ফ্রান্স-স্পেনে দাবানলের তাণ্ডব: ৩ লাখ মানুষ ঘরছাড়া

দাবানলের আগুন নেভানোর চেষ্টায় একজন দমকলকর্মী। ছবি : রয়টার্স
ফ্রান্স ও স্পেনে কয়েক দিন ধরে চলা ভয়াবহ দাবানলে তিন লাখের বেশি মানুষ বাড়িঘর ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে বাধ্য হয়েছে। তীব্র তাপপ্রবাহ ও প্রবল বাতাসের কারণে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে হিমশিম খাচ্ছেন দমকলকর্মীরা।
ফ্রান্সের দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলে আগুন বোরদো শহরের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। অন্যদিকে স্পেনে জরুরি অবস্থা জারি করা হয়েছে। এদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন সতর্ক করেছে, চলতি বছর ইউরোপে দাবানলের ক্ষয়ক্ষতি আগের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে যেতে পারে।
ফ্রান্সের দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলের জিরোন্দ ও লঁদ অঞ্চলে শনিবার আরও ৫৫ হাজার মানুষকে সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এতে দেশটিতে দাবানলের কারণে বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা প্রায় আড়াই লাখে পৌঁছেছে।
দমকল কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন নিকোলা ব্রাজ বার্তা সংস্থা এএফপিকে বলেছেন, আগুন এতটাই তীব্র যে এটি নিজস্ব বাতাস ও ঘূর্ণাবর্ত তৈরি করছে। তার ভাষায়, আগুনের আচরণ অনিয়ন্ত্রিত ও নিয়ন্ত্রণের বাইরে। তিনি বলেছেন, সামনে আরও একটি কঠিন রাত অপেক্ষা করছে।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় ফ্রান্স সরকার সেনাবাহিনী মোতায়েন করেছে। অতিরিক্ত সেনাসদস্যরা ঝোপঝাড় পরিষ্কার ও আগুন ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে ফায়ার ব্রেক তৈরির কাজ করছেন। প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলো পুনর্গঠনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে বলেছেন, যতদিন প্রয়োজন সরকার মানুষের পাশে থাকবে।
প্রবল বাতাসে ধোঁয়া বোরদো শহরের দিকে ছড়িয়ে পড়ায় বাসিন্দারা বাতাসে তীব্র পোড়া গন্ধ অনুভব করছেন। বোরদোর কাছে ছুটি কাটাতে যাওয়া ব্রিটিশ পর্যটক স্পেন্সার র্যান্ডাল জানান, দাবানল কাছে চলে আসায় শনিবার ভোরে তিনি পরিবার নিয়ে প্রায় ১০০ মাইল দূরে সরে যান। তারপরও সেখানে আগুনের ধোঁয়ার গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে।
আরেক ব্রিটিশ দম্পতি বলেছেন, শুক্রবার সন্ধ্যার পর আগুনের তীব্রতা বেড়ে যায়। ছাইয়ে তাদের বাড়ির সুইমিংপুল ঢেকে গেছে এবং বাইরে হাঁটলে পা কালো হয়ে যাচ্ছে। তাদের ভাষায়, ধোঁয়া ফুসফুসে সঙ্গে সঙ্গেই প্রভাব ফেলছে।
দাবানলের কারণে নিরাপত্তা বাহিনীকে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় মোতায়েন করতে রোববারের ট্যুর দ্য ফ্রান্সের শেষ ধাপের দূরত্ব ১৩৩ কিলোমিটার থেকে কমিয়ে ৮৯ কিলোমিটার করা হয়েছে।
স্পেনেও মাদ্রিদের আশপাশে আগুন জ্বলছে। দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ফার্নান্দো গ্রান্দে মার্লাস্কা বলেছেন, আবহাওয়া পরিস্থিতি অনুকূলে না থাকায় আগুন নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে পড়েছে। প্রবল বাতাস আগুনকে দক্ষিণ দিকে ঠেলে দিচ্ছে বলেও জানান তিনি।
স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ বলেছেন, সামনে আরও জটিল সময় অপেক্ষা করছে। দেশটিতে চলতি বছর এখন পর্যন্ত এক লাখ ৩০ হাজার হেক্টর জমি পুড়ে গেছে, যা গত এক দশকের বার্ষিক গড় এক লাখ হেক্টরের চেয়েও বেশি।
স্পেনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, মাদ্রিদ ও আভিলা অঞ্চল থেকে প্রায় ৬০ হাজার মানুষকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। আরও ২৮ হাজারের বেশি মানুষ বাড়িতে অবস্থান করতে বাধ্য রয়েছেন।
শনিবার রাতে টলেডোর কাছে অন্তত আটটি পৌরসভাতেও সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মাদ্রিদ অঞ্চলের প্রেসিডেন্ট ইসাবেল দিয়াজ আয়ুসো একে অঞ্চলের ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ দাবানল বলে উল্লেখ করেছেন। এছাড়া ভ্যালেন্সিয়ায় আগুনে ৭০ বছর বয়সী এক ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছে।
ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরঁ নুনিয়েজ জানিয়েছেন, ২০২৬ সালের শুরু থেকে দেশটিতে ৯৮ হাজার হেক্টরের বেশি এলাকা পুড়ে গেছে।
এদিকে ইতালির সিসিলি দ্বীপে ৩৫০টির বেশি দাবানলের ঘটনা ঘটেছে, যার মধ্যে ১০টি বড় আগুন। স্কটল্যান্ডের কেয়ার্নগর্মস ন্যাশনাল পার্কেও টানা ১০ দিন ধরে দাবানল জ্বলছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের সংকট ব্যবস্থাপনা কমিশনার হাদজা লাহবিব বলেছেন, চলতি বছর দাবানলের মৌসুম আগেভাগেই শুরু হয়েছে এবং সামনে আরও তাপপ্রবাহের পূর্বাভাস রয়েছে। ফলে ইউরোপে দাবানলের ক্ষয়ক্ষতি নতুন রেকর্ড গড়তে পারে।
ফ্রান্সের অনুরোধে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ক্রোয়েশিয়া, পর্তুগাল, চেক প্রজাতন্ত্র, স্লোভাকিয়া ও রোমানিয়া থেকে অগ্নিনির্বাপণ বিমান, হেলিকপ্টার এবং বিশেষজ্ঞ দল পাঠাচ্ছে।
একই সঙ্গে ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লেয়েন জানিয়েছেন, ইইউর যৌথ অগ্নিনির্বাপণ বহর থেকে ফ্রান্স ও স্পেনে ১১টি বিমান ও হেলিকপ্টার মোতায়েন করা হয়েছে।
সূত্র : বিবিসি




