রাশিয়া-ইরানের হুমকিতে কি ফের ইউরোপমুখী ব্রিটেন?

ইউরোপ থেকে বিচ্ছেদের পক্ষে ভোটের এক দশক। অথচ ব্রিটেনের সামনে আবার ইউরোপের দরজা খুলছে। এবার কারণ শুধু বাণিজ্য নয়। রাশিয়ার হুমকি, ইরানকে ঘিরে নিরাপত্তাশঙ্কা এবং অর্থনীতির চাপ। এই তিন সংকট কি প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যামকে ইউরোপের কাছে টেনে নিচ্ছে?
সোমবার (১২ অক্টোবর) স্কাই নিউজে এই প্রশ্ন তুলেছেন সংবাদমাধ্যমটির রাজনৈতিক সম্পাদক বেথ রিগবি। ওই দিন পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ হাউস অব কমন্সে দেওয়া বার্নহ্যামের বক্তব্যের কেন্দ্রে ছিল রাশিয়া, ইরান এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে সম্পর্ক নতুন করে গড়ার পরিকল্পনা।
বার্নহ্যাম বলেছেন, ইউরোপজুড়ে রাশিয়া অন্তর্ঘাত চালাচ্ছে। গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টাও চলছে। জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎসের সঙ্গে এসব হুমকি মোকাবিলায় সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে তাঁর কথা হয়েছে।
নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে ২০১৬ সালের গণভোট নিয়ে তার মন্তব্য। ব্রিটেনকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বের করে আনার ওই ভোটে রাশিয়া হস্তক্ষেপের চেষ্টা করেছিল বলে দাবি করেছেন বার্নহ্যাম। তবে তিনি বলেছেন, গণভোটের ফল বৈধ। রাশিয়ার চেষ্টা ভোটের ফল বদলে দিয়েছিল, এমন প্রমাণও সরকার দেয়নি।
২০১৯ সালের ব্রিটিশ নির্বাচনেও রুশ হস্তক্ষেপের চেষ্টা হয়েছিল বলে উল্লেখ করেছেন বার্নহ্যাম। তার যুক্তি, গণতন্ত্র রক্ষায় প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সমন্বয় আরও বাড়ানো জরুরি।
বিরোধী কনজারভেটিভ নেত্রী কেমি ব্যাডেনক অভিযোগের প্রমাণ চেয়েছেন। ব্রেক্সিটের অন্যতম প্রচারক নাইজেল ফারাজ দাবি প্রত্যাখ্যান করেছেন। মস্কোও বিদেশি নির্বাচনে হস্তক্ষেপের অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে।
ইরান নিয়েও কড়া বক্তব্য দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। তার দাবি, গত ২৭ সেপ্টেম্বর ইংল্যান্ডের ফেয়ারফোর্ড বিমানঘাঁটি ঘিরে সন্দেহজনক হামলার পরিকল্পনা ‘প্রায় নিশ্চিতভাবেই’ ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর নির্দেশনায় হয়েছিল। বিমানঘাঁটিটি মার্কিন বোমারু বিমানও ব্যবহার করে। ঘটনার পর যুক্তরাষ্ট্র বোমারু বিমান সরিয়েছে। ঘটনাটিতে গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা পরে জামিনে ছাড়া পান। অভিযোগের তদন্ত চলছে।
লন্ডন দুই ইরানি নাগরিকের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। তলব করা হয়েছে ইরানের রাষ্ট্রদূতকে। তবে তেহরান এই সংশ্লিষ্টতা অস্বীকার করেছে। প্রমাণও চেয়েছে। ব্রিটেন ও যুক্তরাষ্ট্রসহ ২৯টি দেশ এক যৌথ বিবৃতিতে বিদেশে ইরানের কথিত গোপন হামলার নিন্দা জানিয়েছে।
এসব অস্থিরতার মধ্যেই আগামী ২০ নভেম্বর ব্রাসেলসে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে শীর্ষ বৈঠকের ঘোষণা দিয়েছেন বার্নহ্যাম। আলোচনা হবে খাদ্যপণ্যের বাণিজ্য, জ্বালানি, কার্বন নিঃসরণ, তরুণদের যাতায়াত এবং অভিবাসনসংক্রান্ত তথ্য বিনিময় নিয়ে।
বার্নহ্যামের বক্তব্য, ‘বর্তমান ব্যবস্থা ব্রিটেনের জন্য যথেষ্ট নয়।’ ইউরোপের দিকে পিঠ ফিরিয়ে থাকাকে তিনি ‘দায়িত্ব পালনে গুরুতর ব্যর্থতা’ বলেছেন। সম্ভাব্য চুক্তিতে ২০৪০ সালের মধ্যে অর্থনীতিতে বছরে এক হাজার কোটি পাউন্ডের বেশি সুফল আসতে পারে বলে তাঁর দাবি।
তবে ইউরোপিয় ইউনিয়নে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত হয়নি। নতুন গণভোটের প্রস্তাবও নেই। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘প্রতিটি পর্যায়ে ব্রিটিশ জনগণই সিদ্ধান্তের মালিক।’ বিরোধীদের আশঙ্কা, তিনি ব্রেক্সিটের পুরোনো বিতর্ক ফিরিয়ে আনছেন।
রাশিয়া ও ইরানের হুমকি ইউরোপমুখী নীতির একমাত্র কারণ, এমন প্রমাণ নেই। তবে নিরাপত্তা এবং অর্থনীতির হিসাব এখন একই টেবিলে। দশ বছর আগে বিচ্ছেদের প্রশ্নে বিভক্ত হয়েছিল ব্রিটেন। এবার প্রশ্ন, দূরত্ব কমানোর সাহস দেখাবে কি দেশটি?



