হাঙ্গেরির নির্বাচন
ইউরোপের বিশ্বস্ত বন্ধুকেই কি হারাচ্ছেন ট্রাম্প

ভিক্টর ওরবান ও ডোনাল্ড ট্রাম্প
ইউরোপে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের যেসব মিত্র আছেন, নিঃসন্দেহে তার অন্যতম হাঙ্গেরির দীর্ঘদিনের প্রধানমন্ত্রী ভিক্টর ওরবান। দুই নেতার মধ্যে গভীর সম্পর্কের সবচেয়ে বড় কারণ, উগ্র জাতীয়তাবাদী আদর্শের জায়গায় মিল। আবার অভিবাসী ইস্যুতেও দুজন একই রকম কট্টর।
বিভিন্ন সময়ে ভিক্টর ওরবানের প্রতি তার সমর্থন জানিয়েছেন ট্রাম্প, প্রকাশ করেছেন ভিক্টরকে তিনি আসলেই কতটা পছন্দ করেন সে বিষয়টিও।
২০১০ সাল থেকে হাঙ্গেরির ক্ষমতায় রয়েছেন ওরবান আর তার দল ফিদেজ।
আগামী রবিবার (১২ এপ্রিল) দেশটিতে জাতীয় নির্বাচন, আর জনমত জরিপ বলছে—দীর্ঘ ১৬ বছরের একচ্ছত্র আধিপত্য এবার হারাতে পারেন ওরবান।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সবচেয়ে দীর্ঘমেয়াদি প্রধানমন্ত্রী ভিক্টর ওরবান। তিনি এমন এক নেতা, যার পক্ষে রয়েছে রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র উভয় পরাশক্তিই।
ওরবানের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময় গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও সাধারণ মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার খর্ব করার অভিযোগ উঠেছে। এর মাধ্যমে তিনি নিজের ক্ষমতা যেমন সুসংহত করেছেন, তেমনি এমন এক গণতন্ত্রের চর্চা করেছেন, যেটিকে বলা হচ্ছে ‘অনুদার বা সংকীর্ণ’।
এই ধরনের গণতন্ত্রের চর্চা তাকে ইউরোপের অতিডানপন্থিদের কাছে যেমন জনপ্রিয় করেছে, তেমনি ট্রাম্পের ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ আন্দোলনেও করেছে জনপ্রিয়।
তবে, তিন বছর ধরে হাঙ্গেরিতে চলা অর্থনৈতিক স্থবিরতা এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়া সাধারণ ভোটারদের ক্ষুব্ধ করেছে। এই সময়ে সাধারণ মানুষের যখন খরচ মেটাতে নাভিশ্বাস উঠেছে, তখন সরকার ঘনিষ্ঠ অভিজাত শ্রেণি বা অলিগার্কদের সম্পদ প্রকাশ্যে বেড়েছে। এটিও মানুষকে বিক্ষুব্ধ করে তুলেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই বিক্ষোভের ফলাফলই দেখতে পাওয়া যাবে রবিবারের ভোটে। এবারের নির্বাচনে ওরবানের প্রতিদ্বন্দ্বী তার এক সময়ের অনুগত পিটার ম্যাগিয়ার। হাঙ্গেরির সাধারণ মানুষের এই অসন্তোষকে সফলভাবে কাজে লাগাতে চেষ্টা করছেন তিনি। ফলে তার মধ্য-ডানপন্থি দল তিসজা এখন স্বাচ্ছন্দ্যে এগিয়ে রয়েছে বেশিরভাগ জনমত জরিপে।
জরিপের ফলাফল আর ভোটের ফলাফল যদি মিলেই যায়, তাহলে হাঙ্গেরি পেতে যাচ্ছে নতুন সরকার। এর মধ্যে দিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প হারাতে পারেন ইউরোপে তার অন্যতম মিত্রকে।
অবশ্য বন্ধুর প্রতি সমর্থন জোগাতে কম চেষ্টা করছেন না মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
গত মঙ্গলবারই হাঙ্গেরির বুদাপেস্ট সফরে গিয়েছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। সেখানে আয়োজন করা হয়েছিল ‘হাঙ্গেরি-আমেরিকা বন্ধুত্ব দিবস’।
আর সেই আয়োজনের মঞ্চে দাঁড়িয়েই হাজারো হাঙ্গেরিয়ানের সামনে তিনি টেলিফোন করলেন ডোনাল্ড ট্রাম্পকে।
মাইক্রোফোনের সামনে ধরা সেই টেলিফোন যুক্তরাষ্ট্রে বসে তুললেন ট্রাম্প, হাঙ্গেরির জনতার উদ্দেশে বললেন,
‘আমি ভিক্টরের একজন বড় ভক্ত। আমি পুরোপুরি তার সঙ্গে আছি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পুরোপুরি তার সঙ্গে আছে।’ অর্থাৎ, নামে বন্ধুত্ব দিবসের আয়োজন; আদতে বন্ধু ওরবানের পক্ষে নিজের অবস্থানই আরেকবার তুলে ধরলেন ট্রাম্প।
এর আগে ফেব্রুয়ারিতেও বুদাপেস্ট সফরের সময় মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও জোর দিয়ে বলেছিলেন, ‘হাঙ্গেরির সাফল্যই আমাদের সাফল্য।’
ইউরোপের অন্য দেশগুলোর তুলনায় হাঙ্গেরি দরিদ্র। আছে দুর্নীতি, গণতন্ত্রের স্পষ্ট অভাবও।
এমন একটি দেশের সাফল্যকে কেন যুক্তরাষ্ট্র নিজের সাফল্য বলে মনে করছে তার ব্যাখ্যা জানতে সিএনএন কথা বলেছিল বুলগেরিয়ার রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ইভান ক্রাস্তেভের সঙ্গে।
তার মতে, গত ১৬ বছরে ওরবান হাঙ্গেরিকে ইউরোপীয় দক্ষিণপন্থিদের ‘বৌদ্ধিক, প্রাতিষ্ঠানিক ও আর্থিক কেন্দ্রে’ পরিণত করেছেন। ওরবান ও তার তৈরি করা আদর্শিক অবকাঠামোকে একটি ‘সমমনা’ ইউরোপ অর্থাৎ পরিবেশবাদ বিরোধী এবং অভিবাসীবিরোধী ইউরোপ গড়ার প্রচেষ্টার কেন্দ্র হিসেবে দেখে ট্রাম্প প্রশাসন।
আর তাই, হাঙ্গেরির নির্বাচন নিয়ে তাদের এত আগ্রহ, সতর্ক অবস্থানও।

