বিদেশি শিক্ষার্থী কমছে হু হু করে, সংকটে ব্রিটেনের বিশ্ববিদ্যালয়

ব্রিটেনের কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের আশঙ্কা, আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী ভর্তি ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে।
বিদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা দ্রুত কমে যাওয়ায় গভীর আর্থিক সঙ্কটের মুখে ব্রিটেনের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। পরিস্থিতি সামলানো না গেলে কোনও কোনও প্রতিষ্ঠান টিকে থাকার লড়াইয়ে পড়তে পারে বলে সতর্ক করেছেন উচ্চশিক্ষা খাতের শীর্ষ ব্যক্তিরা। তাদের দাবি, বিদেশি শিক্ষার্থীদের ফি-র উপর নতুন কর আরোপের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করুক সরকার।
ব্রিটিশ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বৃহস্পতিবার প্রকাশিত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত ১২ মাসে মূল আবেদনকারীদের স্পনসরড স্টাডি ভিসার আবেদন হয়েছে ৩ লাখ ৮১ হাজার ৫০০টি, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১১ শতাংশ কম। সাধারণত আগস্টে নতুন শিক্ষাবর্ষের আগে আবেদন সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়। কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের আশঙ্কা, আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী ভর্তি ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে।
কিংস কলেজ লন্ডনের উপাচার্য অধ্যাপক শিতিজ কাপুর বলেছেন, প্রকৃত প্রভাব অক্টোবর নাগাদ স্পষ্ট হবে। তার হিসাবে, প্রতি পাঁচ জন আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী কমলে বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি চাকরি প্রভাবিত হতে পারে। তবে দেশীয় শিক্ষার্থীদের আগ্রহ এখনও শক্তিশালী। বৃহস্পতিবার এ-লেভেলের ফল প্রকাশের পর ইংল্যান্ডের রেকর্ড ১ লাখ ৯৪ হাজার ৮০০ জন ১৮ বছর বয়সী শিক্ষার্থী তাদের প্রথম পছন্দের বিশ্ববিদ্যালয়ে জায়গা পেয়েছেন। তবু বিদেশি শিক্ষার্থীর ফি থেকে হারানো বিপুল আয় পূরণে তা যথেষ্ট হবে না বলে মনে করছে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো।
সঙ্কটের শিকড় আরও পুরনো। ইংল্যান্ডে দেশীয় স্নাতকদের সর্বোচ্চ বার্ষিক টিউশন ফি ২০১৭ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ৯,২৫০ পাউন্ডে আটকে ছিল। মূল্যস্ফীতিতে এর প্রকৃত মূল্য প্রায় এক-তৃতীয়াংশ কমেছে। ২০২৬-২৭ শিক্ষাবর্ষে সর্বোচ্চ ফি ৯,৭৯০ পাউন্ড হলেও উচ্চশিক্ষা খাতের দাবি, ক্রমবর্ধমান ব্যয় মেটাতে তা যথেষ্ট নয়।
এর মধ্যেই আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের উপর বার্ষিক ৯২৫ পাউন্ডের নতুন লেভি বা কর নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে। বিগত কিয়ার স্টারমারের সরকারের সময়ে নেওয়া সিদ্ধান্তটি সংসদের অনুমোদন পেলে ২০২৮ সালের ১ আগস্ট থেকে ইংল্যান্ডে কার্যকর হওয়ার কথা। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে প্রতি বিদেশি শিক্ষার্থীর জন্য বছরে ৯২৫ পাউন্ড দিতে হবে। সরকার বলছে, এই অর্থ সুবিধাবঞ্চিত দেশীয় শিক্ষার্থীদের জীবনযাপন সহায়তায় ব্যবহার হবে। বিশ্ববিদ্যালয় নেতাদের আশঙ্কা, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে প্রতিযোগিতার সময় এই কর ব্রিটেনকে আরও পিছিয়ে দিতে পারে।
সাবেক কনজারভেটিভ বিশ্ববিদ্যালয়মন্ত্রী ডেভিড উইলেটস সতর্ক করেছেন, আর্থিক সঙ্কটে কোনও বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ হওয়ার ঝুঁকিও রয়েছে। তবে তার মতে, কর্মী ও কোর্স কাটছাঁটের কারণে শিক্ষার মান কমে যাওয়া আরও বড় বিপদ।
সেই চাপ ইতিমধ্যেই দৃশ্যমান। রাসেল গ্রুপভুক্ত ইউনিভার্সিটি অব এক্সেটার বৃহস্পতিবার কর্নওয়ালের পেনরিন ক্যাম্পাসে ভূগোলের কয়েকটি কোর্স তাৎক্ষণিকভাবে বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে। এ বছর আবেদন করা শিক্ষার্থীরাও এতে প্রভাবিত হচ্ছেন।
ইংল্যান্ডের উচ্চশিক্ষা নিয়ন্ত্রক অফিস ফর স্টুডেন্টসের মে মাসের হিসাবে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৩৫.৮ শতাংশ প্রতিষ্ঠান ঘাটতিতে ছিল; ২০২৫-২৬ সালে তা ৪২.৭ শতাংশে পৌঁছতে পারে। প্রায় এক-চতুর্থাংশ প্রতিষ্ঠান কর্মী ছাঁটাইসহ পুনর্গঠনে অর্থ ব্যয় করেছে। এ খাতে ব্যয় এক বছরে ২০.৭ শতাংশ বেড়ে ২১ কোটি ৮২ লাখ পাউন্ড হয়েছে। নিয়ন্ত্রকের মতে, বিদেশি শিক্ষার্থীদের ফি-র উপর অতিরিক্ত নির্ভরতা দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক ঝুঁকির বড় কারণ।
রাসেল গ্রুপের প্রধান নির্বাহী লিবি হ্যাকেটের দাবি, বিদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমায় যুক্তরাজ্য ইতিমধ্যেই প্রায় ৩০০ কোটি পাউন্ডের নিট অর্থনৈতিক সুবিধা হারিয়েছে। ধারাবাহিক সরকারি নীতি ও নতুন কর পরিস্থিতি আরও খারাপ করতে পারে।
ইউনিভার্সিটিজ ইউকের প্রধান নির্বাহী ভিভিয়েন স্টার্ন বলেছেন, সর্বশেষ ভিসা-পরিসংখ্যান সরকারের জন্য ‘সতর্কবার্তা’। তার মতে, অভিবাসন নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজন থাকলেও বিদেশি শিক্ষার্থী কমানোর পথে সরকার ‘অতিরিক্ত দূর’ চলে গেছে। তাই আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের উপর করের পরিকল্পনা প্রত্যাহার করে ব্রিটিশ উচ্চশিক্ষাকে আবার বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতামূলক হওয়ার সুযোগ দেওয়া উচিত।
সরকার অবশ্য শিক্ষার মানকে সামনে রাখছে। উচ্চশিক্ষার দায়িত্বে থাকা দক্ষতাবিষয়ক মন্ত্রী জ্যাকি স্মিথ বলেছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের কোর্স শিক্ষার্থীদের অর্থের যথার্থ মূল্য দিচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত করতে হবে। ভবিষ্যতে টিউশন ফি বৃদ্ধি শিক্ষাদানের মানের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে বলেও ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি।
বিদেশি শিক্ষার্থী কমা, দীর্ঘদিনের অর্থসঙ্কট, কোর্স ও কর্মী ছাঁটাই এবং সামনে নতুন কর–সব মিলিয়ে ব্রিটিশ উচ্চশিক্ষার পুরনো আর্থিক মডেল এখন বড় পরীক্ষার মুখে।






