মেধাবীদের জন্য ব্রিটেনের দরজা আরও খুলছে
- শত কড়াকড়িতেও দক্ষ মেধাবীদের জন্য বড় সুযোগ
- ‘গ্লোবাল ট্যালেন্ট’ ভিসার পরিধি বাড়াল যুক্তরাজ্য
- শুধু বিশ্ববিদ্যালয় নয়, এবার শতাধিক ব্রিটিশ সংস্থাও আনতে পারবে বিশ্বসেরা গবেষক
- বিজ্ঞান, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, জীববিজ্ঞান ও উন্নত প্রযুক্তিতে বিদেশি মেধাবীদের নিয়োগ আরও সহজ
- তিন বছরে স্থায়ী হওয়ার সুযোগ

ছবি: রয়টার্স
অভিবাসন নিয়ন্ত্রণে একের পর এক কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হলেও বিশ্বের সেরা বিজ্ঞানী, গবেষক, প্রকৌশলী ও প্রযুক্তিবিদদের আকৃষ্ট করতে যুক্তরাজ্য আরও সুযোগ তৈরি করছে। ‘গ্লোবাল ট্যালেন্ট’ ভিসার পরিধি বাড়িয়ে গবেষণা ও উন্নয়ননির্ভর শতাধিক ব্রিটিশ প্রতিষ্ঠানকে এখন আন্তর্জাতিক মেধাবীদের নিয়োগের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে।
এত দিন এই ভিসার দ্রুততর গবেষণা-সুবিধা মূলত বিশ্ববিদ্যালয় ও অনুমোদিত গবেষণা প্রতিষ্ঠানের মধ্যেই বেশি ব্যবহৃত হতো। নতুন ব্যবস্থায় বেসরকারি শিল্প ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানও সরাসরি এই সুবিধার আওতায় আসছে।
নতুন তালিকায় ওষুধ ও জীববিজ্ঞান খাতের বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান অ্যাস্ট্রাজেনেকা, গাড়ি নির্মাতা জাগুয়ার ল্যান্ড রোভার ছাড়াও অ্যাডেড ভ্যালু সলিউশনস, ডেনরয় প্লাস্টিকস এবং ওয়েলসের চলচ্চিত্র ও সৃজনশীল শিল্পের প্রতিষ্ঠান ফিল্ম কামরি রয়েছে। সব মিলিয়ে শতাধিক গবেষণা ও উন্নয়ননির্ভর প্রতিষ্ঠানের জন্য বিদেশি গবেষক ও বিশেষজ্ঞ নিয়োগের পথ সহজ করা হচ্ছে।
‘গ্লোবাল ট্যালেন্ট’ ভিসা মূলত বিজ্ঞান, প্রকৌশল, চিকিৎসা, মানবিক ও সামাজিক বিজ্ঞান, ডিজিটাল প্রযুক্তি, শিল্প ও সংস্কৃতির মতো ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত বা ভবিষ্যতে নেতৃত্ব দেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে—এমন মেধাবীদের জন্য। ১৮ বছর বা তার বেশি বয়সী ব্যক্তিরা নিজ নিজ ক্ষেত্রে অসাধারণ প্রতিভা বা উল্লেখযোগ্য সম্ভাবনার স্বীকৃতি পাওয়ার যোগ্য হলে এই ভিসার জন্য আবেদন করতে পারেন।
অধিকাংশ আবেদনকারীর ক্ষেত্রে প্রথমে অনুমোদিত কোনো প্রতিষ্ঠানের সমর্থন বা আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি প্রয়োজন হয়। তবে নির্দিষ্ট আন্তর্জাতিক পুরস্কারজয়ীরা এ ধরনের স্বীকৃতি ছাড়াই সরাসরি আবেদন করতে পারেন।
গবেষক ও শিক্ষাবিদদের জন্যও রয়েছে একাধিক সুযোগ। অনুমোদিত বিশ্ববিদ্যালয় বা গবেষণা প্রতিষ্ঠানে উপযুক্ত চাকরির প্রস্তাব, স্বীকৃত ফেলোশিপ কিংবা যুক্তরাজ্যের অনুমোদিত গবেষণা অনুদানে কাজের সুযোগ থাকলে দ্রুত ভিসা অনুমোদনের ব্যবস্থা রয়েছে।
শতাধিক প্রতিষ্ঠানের সুযোগ
নতুন ব্যবস্থায় বড় বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে তুলনামূলক ছোট গবেষণা ও উদ্ভাবননির্ভর সংস্থা—সব মিলিয়ে শতাধিক প্রতিষ্ঠানকে এই সুবিধার আওতায় আনা হয়েছে।
পরিচিত প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে অ্যাস্ট্রাজেনেকা ও জাগুয়ার ল্যান্ড রোভার। অ্যাস্ট্রাজেনেকা বিশ্বের অন্যতম বড় ওষুধ ও জীববিজ্ঞান প্রতিষ্ঠান। আর জাগুয়ার ল্যান্ড রোভার উন্নত গাড়ি প্রযুক্তি ও প্রকৌশলের সঙ্গে যুক্ত।
এর পাশাপাশি অ্যাডেড ভ্যালু সলিউশনস, ডেনরয় প্লাস্টিকস এবং ফিল্ম কামরির মতো তুলনামূলক ছোট প্রতিষ্ঠানও এই সুবিধা পাবে।
প্রতিষ্ঠানগুলো বিভিন্ন খাতে কাজ করে। কোনোটি ওষুধ ও জীববিজ্ঞান গবেষণায়, কোনোটি গাড়ি ও উন্নত প্রকৌশলে, আবার কোনোটি উন্নত উৎপাদন, প্রযুক্তি কিংবা সৃজনশীল শিল্পে সক্রিয়। ফলে এই ভিসা সম্প্রসারণের লক্ষ্য শুধু একটি নির্দিষ্ট খাতে বিদেশি গবেষক আনা নয়; বরং ভবিষ্যৎ অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন শিল্পে আন্তর্জাতিক মেধাবীদের আকৃষ্ট করা।
যুক্তরাজ্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, জীবনবিজ্ঞান, পরিচ্ছন্ন জ্বালানি, উন্নত উৎপাদন, অর্ধপরিবাহী, কোয়ান্টাম প্রযুক্তি ও উন্নত প্রকৌশলের মতো খাতকে ভবিষ্যৎ অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখছে। এসব ক্ষেত্রে দক্ষ গবেষক ও বিশেষজ্ঞদের জন্য বিশ্ব জুড়ে প্রতিযোগিতা বাড়ছে। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশও আন্তর্জাতিক মেধাবীদের আকৃষ্ট করতে ভিসা ও গবেষণা সুবিধা বাড়াচ্ছে। ব্রিটেনও এই প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে থাকতে চাইছে না।
ব্রিটিশ সরকারের লক্ষ্য, বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাগারে বিদেশি মেধাবীদের সীমাবদ্ধ না রেখে তাদের সরাসরি শিল্প, প্রযুক্তি ও বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত করা।
আগের ব্যবস্থায় অনেক বিদেশি গবেষক বিশ্ববিদ্যালয় বা সরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠানে তুলনামূলক সহজে সুযোগ পেলেও বেসরকারি গবেষণানির্ভর প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে একই পথ সবসময় সহজ ছিল না। নতুন ব্যবস্থায় অনুমোদিত গবেষণা প্রকল্পে কাজ করা ব্রিটিশ প্রতিষ্ঠানগুলো বিদেশি বিশেষজ্ঞ ও গবেষক নিয়োগে বাড়তি সুবিধা পাবে।
বিশেষ করে ওষুধ, গাড়ি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, প্রকৌশল ও উন্নত উৎপাদন খাতে বিশেষ দক্ষতার গবেষকের চাহিদা বেশি। ফলে এসব ক্ষেত্রে নতুন ব্যবস্থার প্রভাব উল্লেখযোগ্য হতে পারে।
যুক্তরাজ্য সরকার এর আগেই জানিয়েছিল, গবেষণা ও উন্নয়ননির্ভর প্রায় ১০০ প্রতিষ্ঠানকে এই দ্রুততর ভিসা-পথের আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে। এখন সেই ব্যবস্থার পরিধি আরও বাড়ানো হচ্ছে।
ভিসার বাড়তি সুবিধা
‘স্কিলড ওয়ার্কার’ ভিসার তুলনায় ‘গ্লোবাল ট্যালেন্ট’ ভিসার বড় সুবিধা হলো এর নমনীয়তা। এই ভিসায় যোগ্য ব্যক্তিরা একটি নির্দিষ্ট নিয়োগকর্তার সঙ্গে দীর্ঘদিন বাধ্যতামূলকভাবে যুক্ত না থেকেও কাজ করতে পারেন। চাকরি পরিবর্তন, গবেষণা প্রকল্প বদলানো কিংবা নিজের ক্ষেত্রে নতুন উদ্যোগ নেওয়ার সুযোগও তুলনামূলক বেশি।
প্রযুক্তি ও গবেষণার মতো দ্রুত পরিবর্তনশীল খাতে এই সুবিধা ভিসাটিকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছে।
স্থায়ী বসবাসের সুযোগও তুলনামূলক দ্রুত
গবেষণা ও শিক্ষাক্ষেত্রে অনুমোদিত প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ‘গ্লোবাল ট্যালেন্ট’ ভিসা পাওয়া ব্যক্তিরা প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ করলে তুলনামূলক দ্রুত যুক্তরাজ্যে স্থায়ী বসবাসের অনুমতির জন্য আবেদন করতে পারেন। অনেক ক্ষেত্রে তিন বছর পরই স্থায়ী বসবাসের আবেদন করার সুযোগ রয়েছে।
এর ফলে শুধু কয়েক বছরের জন্য গবেষক আনা নয়, বিশ্বসেরা মেধাবীদের দীর্ঘমেয়াদে ব্রিটেনে ধরে রাখাও সরকারের অন্যতম লক্ষ্য।
সরকারের হিসাবে, এই ভিসার গবেষণাসংক্রান্ত পথ ব্যবহার করে এরই মধ্যে ১৩০টির বেশি দেশের সাড়ে ১২ হাজারের বেশি গবেষক যুক্তরাজ্যে গবেষণা ও কর্মজীবন গড়ে তুলেছেন। নতুন করে বেসরকারি গবেষণা ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান যুক্ত হওয়ায় এই সংখ্যা আরও বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক গবেষকদের আকৃষ্ট করতে ব্রিটিশ সরকার বিভিন্ন বিশেষ তহবিল ও গবেষণা কর্মসূচিও চালু রেখেছে।
অভিবাসনে কড়াকড়ি, মেধাবীদের ক্ষেত্রে উল্টো চিত্র
এই সিদ্ধান্তের রাজনৈতিক গুরুত্বও রয়েছে। ব্রিটেনে সাম্প্রতিক সময়ে অভিবাসন কমাতে সরকার একাধিক ভিসা ও স্থায়ী বসবাসের নিয়ম কঠোর করেছে। কম দক্ষ কর্মী এবং নির্ভরশীল সদস্য আনার ক্ষেত্রেও কড়াকড়ি বাড়ানো হয়েছে।
কিন্তু একই সময়ে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও গবেষণায় বিশ্বমানের প্রতিভাবানদের জন্য পথ আরও সহজ করা হচ্ছে। অর্থাৎ ব্রিটেনের নতুন অভিবাসননীতিতে একটি স্পষ্ট পার্থক্য দেখা যাচ্ছে— সাধারণ অভিবাসনে নিয়ন্ত্রণ, কিন্তু উচ্চ দক্ষতা ও গবেষণায় আন্তর্জাতিক মেধাবীদের জন্য বাড়তি সুযোগ।
সরকারের হিসাবও স্পষ্ট। ভবিষ্যতের অর্থনীতি যদি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, জীববিজ্ঞান, পরিচ্ছন্ন জ্বালানি, কোয়ান্টাম প্রযুক্তি ও উন্নত প্রকৌশলের ওপর নির্ভর করে, তাহলে শুধু দেশের নিজস্ব জনশক্তি দিয়ে সেই চাহিদা পূরণ করা কঠিন। তাই বিশ্বসেরা গবেষকদের জন্য ব্রিটেনের দরজা এখন আর শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না।
গবেষণাগার থেকে ওষুধ কোম্পানি, গাড়ি নির্মাতা থেকে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান— বিশ্বের মেধাবীদের আকৃষ্ট করতে সেই দরজা আরও বড় করে খুলছে যুক্তরাজ্য।




