষা হয়ে উঠতে পারে। আর যখন সেটি ঘটে, তখন শব্দের অভিধানগত অর্থের চেয়ে তার রাজনৈতিক অর্থই বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
সূত্র: দ্য ইন্ডিয়া এক্সপ্রেস




